সাহেরা কথা-৬

women abstractলীনা হক: ইংরেজি নুতন বছর বরণ উপলক্ষ্যে তেমন কোনো আয়োজন আমার থাকে না। বেশিরভাগ সময় মেয়ের বন্ধুদের জন্য কিছু খাবার তৈরি করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে এই উৎসব। ছেলে যখন দেশে ছিল তখন নিউ ইয়ার্স ইভের পার্টিটা বেশ বড়ই হতো, ছেলের কয়েকজন বন্ধু আসতো , আমার দু একজন বন্ধু যারা কাছাকাছি এলাকায় থাকত তারা আসতো, বন্ধুদের সন্তানেরা আসতো। অনেক আগে ভাই যখন দেশে ছিল, সেও আসত তার কয়েকজন বন্ধুবান্ধব নিয়ে। ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে শুরু করে জানুয়ারীর ১ম সপ্তাহ পর্যন্ত কাজের চাপ কম থাকে।

আমাদের হেড কোয়ার্টার তো জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত বেশ ঢিলেঢালাভাবে চলে। আমাদের অফিসের ক্রিসমাস পার্টি আমরা সচরাচর করে থাকি ২২ তারিখে কারণ তার পরেই অনেকে ছুটিতে চলে যায়। আমার বাড়ীতেও একটা ছোট্ট ক্রিসমাস পার্টি হয় আমাদের গাড়ির চালকের সুবাদে। বছরের শেষ সপ্তাহটা কাটে মোটামুটি এইসব আয়োজনে। তারপরে ডিসেম্বরের ২৫ তারিখ আমরা বের হয়ে পড়ি ছুটিতে। বেশীরভাগ বছর বাইরে কোথাও যাই ঘুরতে বা মায়ের কাছে যাই। এইবার গৃহবন্দী, এমনকি অবরোধের কারণে ঢাকার মধ্যেও কোথাও যেতে পারছি না।

২০১৩ সালের বছরের শেষ ছুটির বেশীরভাগ সময়টাই কেটেছে সাহেরার সাহচর্যে। আমার সাথে সাথে সে সাহায্য করে ঘর দোর পরিষ্কার করা, শীতের কাপড় বের করে রোদে দেয়া, ধোয়া, ইত্যাদি। দু একদিন পিঠা আর নুতন খেজুরের গুড়ের পায়েস করার চেষ্টা করলাম। মেয়ের মাথায় খুশকি হয়েছে সেটার জন্য কন্যার কোনো মাথাব্যথা না থাকলেও আমার চিন্তা, কাজেই খুশকি দূরীকরণ প্রকল্পের টোটকার ব্যবস্থা করা – এই সব করতে করতে সাহেরার সাথে গল্প করি।

২৫/২৬ বছর বয়সী সাহেরার ছোটবেলা কেটেছে বড্ড দারিদ্র্যের মধ্যে। শীতকালে তাদের পাঁচ ভাই বোনের জন্য মাত্র তিনটি সোয়েটার ছিলো। ভাই দুটি মক্তবে আর স্কুলে যেতো বলে দুটি সোয়েটার ছিল তাদের বরাদ্দ আর সবশেষ বোনটি পেতো একটা। সাহেরা আর তার পিঠাপিঠি বোনের বরাদ্দ ছিলো মায়ের শাড়ি – যেটাকে চার ভাঁজ করে পেঁচিয়ে বেঁধে দেয়া হতো গলায়। সোয়েটার গায়ে দেয়া নিয়ে ভাইদের সাথে ঝগড়াও হতো আর স্বাভাবিক নিয়মেই মা এসে মারত সাহেরা বা তার বোনকে।

একটু বড় হলে সাহেরা একবার তার খালার বাড়ী পীরগাছায় বেড়াতে গিয়েছিলো, তখন তার রিকশাচালক খালু রংপুর শহর থেকে তাকে একটা লাল রঙের কার্ডিগান কিনে দিয়েছিলো। সাহেরার ভাষায়’ নাল কালারের বুক খোলা বোতাম অলা সোয়েটার’! সোয়েটারটি মনে হয় সাইজে বেশ বড় ছিলো তা নইলে সাহেরা ওটা বেশ ক’বছর পরল কিভাবে! অবশ্য অভাবের সংসারে সাইজ কি আর কোনো তফাৎ আনে! প্রয়োজন মেটানোই মূল কথা। বিয়ের বছর সাহেরাকে তার স্বামী একটি শাল কিনে দিয়েছিলো – সেটিও লাল রঙের। কিন্তু সেই শালটি অবশ্য ব্যবহার করে নষ্ট করতে চায়নি সাহেরা, তাই তুলে তুলে রাখতো। পরে আরেকটা শাল তাকে দিয়েছিলো তার বোন- যে কিনা ততদিনে ঢাকায় গার্মেন্টসে চাকরি করতে এসেছে।

গত ৭/৮ বছর থেকে সাহেরাকে আর গরম কাপড় নিয়ে চিন্তা করতে হচ্ছে না। নিজেও কিনতে পারে আর বাসাগুলো থেকেও দেয় তাকে। এইবার তার ফরমায়েশি ‘রানী (ম্যাজেন্টা)’ কালারের একটি গরম শাল তাকে এনে দেয়া হয়েছে নেপাল থেকে। মুশকিল হলো, এটিও সে পরতে চায় না, যদি নষ্ট হয়ে যায়! অনেকবার বলার পরে এবং আরেকটি এনে দেবার প্রতিশ্রুতি দেয়ার পরে সে শালটি গায়ে দেয়, কিন্তু কাজ করার সময় খুলে রাখে যাতে ময়লা না লাগে। কাজের সময় পরার জন্য তাকে আরেকটি কার্ডিগান দেয়া হয়েছে। সে জানালো, আরেকটি সোয়েটার তার হয়েছে, অন্য বাসা থেকে দিয়েছে। আমি হেসে বলি তোমার তো তবে বেশ কয়টা গরম জামা হলো।

আমার ক্লজেটের দিকে তাকিয়ে সে মন্তব্য করলো, ‘তবে আফা, তোমার মতন এতোগুলান সোয়েটার, শাল, কোট মোর দেখা মতে আর কাহারও নাই!” আমি বিব্রত হয়ে বোঝানোর চেষ্টা করলাম যে, শীতের দেশে ভ্রমণ করতে হয় বলে গরম জামা বেশী লাগে। জামা বা শাড়ির সাথে রং মিলিয়ে গরম কাপড় পরতে সে ঢাকায় এসেই দেখেছে এবং তার কাছে ব্যাপারটা খুবই চমকপ্রদ মনে হয়েছে। আমি ঠাট্টা করলাম এই বলে যে, ইচ্ছে করলে সেও এখন রং মিলিয়ে শাল সোয়েটার পড়তে পারে, সমস্যা কি!

সাহেরা ঝকঝকে হেসে বললো, ‘ হয় আফা, কতা খান তুমি ঠিকই কইছেন। রং মিলি (মিলিয়ে) পরবার চাইলে সেটা করা যাইবো।’ গত বেশ কিছুদিনের নানা ঝামেলা, কুয়াশা ঘেরা রোদহীন আবহাওয়া ইত্যাদি মিলিয়ে আমার বিরক্তি মূহূর্তে উধাও। অল্প কিছু শখ পূরণেই সাহেরার এত আনন্দিত উদ্বেলিত চেহারা আমাকেও আনন্দিত করে তুলে।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.