পাকিস্তানি পণ্য বর্জন ও আমার কিছু কথা

Boycott Pakistaniলায়লা আফরোজ: গতকাল সন্ধ্যায় অফিস শেষে বাড়ী ফিরছিলাম। সায়েন্স ল্যাবরেটরি পেরিয়ে, অলিয়ঁস ফ্রঁসেস ক্রস করে ধানমন্ডি ৫ নাম্বারের মাথায় ‘প্রিয়’ আর ‘আলমাস’ জেনারেল স্টোরের কাছাকাছি পৌঁছতেই মানুষের জটলা দেখে রিকশাওয়ালা রিকশার গতি কমালো। দেখতে পেলাম, বেশ কিছু ইয়াং মোটর সাইক্লিস্ট দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদে মুখর। হাতে তাদের সুদৃশ্য প্ল্যাকার্ড, যাতে লেখা ‘পাকিস্তানী পণ্য বর্জন করো’। মনটা খুশিতে ভরে উঠলো ।

আর তক্ষুনি বিস্মৃতির অতল থেকে মনের কোণে সাঁতরে উঠে এলো দুটি নাম আয়েশা আর আসলাম, ওরা আমার দুই পাকিস্তানী কাজিন।

তখনো আমাদের দেশে সিনথেটিক কম্বল প্রবেশ করেনি। শীতের শুরুতেই ফি-বছর ধুনকার এসে ধনুকের মত একটা সুন্দর যন্ত্র দিয়ে পুরান লেপ থেকে তুলো বের করে কাব্যিক ছন্দে একটা একঘেঁয়ে সুর ছড়িয়ে দিনভর তুলো ধুনো করত। তারপর, পাটিতে লাল সালু পেতে নতুন লেপ-রজাই বানাতে বসতো। বিশাল সুঁইয়ে সুতো ঢ়ুকিয়ে তেরছাভাবে লেপের গায়ে নান্দনিক ফোঁড়ে বিচিত্র নকশা ফুটিয়ে তুলত। ঐ একটি দিনের জন্য আমি সারা বছর অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম। রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে আমি ধুনকারের সকল কর্মকান্ড পর্যবেক্ষণ করতাম এবং সেইসাথে যোগালির কাজটিও। এমন একজন একনিষ্ঠ দর্শক এবং বিনা পয়সার যোগালি পেয়ে ধুনকারও খুব উৎসাহ পেত। তার শিল্পকর্মের একমাত্র সমঝদার এবং দর্শক আমি এটা ঠাউরে ধুনকার ব্যাটা মাঝে মাঝে একটু বেশী রকমের হাতের কসরত প্রদর্শন করত! ঐ মানুষটিকে আমার তখন ঠিক যাদুকরের মতো লাগত।

বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই আম্মাকে দেখেছি-পুরনো শাড়ী, ছেঁড়া লুঙ্গী, বিছানার চাদর, ফেঁসে যাওয়া টেবিল ক্লথ, রঙচটা জানালার পর্দা, সুতির ছেঁড়া মশারী (তখন নাইলনের মশারী ছিল না) সব যত্ন করে তুলে রেখে দিতেন। শীত আসার আগে আগে সেগুলোকে একসাথে জড়ো করে রিঠা দিয়ে কেচে-ধুয়ে পরিস্কার করে শুকোতেন। তারপর, শাড়ীর পাড় থেকে রঙিন সুতো বের করে ইয়াব্বড়ো সুঁইয়ের ভেতর সেই সুতো ঢুকিয়ে, পেন্সিল দিয়ে নানা রকমের ফুল-লতা-পাতা এঁকে ছোটো বড়ো নানা আকারের নানা সাইজের কাঁথা সেলাই করতেন। সেলাই শেষ হলে সুঁইগুলোকে আবার কেরোসিন তেলের বোতলের মধ্যে পুরে রেখে দিতেন যাতে জং না ধরে!

আমাদের ছোটোবেলায় বড্ডো বেশি হিম পড়ত! ফ্লানেল-কাপড় কিনে দর্জি দিয়ে ঢাউস সাইজের হাঁটু পর্যন্ত লম্বা কোট বানানো হোতো আমাদের জন্য, কিন্তু তাতেও শীত মানতো না! প্রচন্ড শীতে আমরা ফুলে ফুলে উঠতাম। তখন আম্মা তাঁর নিপুনহাতে সেলাই করা কাঁথাগুলো ট্র্যাঙ্কের ভেতর থেকে বের করতেন। তারপর, কর্পুরের নেশা ধরানো প্রাচীন স্মৃতি-গন্ধে ভরপুর সেই নরম কাঁথাগুলো দিয়ে আমাদের সারা শরীর পেঁচিয়ে দিয়ে গলার কাছে একটা গিট্টু মেরে দিতেন। ব্যাস, শীত আর আমাদের ধারে কাছে ঘেঁসতে পারত না! কাঁথায়-মোড়ানো প্যাকেট হয়ে আমরা ছোটো খাটো মনস্টারের হয়ে ঘরময় ঘুরে বেড়াতাম আর দস্যিপনা করতাম।

