বন্দীদশার ৫ ঘন্টা!

Gonojagoron attackedরওশন আরা নীপা: ঠিক কবে থেকে মিছিলে , আন্দোলনে ঠিক বলতে পারবো না। তবে একটু আধটু মনে আছে, সেটা সম্ভবত ১৯৭৯ সালে। হাফেজ্জী হুজুর নামক একজন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করেছিলেন তখন তার বিরূদ্ধে একটা লিফলেট ছাপিয়ে ছিল কোন এক দল – ‘হাফেজী হুজুর ১০১ টা প্রশ্নের জবাব চাই’ এরকম কিছু একটা। শীতের সকালে আমার গুরু এবং বড় ভাই মুক্তিযোদ্ধা ওহিদুল ইসলাম আশরাফ আমাকে সেই লিফলেট জোরে জোরে পড়তে বলতেন আর পড়াতেন বিচিন্তা! এরপর বিচিত্রায় এ্যান্থনী মাসকারেনহাস এর ‘লিগাসি অব ব্লাড’ পড়তে পড়তে চোখ দিয়ে অঝোরে জল ঝরতে থাকে আমাদের স্বাধীনতার জন্য এত রক্তের মূল্য দেখে।

এরপর ৮০ সালের পর কোন এক সময় মিছিলে ধাওয়া খেয়েছিলাম, আমি তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি। তারপর এরশাদ বিরোধী আন্দোলন। আমি তখন কলেজে পড়ি, সেই সময় মিছিলে ধাওয়া খেয়েছি বহুবার। এক ভোরে রাজশাহী থেকে সিরাজগঞ্জ রওনা দিয়েছি জীবন হাতে করে, কখনও ভ্যানে , কখনও হেঁটে , কখনও লোকাল বাসে রাত ২টার সময় যখন বাসায় পৌঁছি আমার মা-বাবা হাউ মাউ করে কেঁদেছিল।কিন্তু আমি অবিচল ছিলাম। শুধূ সারা রাস্তায় মুক্তিযুদ্ধের সময়কার শরণার্থীদের অভিযাত্রার কথা মনে হচ্ছিল।

গত ৫ ফেব্রুয়ারির শাহবাগ আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে থেকেছি দিন রাত্রি । যেদিন রাজীব মারা যায়, সেদিনও সবার আগে আমি ট্রাকে উঠেছি সবাইকে সাহস জোগানোর জন্য। আমি আর জোবায়দা নাসরিন কনা ট্রাকের মধ্যে দাঁড়িয়ে সবাইকে আশ্বস্ত করছিলাম। এরপর ৬ এপ্রিল যখন হেফাজত আক্রমণ করে তখনও আমি , শাওন, বর্ষা আর শাম্মী ট্রাকে উঠে ইমরান , মারুফ ওদেরকে আড়াল করছিলাম যাতে ওদেরকে কেউ কিছু না করতে পারে।

আমার মেয়ে তখন টেলিভিশনে লাইভ দেখছিল আমাকে, আর অন্য দিকে হেফাজত এর লাঠি সোটা নিয়ে আক্রমণ ! সে আমাকে ফোন করছিল বারবার । আমি তখন মিঠু ( আমার হাজব্যান্ড)কে এই প্রথম বলেছিলাম, আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি ,  আমার কিছু হলে মেয়েকে দেখ! না, আমার কিছু হয়নি। আমার বিশ্বাস ছিল নেত্রী শেখ হাসিনার প্রতি। যতদিন বঙ্গবন্ধু কন্যা আমাদের মাথার উপরে আছেন, ততদিন আমাদের কিছু হবে না। কিন্তু গতকাল আর আজকের ঘটনায় আমি হতবিহ্বল!

