শার্টটা আজো আছে, যুবদা!

সেরীন ফেরদৌস: ১৯৯৩ সালের কথা, অভিনেতা খালেদ খান তখন খ্যাতির মধ্যগগনে। কি যে পছন্দের অভিনেতা তিনি!কি মঞ্চে, কি টেলিভিশনে, তুখোড় ঝকঝক করছেন তিনি! কাকরাইলের মোড়ে জ্যামে পরে আমি রিকশায় বসে, সামনের রাস্তা দিয়ে হুস করে বেবিট্যাক্সিটি বেরিয়ে গেলো। ভেতরে আধশোয়া অবস্থায় খালেদ খান, কেঁপে উঠলাম!ও মাগো, ইনি খালেদ খান না! সামনাসামনিও কি সুন্দর তিনি! সারাপথ তন্ময় হয়ে থাকলাম, রিক্সাওয়ালা কখন সিদ্ধেশ্বরীর বাসায় এলো কিছুই খবর নেই। সারাপথ শুধু একটাই ভাবনা, আহা. খালেদ খানকে দেখলাম, যুবরাজকে দেখলাম! বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের ফোন করে করে বিস্তারিত জানালাম কিভাবে, কখন তাঁকে দেখতে পেলাম, কি অবস্থায় ছিলেন, আর কতোটা ভাগ্যবান আমি! তখনও শো-বিজ এর তারকারা  এত কাছের মানুষ হয়ে ওঠেনি।

খালেদ খানের  সঙ্গে পরিচয় হয় ১৯৯৬ সালে। অভিনয়ের পাশাপাশি ধানমন্ডিতে বেক্সিমকোর অফিসে তিনি তখন বসেন, মানে চাকরি করেন। বড়রাস্তার পাশে সুন্দর সাজানো অফিস!মঞ্চকর্মী হিসেবে নাট্যকেন্দ্রে কাজ করার সুবাদে ততদিনে তারেক আনাম, তৌকির আহমেদ, জাহিদ হাসান, ঝুনা চৌধুরী, মেঘনা, জয়শ্রী কর এবং হালের মোশাররফ হোসেনসহ অনেকের সঙ্গেই সম্পর্কটা দৈনন্দিন বিষয়ে  দাঁড়িয়ে গেছে।‘প্রণোদনা’ পত্রিকায় কাজ শুরু করেছি সংবাদের জাঁদরেল সাহিত্য সম্পাদক আবুল হাসনাত আর বাংলাভাষার খ্যাতিমান পণ্ডিত হায়াত মামুদের সঙ্গে। তারপরও সাক্ষাতকার নিতে খালেদ খানের সামনে যেতে মৃদু কাঁপছিলাম, পায়ে যেন কোনো জোরই পাচ্ছিলাম না । বেক্সিমেকার বেক্মিকোর বেবগেটে  বলে রাখাই ছিলো, তারপরও রুমের ভেতরে ঢুকবার আগে বড় বড় করে গভীর করে শ্বাস নিলাম যেন নার্ভাসনেসটা ধরা না পরে। ভেতরে এসির ঠান্ডা বাতাসে সত্যি সত্যি এবার ঘেমে উঠলাম। এই সেই খালেদ খান! মঞ্চে দেখা, টেলিভিশনে দেখা স্বপ্নের মতো মানুষটি! মাত্র দু’হাতের ব্যবধানে তিনি বসে আছেন! না-জানি কোথায় ভুল ধরবেন, না-জানি কি জানতে চেয়ে কি বলি! ভয়ে জিভ শুকিয়ে আসে! মুখে সালাম বলতে না বলতেই আমার সমস্ত ভয় আর টেনশন যেন এক পলকে উবে যায়!সহাস্যে যিনি হাত বাড়িয়ে দিলেন তিনি একজন মজাদার মানুষ! গুনগুন করে স্বভাবজাত ভঙ্গিতেই কি একটা রবীন্দ্রসঙ্গীত ভাঁজছিলেন তিনি, এমনভাবে বসতে বললেন যেন কতযুগ ধরে তিনি চেনেন। পরবর্তীতেও দেখেছি বা যাঁরা তাঁর কাছাকাছি গিয়েছেন, তাঁরা মানবেন যে এটাই আমাদের অতি চেনা যু্বদা’র ভঙ্গি!