এখনকার দিনের মতো তখন এতো সুন্দর বাহারী গরম কাপড় পাওয়া যেতো না। বড়ো ভাই বিদেশ গেলে কখনো সখনো আমাদের জন্য নিয়ে আসতেন দু’টো একটা সোয়েটার, দস্তানা, মোজা, কান টুপি, মাফলার ইত্যাদি। দিল্লীতে ট্রানজিট পেলে, আম্মার জন্য একটি কাশ্মীরী-শল বা একটি আল্‌ওয়ান। সেই শল-আল্‌ওয়ান কে-কখন পালা করে গায়ে জড়াবো, তার জন্য সারাক্ষণ বাড়ীতে একটা যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করতো। অধিকাংশ সময়, শক্তির আধিক্য এবং দৈর্ঘ-প্রস্থে বড়ো হওয়ার কারণে সেই অসম যুদ্ধে ছোটোদের পরাজয় মেনে নিতে হতো। তবে, আমি সেই গ্যাঁদা-বয়স থেকেই দুর্যোধনের আদর্শে বিশ্বাসী ছিলাম। দুর্যোধনের মতো আমিও অতি খর্বকায় দেহটি নিয়ে ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সুচাগ্র মেদিনী’ বলে ঝাঁপিয়ে পড়তাম অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে। শল-আল্‌ওয়ানের অধিকার ছিনিয়ে নিতে ব্যর্থ হলেও, প্রতিপক্ষের একগাছি মাথার চুল হাতের মুঠিতে তুলে আনতে ব্যর্থ হইনি কখনোই!

তখনকার দিনে সব বাড়ীতেই মায়েরা বাচ্চাদের জন্য উল দিয়ে মোজা-সোয়েটার-কান টুপী-মাফলার বুনতেন। নতুন উলের দাম বেশি ছিল বলে প্রতি বছর বোনা হতো না। কখনও কখনও পুরনো সোয়েটার খুলে সেই উল দিয়ে আবার নতুন করে বোনা হতো। একজনের গায়ে ছোট হয়ে যাওয়া গরম কাপড় পরের বছর অন্যজনে পরতাম। এটাই তখনকার দিনে রেওয়াজ ছিল। এই যে, একজনের সোয়েটার আমরা অন্যজনে পরতাম, তার মধ্য দিয়ে এক ধরণের সাম্যবাদ কায়েম হতো। কি অবলীলায়, ভাইয়েরটা বোনে আবার বোনেরটা ভাইয়ে পরতাম! পোষাকের ক্ষেত্রে জেন্ডার-বিভেদের ব্যাপারটা তখনকার দিনে এতো প্রকট হয়ে ওঠে নি! ‘ইউনিসেক্স’ শব্দটি তখনও আমাদের কাছে অপরিচিত ছিল।

আমার মায়ের কোন বোন ছিল না, একটি মাত্র বড়ো ভাই ছিলেন। সেই মামা নামক মানুষটিকে জীবনে একবার মাত্র দেখার সুযোগ হয়েছিল! পেশাগত কারণে তিনি করাচীতে থাকতেন। মুক্তিযুদ্ধের আগের বছর আমার নানীজী পরলোকগমন করেন। মামা এসেছিলেন মায়ের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে, পারলৌকিক ক্রিয়াদি সারতে। আমার আম্মা অর্থাৎ তাঁর একমাত্র বিধবা বোন এবং বোনের সন্তানদের তিনি প্রাণাধিক ভালোবাসতেন। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর, মামা দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন তাঁরই সহকর্মী এক পাকিস্তানি মহিলাকে। সেই পেশোওয়ারী মহিলা কোনদিন পূর্ব-পাকিস্তানে আসেননি, আমার নানীজির সাথে কোনদিন তাঁর দেখা হয়নি! পূর্ব-পাকিস্তানে ঝড়-বৃষ্টি-বন্যা-সাপ, এ-সবে আমার পাকি-মামীর খুব ভয় ছিল। মামা নিতান্তই ভদ্রলোক ছিলেন, স্ত্রীকে কখনোই এ নিয়ে জোরাজুরি করেন নি তিনি। মায়ের শেষ-কাজ সম্পন্ন করে আমার সবেধন নীলমণি মামাটি করাচীতে ফিরে গিয়েই কঠিন অসুখে পড়েন। মরণব্যাধি ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে নানীজীর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীর আগেই, ১৯৭১ সালের মাঝামাঝি সময়ে তিনি ধরাধাম ত্যাগ করেন। পাকিস্থানের মাটিতেই তাঁর কবর হয়। কথায় বলে, বয়স্করা মারা গেলে বছরখানেক খুব সাবধানে থাকতে হয়। কারণ, এই এক বছরের মধ্যে নাকি মৃত ব্যক্তিটি তাঁর প্রিয় মানুষটিকে তাঁর কাছে নিয়ে যেতে চেষ্টা করেন, টান দেন! এক বছরের ব্যবধানে মা-ছেলের মৃত্যু যেন সেই লোককথাকেই আরেকবার সত্য প্রমাণ করল!

