এ কেমন দেশ আমার?

women torture 1উইমেন চ্যাপ্টার: যে জাতি নারীকে সম্মান করে না, দিতে জানে না, সেই জাতির পরাজয় অনিবার্য। এই কথাটা বেদবাক্যের মতোই সত্য, কেউ বিশ্বাস করুক, বা নাই করুক। ঘরে-বাইরে, সামাজিক-অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবে নারীরা যে কতটা নির্যাতনের শিকার হয় তা দেশের নারী নির্যাতনের চিত্র দেখলেই বোঝা যায়। অত দূরেও যেতে হয় না, সাম্প্রতিককালের কিছু ঘটনা মনে করলেই এর প্রমাণ মেলে।

গতকাল রোববার বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের ডাকা গণতন্ত্রের অভিযাত্রা নামক কর্মসূচিকে ঘিরে যে নাটক মঞ্চস্থ হলো, তা প্রকৃত জীবনের নাটককেও হার মানায়। এক তো পুরা ঢাকা ছিল সারা বাংলাদেশ থেকে কার্যত অবরুদ্ধ, এখানে আমার আ আপনার অধিকার বলে কিছু নেই, আমরা মরে গেলেও নড়বার সাধ্য নেই। এর আগে প্রায় আড়াই মাস ধরে চলা বিরোধী দলের অবরোধ কর্মসূচিতে পুরো জীবন স্থবির হয়ে গেছে দেশের। কেউ বলছেন, ‘সময়টা খুব খারাপ, পেটে পাথর বেঁধে রাখুন’। অর্থনীতি স্থবির, রাজনীতি স্থবির। এক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে গিয়ে দেশের ১৬ কোটি মানুষের জীবন বিপন্ন হয়ে গেছে। বিচার প্রশ্নে সরকার যেমন অনমনীয়, তেমনি বিরোধীপক্ষও মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের সাথে নিয়ে রীতিমতো আরেকটা যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে।

অনেকেই উপদেশ আওড়াচ্ছেন, এটা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধেরই ধারাবাহিকতা, এই লড়াইয়ে শামিল হতে হবে। কিন্তু ভাই, সব হারানো আমি যে আর কাউকে হারাতে চাই না। আমার বাবার জীবনের বিনিময়ে যে দেশে আপনি-আমি বাস করছি, এই যদি হয় সেই দেশের অবস্থা, তাহলে মাফ চাই, আমি আর কোন যুদ্ধ চাই না। আর কোন পরিবার অনাথ হোক, চাই না।

বলছিলাম নারীর কথা। গতকাল সুপ্রিম কোর্টে সকাল থেকেই পুলিশ এবং আইনজীবীদের যে তাণ্ডব চলছিল, তাতে কোন স্বাভাবিক-সুস্থ মানুষের সেই ঘটনাকে সমর্থন করার কোন কারণ নেই। দিনভর বিক্ষোভকারীদের ওপর জলকামান থেকে গোলাপী জল ছিটিয়েও শান্তি মেলেনি। প্রেসক্লাবের হামলা শেষে পুরো লাঠিয়াল বাহিনী হামলে পড়েছিল আইনজীবীদের ওপর। আমরা রুদ্ধশ্বাসে দেখছিলাম, কোর্টের গেইট খুলে দেয়ার পর মানুষের উন্মাদনা কিভাবে নৃশংস রূপ নিয়ে আছড়ে পড়েছিল দেশের সম্মানিত ও পবিত্র একটি স্থানে। আমরা তখন দম বন্ধ করে পরের নৃশংসতা দেখার জন্য অপেক্ষায় ছিলাম। অনেকেই তখন সেই সরকার সমর্থক লাঠিয়াল বাহিনীকে বাহবা দিয়েছে। তাদের মানসিক সুস্থতা নিয়ে আমার যথেষ্টই সংশয়।

তাৎক্ষণিকভাবে সেখানকার খবর অতটা জানতে না পারলেও বোঝা যাচ্ছিল বা অনুমান করতে পারছিলাম কী হচ্ছে সেখানে, বা কী হতে পারে! মোটর সাইকেল পুড়ানোর ধোঁয়া দেখলাম। এটাও দেখলাম, বিএনপি-জামাতপন্থী আইনজীবীরা কোর্টের ছাদ থেকে কিভাবে একের পর এক বোতল ছুঁড়ে মারছিল। যেন একদল মানুষ, আরেকদল বণ্য হিংস্র প্রাণী, একে-অপরকে না মারলেই নয়।

এরপর চলে আসে কিছু ছবি, যেখানে দেখা যায়, নারী আইনজীবীদের বেশ কয়েকজন মিলে রাস্তায় ফেলে বেধড়ক পেটাচ্ছে, একজনের জামা ছিঁড়ে গেছে, তাকে বাঁচাতে এগিয়ে এসেছেন একজন সাংবাদিক। নিজের জ্যাকেটটা দিয়ে তার শরীর আড়াল করার চেষ্টা করছিলেন সেই সাংবাদিক ভাই।