আর যুবদা’র গড়গড়িয়ে কৌতুক বলার কথা, কে না জানে! কত মজা করে ছোট ছোট কৌতুক লাগাতার বলে যেতে পারতেন তিনি! একটুও না হেসে, একটুও বিচলিত না হয়ে। তাঁর সামনে আমরা হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছি আর তাঁর ঝোলা থেকে ক্রমাগত বের হচ্ছে গল্পের পর গল্প। শুধু মুখেই বলা নয়, সাথে অভিনয় করে দেখাতে তাঁর জুড়ি মেলা ভার! একই সঙ্গে তিন-চারজনের গল্প অভিনয় করে দেখাচ্ছেন যুবদা! আমি নাট্যকেন্দ্রে কাজ করছি বলে একদিন তারেক আনামের একটি গল্প শুরু করেন এভাবে, “বুঝলি তারেক ভাই তো দাড়ায়া আছে আর লোকটা তাঁরে নানাভাবে, কাছে আইসা, দূরে গিয়া দেখতেছে। আরে অনেকক্ষণ ধইরা, ডাইনে যায় একবার, বাঁয়ে যায় একবার। তারেক ভাই অস্বস্তিতে নইড়া-চইড়া দাঁড়াইছেন কয়েকবার। কি আর করা, ভক্ত বইল্যা কথা! আরো খানিকক্ষণ পরখ করার পর তর্জনি খাড়া কইরা লোকটা তীরবেগে তারেক ভাইয়ের কাছে আসে। প্রবল আত্মবিশ্বাস নিয়া চিল্লাইয়া কয়, ‘এতক্ষণে আপনারে চিনবার পারছি, আপনি তারানা হালিম!”

আহ্‌, কত কত স্মৃতি, কত কথা! বেইলিরোড কেন্দ্রীক থিয়েটারের কর্মকাণ্ড আর সাংবাদিকতার সুবাদে কারনে-অকারনে খালেদ খান হয়ে উঠেছিলেন প্রিয় যুব’দা। পাশাপাশি মিতা আপা এবং তাঁর পরিবারে আসা-যাওয়া। ১৯৯৮ সালে প্রথম আলো পত্রিকায় যখন যোগ দিলাম তখন কারওয়ান বাজারের এপারে প্রথম আলো অফিস, ওপারে বেক্সিমকো মিডিয়ার অফিস,যুবদাও তখন ধানমন্ডি ছেড়ে ওই অফিসেই বসেন। পাতাল সড়ক  দিয়ে ওপারে উঠে মোড় ঘুরতেই যুবদার অফিস। প্রথম আলোও তখন সবে যাত্রা শুরু করেছে। সম্পাদক মতিউর রহমান প্রায় প্রতিদিনই সবাইকে একবার করে মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, সেলিব্রেটিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখাটা সাংবাদিকদের পবিত্র দায়িত্ব। তো, যুবদা’কে ততদিনে যুবদা ডাকতে শুরু করে দিয়েছি, সপ্তাহে অন্তত তিনদিন অফিসে ঢোকার আগে-পরে তাকে একবার করে  হ্যালো বলে যাই! যতবার গেছি, দেখেছি তাঁর সামনে লোকজন/ভক্ত/নাট্যব্যক্তিত্ব কেউ না কেউ বসে। দু’একবার টিপ্পনি কেটেছি, আচ্ছা যুবদা, বেক্সিমকো আপনাকে  ঠিক কি কারনে পয়সা দেয় বলেন তো!যুবদা এ কথার কোনো উত্তর দিতেন না, স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে মিটমিট করে হাসতেন।