মামার দুটি সন্তান ছিল, লেখার শুরুতেই তাদের নাম উল্লেখ করেছি। ওরা তখন, করাচী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত। শুনেছি, ওদের মায়ের মতোই ওরা সমান উন্নাসিক ছিল। বাঙাল-মুলুক সম্পর্কে ওদের কোন প্রকার সহানুভূতি বা শ্রদ্ধাবোধ ছিল না! ফলে, মামার মৃত্যুর সাথে সাথেই ওই চ্যাপ্টার ক্লোজ হয়ে গিয়েছিল! তা-না হলে যে কি দশা হতো আজ, সেকথা ভেবেই শিউরে উঠি! আমার ন্যাশনালিস্ট মা কোনদিন ওদের কথা মুখে আনতেন না। কেবল, মাঝে মাঝে মৃত ভাইয়ের কথা স্মরণ করে হাপুস নয়নে কাঁদতেন। খুব আক্ষেপ করে বলতেন, ‘যুদ্ধ না বাধলে আমার ভাই ঠিক বাংলাদেশে চলে আসতো, বৌ-বাচ্চা ফেলে’। যদিও তাঁর কথায় আমরা আস্থা স্থাপন করতে পারিনি কখনোই। কারণ, মামা যে তাঁর পাকি-পরিবারে মাইনোরিটি হয়ে ছিলেন সেটা বুঝতে আমাদের বাকি ছিল না! আর, সন্তানের মায়া, রক্তের টান ক’জনেই বা অস্বীকার করতে পারে! ভাগ্যিস, মামা দেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই মরে গিয়েছিলেন! মরে গিয়ে তিনি নিজেও বেঁচে গেছেন আর আমাদেরও বাঁচিয়ে দিয়ে গেছেন। মৃত্যুও কখনো কখনো এমন কাঙ্ক্ষিত হয়!

জীবনে মাত্র একবার সাক্ষাৎ পাওয়া এই মামাকে নানা কারণে আমি আজো ভুলতে পারিনি! ফি-বছর পাকিস্থান থেকে মামা আমাদের জন্য চালান পাঠাতেন। সুদৃশ্য মোড়োকের ভেতর থেকে বের হোতো-উলেন শল, ব্রোকেড-টফেটা কাপডের থান, ড্রাই ফ্রুটস! কিসমিস, আখরোট, কাসু নাটস, পেস্তা-বাদাম, চিলগুজা, আমস্বত্ত, শুকনো খেজুর, শুকনো ডুমুর, নানা রকমের সুগন্ধীযুক্ত পান-মাশালা!

এসবের কিছুই আমাকে খুব একটা আকর্ষণ করতো না, একমাত্র হালুয়া ছাড়া। এই হালুয়াগুলো থাকতো গোলাকৃতি টিনের ডিব্বার ভেতর। হাতুড়ি-বাটাল দিয়ে ডিব্বার মুখ কেটে তবেই হালুয়া বের করতে হতো! কী অপরূপ রঙ ছিল সেই হালুয়ার, আকাশী-সোনালী-গোলাপী-কমলা! খাঁটি ঘিয়ে ভাজা সেই হালুয়ার কী অপূর্ব স্বাদ! কিন্তু ১৯৭১ সালে পাক্‌-বাহিনীর নির্মম গণহত্যার কথা মনে পড়লে আজো আমার ভেতর থেকে সেই পাকি-হালুয়া পাক দিয়ে ওঠে, বিবমিষা হয়! ‘মেড ইন পাকিস্থান’ লেখা কোন দ্রব্যের প্রতি আর কোনদিন আমার ভেতর কোন আগ্রহ জন্ম নেয়নি!

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.