সাহেরা কথা-৫

Leena Haq
লীনা হক

লীনা হক: অফিসের কাজে কাঠমান্ডু যাচ্ছিলাম – প্রায় ১০ দিনের প্ল্যান তার উপরে ডিসেম্বরের শীত, কাপড় জুতার এক গাঠঠী নিতে হবে। সাহেরা আমার সুটকেস গোছাতে সাহায্য করছিলো। গোছাতে গোছাতে গল্প করি আমরা। শুরু হয় স্বাভাবিক ভাবেই আমার চাকরি, দেশের বাইরে যাওয়া ইত্যাদি বিষয় নিয়ে। রিজিওনাল প্রোগ্রাম লঞ্চিং প্রোগ্রাম- শাড়ি পরতে হবে, সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে মেয়েরা একই রঙের শাড়ি পরবে আর ছেলেরা একই রঙের টাই।

তো সেই রঙের শাড়ি বাছাই করতে করতে আমি বললাম ‘ভালো তেমন কোনো শাড়িই দেখছি নাই আমার ক্লজেটে। ভারী একটা সিল্ক হলে এই শীতে আরাম হবে। কয়েকটা ভালো শাড়ি কিনতে হবে এই ধরনের জমকালো অনুষ্ঠানে পরার জন্য।’

আমার পাশে দাঁড়ানো সাহেরা ক্লজেটে ভিতরে সারি সারি ঝোলানো শাড়ি গুলির দিকে তাকিয়ে অবাক বিস্ময়ে বলল ‘তোমার আরও শাড়ি কিনা নাগবে আফা? এত্ত এত্ত শাড়িতেও তোমার হইবে না ? বাপরে …তোমরা গুলান ধনী মানুষ, তোমার ঘরের কতাই আলাদা! হামার তিন খান শাড়ি আছে !”

আমার লাল চওড়া পাড় ঘিয়ে রঙের গরদে মোলায়েম হাত বোলাতে বোলাতে সাহেরা জানালো তিনটা শাড়ির বিশাল সম্ভারের মধ্যে দুইটাই আমার দেয়া। বিয়ের সময় তার শ্বশুর বাড়ী থেকে একটা লাল শাড়ি দিয়েছিল, আর তার বাবা দিয়েছিল একটা দামী জরি পাড় ‘সিলিক’ শাড়ি আর একটা ছাপা সুতির শাড়ি। বিয়ের পর প্রায় ৫ বছর সে গ্রামে ছিলো, তখন সে সবসময় শাড়িই পরত। কিন্তু সেইগুলি ছিল বেশিরভাগ নীল, বেগুনী অথবা অথবা লালচে খয়েরীরঙের এক রঙা পাড় সহ শাড়ি। লাল অবশ্য সাহেরার উচ্চারণে ‘নাল’ কিন্তু মজার ব্যাপার হলো রং না বলে সে বলবে ‘কালার’!

সে মনে করতে পারলো ঢাকায় আসার আগে পর্যন্ত বছরে দুটো কি বেশী হলে তিনটে শাড়ি বরাদ্দ থাকত তার জন্য। সে একটা ঈদে একটা গোলাপী ছাপা শাড়ি পেয়েছিল স্বামীর কাছ থেকে আর একবার অনেক অনুরোধ , অনুযোগ আর অভিমান করে একটা লাল পাড়ের হলুদ শাড়ি কিনেছিলো। শুধু নীল বা বেগুনী রঙের শাড়ি কেন কেনা হতো জানতে চাইলে সে বলল’ নীল, বেগুনী এইসব রঙের কাপড়ে ময়লা অত ধরে না!”