এ নিয়ে যখন ফেসবুকে তোলপাড় শুরু হলো, তখন খুব বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করলাম, একদল অন্ধ বা দলকানা লোক কি করে এই ঘটনাকে জায়েজ করতে উঠেপড়ে লেগে গেছেন। কিছুদিন আগে পাকিস্তান হাই কমিশনের সামনে পুলিশের হাতে লাঞ্ছিত মেয়েদের কথা টেনে আনছেন এই প্রসঙ্গে। অবাক হই, তুলনা করেন কি করে? দুটোর কোনটাই তো সমর্থনযোগ্য নয়। তখনও আমরা অনেকেই সোচ্চার ছিলাম এই নগ্ন লাঠিচার্জের ঘটনায়, এখনও সোচ্চার হই। একটাই কারণ, কোন সভ্য দেশে এ ধরনের ঘটনা ঘটতে দেয়া যায় না। বিরোধী দল বা প্রতিপক্ষের হলেই তার গায়ে হাত তোলা জায়েজ হতে পারে না সরকারি দলের। নারী হলে তো আরও হতে পারে না।

এর আগেও দেখেছি, আদর্শ বা মতের অমিল হলেই একদল দলকানা মানুষ কি করে ঝাঁপিয়ে পড়ে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার ওপর। বিশেষ করে অনলাইন জগতে এই হামলা অশ্লীল থেকে অশ্লীলতর হয়ে উঠে। এখানেই একজন নারী তার ছেলের বয়সীদের বলতে শুনেছি, ‘যা ওরে রেইপ করে আয়’।

ফেসবুকে এক বন্ধু লিখেছেন, ‘রাজপথে খেলতে নেমে কে কতটুকু অসভ্য হয়েছে সেটা ব্যারোমিটারে মাপা আজ সাজে না – যখন পেট্রোল বোমায় ঝরে যায় আমারই নিরপরাদ সিএনজি চালক এক আত্মীয়ের জীবন, ঝরে যায় অচেনা শ শ সাধারণ মানুষের প্রাণপ্রদীপ, পঙ্গু হয় হাজার হাজার মানুষ, আতংকে সন্তানকে রাস্তায় নামতে দেয় না, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসতে বলে না শিক্ষক- পাঠাতে পারে না বাবা-মা, কাটা পড়ে সারাদেশে লক্ষ লক্ষ গাছ। আমি এই জঙ্গি আন্দোলন, জঙ্গি রাষ্ট্র দেখার জন্য প্রস্তুত না।

এ খেলা ক্ষমতার খেলা। এ খেলা ১৯৭১ বনাম ২০১৩; এখানে যারা রাজপথে নামে সে সাংবাদিক, শিক্ষক বা আইনজীবী- যাইহোক তাদের স্বার্থেই নামে। আমি ওইসব ধান্ধাবাজদের পক্ষে নেই। এরা একে অন্যকে মারলে আমি ব্যথিত হই, কিন্তু যুক্তি খুঁজে পাই’।

আমি তার কথার সাথেও একমত। এগুলোর কোনটাই ফেলনা না। তারপরেও কথা থাকে। কথা এইটাই যে, রাজনৈতিক এই সহিংসতা কতদিন চলতে পারে? এরও তো একটা সময়সীমা থাকা উচিত? আজ যে নারী পদদলিত হচ্ছে শুধুমাত্র রাজনৈতিক মতভিন্নতার কারণে, কাল যে আরেকজন নারী এভাবেই নৃশংসতার শিকার হবে না, বা আমি-তুমি হবো না, তার নিশ্চয়তা কোথায়? আর আমরা তো হচ্ছিই, নানারকম নিগ্রহের শিকার হচ্ছি এই ধরনের ঔদ্ধত্যপূর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতির কারণেই তো! কাজেই আমার মতে, এর এখানেই ইতি টানা উচিত। কেউ উস্কানি দিয়েছে বলেই তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে আর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাতে সায় দেবে, এটা হতে পারে না।

women torture 2রবিবার হাইকোর্ট প্রাঙ্গনে একজন নারী আইনজীবীকে যখন জাতীয় পতাকা বাধা লাঠি দিয়ে নির্লজের মতো পেটানো হলো.. টেনে হিঁচড়ে জামা ছিঁড়ে ফেলা হলো.. তখনও কি করে একদল মানুষ এই ঘটনার পক্ষে সাফাই গেয়ে যায়, সেটাই ভাবনার বিষয়। হতে পারে ওই নারীর ভূমিকা আপনার সাথে মেলে না, তাই বলে তাকে নিয়ে কেউ নোংরা সমালোচনা করবেন না যতই কোনো দলের অন্ধ সমর্থক হোন .. দলের খারাপ কাজগুলো যুক্তি দিয়ে জায়েজ করবেন না। বিরোধী দলের পাপিয়া আশরাফি যখন সংসদে দাঁড়িয়ে বাজে কথা বলেন, তখন নিশ্চয়ই আমরা তার পিছনে গুণ্ডাবাহিনী লেলিয়ে দেবো না, বরং আইনগত পদক্ষেপ নেবো তার বিরুদ্ধে। এটাই তো সত্যিকার সভ্য দেশের পরিচয়!

তাই বলি কি, আসুন অন্ধ বা দলকানা না হয়ে মানুষ হই সবার আগে। মানবিক হই, রাজনীতিক হওয়ার আগে। দেশকে ভালবাসি, দলকে ভালবাসার চেয়ে।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.