যুবদাকে মঞ্চে যতবার দেখেছি, ততবার বিস্মিত হয়ে আবিষ্কার করেছি একজন মানুষ কত প্রবলভাবে,কতো উজ্জলভাবে মঞ্চ দখল করে রাখতে পারেন। তিনি মঞ্চে পা রাখা মাত্রই  হলভর্তি দর্শকের চোখ যেন চুম্বকের মতো আটকে যেতো তাঁর উপর, সেই চোখ যুবদাকে ঘিরেই কেবল আবর্তিত হতে বাধ্য। দেখেছি শুধুমাত্র দাঁড়ানোর ভঙ্গি, বা এমনকি একটি শব্দ উচ্চারণের ভেতর দিয়ে কিভাবে তিনি মনোযোগ কেড়ে নেন। সম্ভবত ২০০১ এর পর থেকে প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক নাসরীন জাহানের লেখা স্ক্রিপ্ট নিয়ে মঞ্চে তিনি নাটক পরিচালনার কাজ শুর করেন । নাসরীনসহ মাঝে মাঝে সন্ধ্যার পর হানা দিয়েছি যুবদার রিহার্সালে। কি নিষ্ঠা, কি অপরিসীম ধৈর্য্য নিয়ে তিনি রিহার্সাল করাচ্ছেন !তখন দেখেছি, নাগরিকে’র ছেলেমেয়েরা কি ভক্তিভরে যুবদার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকতেন । ‘রক্তকরবী’ যখন ঢাকার মঞ্চ কাঁপিয়ে দিচ্ছে, এই তো খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, কালব্যাধি যুবদার হাঁটার ক্ষমতা পুরোপুরি কেড়ে নেয়নি তখনো, দেখলাম গানে, চলনে-বলনে কি করে যুবদা রক্তকরবীতে গতি সঞ্চার করছেন। বাস্তব জীবনে সামান্য খুঁড়িয়ে হাঁটা শুরু হয়েছিলো যুবদার তখন, কিন্তু রক্তকরবীতে সেটাকে সার্থকভাবেই আড়াল করতে পেরেছিলেন তিনি।

এ সময়ের তুখোড় নাট্যনির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী তখন নাটক তৈরি করবেন বলে এলোমেলো ঘুরে বেড়াচ্ছেন ঢাকা শহরে। তাকেঁ কেউ চেনেন না। আমাদের বন্ধু মানুষ তিনি। আজিজ মার্কেটে ফারুকী নানারকম গল্পের প্লট বলে বলে হাসাতে হাসাতে আমাদের পেটে খিল লাগিয়ে দেয় সেই দিনগুলোতে। ফারুকী একদিন ফোন করে বলেন, “সেরীন একটা নাটক বানাবার বন্দোবস্ত করেছি, নামি-দামি কাউকে পয়সা দিতে পারবো না, তবে শুধু যুবদা’কে রাজি করাতে পেরেছি। যুবদা তাদেঁর আবৃত্তি দলের একজন মেয়ের (তাঁর নাম এই মুহুর্তে মনে পড়ছে না বলে দু:খিত) সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনিও বিনা পয়সায় কাজ করতে রাজি হয়েছেন। আপনি কি আমার নাটকে থাকবেন, নিজেরা নিজেরাই একটা নাটক বানিয়ে ফেলি, কি বলেন?” ফারুকী বন্ধু, এটি তাঁর প্রথম টেলিভিশন নাটক, তাঁর কাজ অবশ্যই করে দিতে হবে। পরে যুবদাও ফারুকীর পক্ষ হয়ে আমায় বলেন, “সেরীন চলে আয়, কাজটা করে দেই ছেলেটাকে।“ প্রথম আলো অফিসে তখন নিজের মৃত্যুঘন্টা ছাড়া কারো জন্য ছুটি বরাদ্দ নেই। প্রথম কয়েকমাস কাউকে ছুটি না নিতে অনুরোধ করেছেন সম্পাদক মতিউর রহমান। ফারুকী (ওকে আমরা সবসময় ‘সরো’ বলেই ডেকেছি, এখনো তাই ডাকি) জানালো শুধু একদিন ছুটি নিলেই চলবে সেরীন। নাটকের নাম ‘ওয়েটিং রুম’, যদ্দুর মনে পড়ে। নাটকটি প্রচারিত হয়েছিলো একুশে টেলিভিশনে।পরবর্তীতে সম্ভবত ফারুকী ‘ওয়েটিং রুম’কে টেলিফিল্ম  করেছিলো, আমি কনফার্ম না, কারণ ততদিনে আমি পাড়ি জমিয়েছি কানাডায়। যুবদা’র সঙ্গে নাটকে অভিনয় বলতে ওই একটিই, চরিত্রটি ছিলো তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর ভূমিকা। মনে আছে, শ্যুটিংয়ে একবার কিছুতেই সহজ হতে পারছিলাম না, বারবার ফিক করে হেসে ফেলছিলাম বলে যুবদা সটান একহাত উপরে তুলেছিলেন থাপ্পড় দেবে বলে!পরক্ষণেই হেসে ফেলেছিলেন। ততদিনে তিনি আমাকে তুই তুই করে বলা শুরু করে দিয়েছিলেন।