বুঝতে পারলাম, ময়লা না ধরার ব্যাপারটি আসলে ওই সব রঙে ময়লাটা সহজে বুঝা যায় না! সাবান কাচার খরচ কম লাগে। একবার তার মা যাকাতের পাওয়া শাড়ি দিয়েছিল, শাড়িটি সুন্দর ছিলো, কিন্তু চেক শাড়িটির ভিতরে ছেঁড়া থাকাতে সে পরতে পারে নাই, কাঁথা সেলাই করেছিল, কাঁথাটি এখনো আছে তার কাছে।

ঢাকায় আসার পরে সে শাড়ি পরা ছেড়েই দিয়েছে। মানুষের বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে শুরু করার পরে সালোয়ার কুর্তাই তার নিত্যকার পরিধেয়। ঈদেও সে এই পোষাক পেতেই পছন্দ করে। সালোয়ার কুর্তা পরতে সহজ , চলাফেরা করা সহজ, পরিষ্কার রাখা সহজ আর দামেও মোটামোটি নাগালের মধ্যে। তাছাড়া বেশিরভাগ সময় বাসার ম্যাডামদের পুরনো কামিজ পাওয়া যায় আর বেশ ভালই চলে তা দিয়ে।

আমিও তো বেশীরভাগ পুরোনো কাপড়ই দেই তাকে, শুধু ঈদে নুতন জামা দেয়া হয়, এমনকি তার স্বামীর জন্য আমার ভাইদের কাছে থেকে চেয়ে আনি পুরোনো শার্ট বা প্যান্ট, সুয়েটার, তার মেয়ের জন্য আমার বোনের মেয়েদের পুরোনো জামা। এমনকি পুরোনো মশারী বা বিছানার চাদর। সাহেরার জীবনের বেশিরভাগ কাপড় জামাই অন্যের ব্যবহৃত। মনটা বিষন্ন হয়ে উঠলো। নিজেদের চাদর মশারী নুতন কেনার সময় কেন কোনদিন মনে হয়নি যে সাহেরার জন্য একটি নুতন বিছানার চাদর বা মশারি কিনি! বরং রং জ্বলা বিছানার চাদর আর ফুটো হয়ে যাওয়া মশারিই তো সবসময় বরাদ্দ তার।

কেন এমন হবে? একজনের পোশাকের হিসেব নাই আর একজন অন্যের ব্যবহৃত পোশাকে দিন যাপন করে? আমি নিজেও তো কোনদিন এমনভাবে দেখিনি বিষয়টিকে।

মনের মধ্যে গ্লানি চেপে রেখে বললাম,’ সাহেরা, এখান থেকে যেই শাড়িটা তোমার পছন্দ, তুমি নাও প্লিজ। তুমি একটা শাড়ি নিলে আমি অনেক খুশি হব।’ সাহেরা সলজ্জ্ব হাসিতে ইতস্তত গলায় বললো ‘ আফা, তোমার ঘরের এইসব সিলিক কাতান শাড়ি মুই কোনঠে পড়ি যাইম? দিবারই যদি তুমি চান বরং মোক একনা নাল কালারের পাড়ের ভালো সুতি শাড়ি কিনি দেও, সেটা ভালো হইবে মোর।’

মূহূর্তে আমি বাস্তবতায়! তাইতো, সাহেরা এইসব পরে কোথায় যাবে। আর গ্লানিবোধ ফিরে এলো সেইসাথে! আবারও আমি ব্যবহার করা শাড়িই দিতে চাচ্ছিলাম সাহেরাকে! কেন আমার মাথায় এলো না নুতন শাড়ি কিনে দেয়ার কথাটা! নিজের ব্যবহৃত দামী শাড়ি তাকে উপহার দিয়ে নিজেকে মহৎ প্রমাণ করতে চাইছিলাম। কিন্তু কার কাছে? সাহেরার কাছে? কিন্তু সাহেরা তো এইসব মহৎ মহৎ খেলার পরোয়া করে না। তার জীবনে প্রয়োজনটাই প্রধান। এমনকি সেই প্রয়োজনবোধ শখকেও ছাপিয়ে যায়! আমি সস্তা আবেগে মহৎ হতে চাইলেও সাহেরা বাস্তবতার পরিষ্কার কিন্তু কঠিন চাতালে দাঁড়িয়ে সেই খানিক চতুর আবেগকে হারিয়ে দিল।

জয়তু সাহেরা!

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.