দিনে দিনে সেই যুবদাকে দেখলাম ক্রমাগত ক্ষয়ে যেতে, সটান হাঁটা থেকে একপাশে কাত হয়ে আসছিলেন তিনি, প্রথমে খুঁড়িয়ে, তারাপর লেংচিয়ে, তারপর ক্র্যাচে ভর দিয়ে আর সবশেষে হুইল চেয়ারে। আমার কানাডায় পাড়ি দেবার কিছুদিন আগে, ২০০৩ সালের শেষ দিকে বনানীতে “এসিড সারভাইভরস ফাউন্ডেশনে”(ততক্ষনে আমি প্রথম আলো ছেড়ে দিয়ে বেসরকারি এই সংস্থাটিতে যোগ দিয়েছি) এসেছিলেন। যুবদা ক্র্যাচে ভর দিয়ে চলতেন তখন, তারপরও  তাকেঁ দেখতে আমার অফিসের সব সহকর্মীরা ভিড় জমিয়েছিলো দরজায়, একে-ওকে ঠেলাঠেলি করে উঁকিঝুঁকি মারছিলো। যুবদা তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে সবাইকে হাত বাড়িয়ে ভেতরে ডেকেছেন, কথা বলেছেন, কোথাও কোনো বাহাদুরবাজী নেই, অহংকার নেই, একেবারে মাটির মানুষ। নাটক-মঞ্চ প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন সেই দিনগুলোতে, তবুও কি ভীষণ জনপ্রিয়তা তাঁর, দেবদূতের মতোই তাঁকে দেখতো ভক্ত দর্শক-শ্রোতা।

আশ্চর্য ! সেই যুবদা আজ কেবলি স্মৃতি!পেছনের দিনগুলোর দিকে তাকালে কতো কিছু যে মনের ভেতর ভীড় করে, কতো কথা বেরিয়ে আসতে চায়। সেই সব কথা ভাবতে গিয়ে, লিখতে গিয়ে  বারবার চোখ ভিজে আসে। তবুও খুবই  ব্যক্তিগত একটি স্মৃতির কথা বলি। আমার বিয়ের কয়েকদিন মাত্র আগের কথা।প্রথম আলোর অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে সাগর (শওগাত আলী সাগর)  জাপান যাচ্ছে। সাগরের সঙ্গে তখন আমার খানিকটা  ভালোবাসাবাসি  চলছে, সহকর্মীরা তখনো ব্যাপারটা টের  পেয়ে ওঠেনি। ওর এটা প্রথম দেশের বাইরে ট্যুর।ইচ্ছে হলো তার জন্য ক’টা শার্ট কিনে দেই। কেনাকাটার ব্যাপারে সাগর যেমন আনাড়ি, আমিও। অথচ শার্টটা কিনবোই আমি। এই মহাবিপদে কার সাহায্য চাওয়া যায়? কে আবার, যুবদা! সাগরের কথা তাঁকে বলতেই তিনি অফিস থেকে বেরিয়ে পরেন আমায় নিয়ে। ‘ক্যাটস আই’তে গিয়ে  নিজে পছন্দ করে দু’টি শার্ট হাতে ধরিয়ে দেন যুবদা। একটি খয়েরী, আরেকটি সাদা।

এক যুগের বেশি সময় পরও, প্রিয় যুবদা যখন না ফেরার দেশে,সেই সাদা শার্টটা এখনো রয়ে গেছে আমাদের ঘরে,আমাদের সাথে। প্রিয় যুবদাকে বারবার মনে করিয়ে দেবার জন্য !

(লেখাটি নতুন দেশ অনলাইন পত্রিকা থেকে নেয়া)

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.