দীর্ঘ ১০ মাসের আন্দোলনে গণজাগরণ মঞ্চের কোন ছেলে একটা ইটও ছোড়েনি কারও প্রতি, তবে কেন এই নিষ্ঠুরতা! একটু আগে মিলি নামে একজন গণজাগরন মঞ্চের কর্মী ফোনে কেঁদে ফেলল , বন্দুকের বাঁট দিয়ে ওকে এমনভাবে পিটিয়েছে ওর শরীরের অনেক জায়গায় জখম হয়ে গেছে, বনানীকে লাঠি দিয়ে পিটাতে পিটাতে ‘মালাউনের বাচ্চা’ বলে গালি দিয়েছে, বিন্দুর বুকের উপরে বুট দিয়ে পিষিয়েছে আর আজ আমাকে ওরা যখন ধস্তাধস্তি করে নিয়ে যাচ্ছিল আমি তখন সম্পূর্ণভাবেই তাদের সহযোগিতা করে ভ্যানে উঠছিলাম।কিন্তু নারী পুলিশ কোন কারণ ছাড়াই আমার জামা ধরে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে গিয়েছে আর চুলের ঝুটি ধরে অসভ্য ভাষায় বকাবকি করেছে । প্রথম দিকে আমি বুঝতেই পারিনি যে, ওরা আমাকে গ্রেফতার করতে পারে। ধাক্কা দিয়ে যখন ভ্যানের ভিতর ঠেলে ফেলল তখন আমার মাথা কাজ করছিল না। আমি দুই মিনিটের জন্য পুরো অন্ধকার ছিলাম। একটু পরে আরও দুইজনকে একই ভাবে টেনে হিঁচড়ে আনা হলো। আমি জানালা দিয়ে কাউকে কাউকে ডাকতে থাকলাম, কিন্তু কেউ শুনতে পাচ্ছে না।

জানালা দিয়ে দেখলাম মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকারকে পিটাচ্ছে পুলিশ। এবার আর সন্দেহ রইলোনা না আমার ভাগ্য বোধহয় পুলিশ হাজত। আমি তাৎক্ষণিকভাবে মিঠুকে ফোন দিলাম, ও চমকে উঠলো। আমি ওকে অভয় দিলাম । একটু পর গাড়ি চলতে থাকলো, কিন্তু কোথায় যাচ্ছে বুঝতে পারছিনা। মিঠু জানতে চাচ্ছে ,অন্যরা ফোন দিচ্ছে কিন্তু কিছুই বলতে পারছিনা। আমার সামনের ছেলে দুটো খুব ভয় পেয়েছে। ওদের বয়স কম, কখনও এরকম সমস্যায় পড়েনি। মাহমুদুল হাসান নামের ছেলেটি একবারেই নিরীহ, ওর মা হাসপাতালে, সে বার বার পুলিশের কাছে কাকুতি-মিনতি করছে ওকে যেন ছেড়ে দেয়, পুলিশ ওকে ধমকে বসিয়ে দিচ্ছে। এর কিছুক্ষণ পর ছেলেটি হঠাৎ আমাকে এক গাদা টাকা হাতে দিয়ে বলল, আপা এই টাকাটা আপনার ব্যাগে রাখেন আমার মা হাসপাতালে সেই জন্য টাকাটা নিয়ে হাসপাতালে যাচ্ছিলাম। আপনার কাছে থাকলে নিরাপদ থাকবে , আমার কাছ থেকে ওরা নিয়ে নিতে পারে। আমি কিছু না বলে ওর টাকাটা নিয়ে ব্যাগে রাখলাম। যদিও আমি জানি না, আমার ভাগ্যেই বা কি আছে? অনন্য আজাদ ওর মাকে ফোন দেবার পর ওর মা বারবার ফোন করছে। আমি বুঝতে পারছিলাম ওর মা কাঁদছে! অনন্য নিজেও ভীষণ নার্ভাস। এর মধ্যে আমি ফোন দিয়ে ছবি তুলে ফেসবুকে আপ করলাম যাতে সবাই জানতে পারে যে আমরা আটক হয়েছি। না, আমি ভয় পাইনি । কেন জানি আমার আবারও মনে হলো যতদিন শেখ হাসিনা আমাদের মাথার উপর আছে ততদিন কিছু হবে না।

শেষ পর্যন্ত খারাপ কিছু হয়নি। মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কনস্টেবল যতটা দুর্ব্যবহার করেছে, ডিবি অফিসের কর্মকর্তারা ততটাই ভালো ব্যবহার করে তা পুষিয়ে দিয়েছেন। যদিও পুরোটা সময়ই আমাদেরকে বন্দী হিসাবেই ট্রিট করেছেন, কিন্তু নানা গল্প করছেন, চা খাওয়াচ্ছেন, কিন্তু ছাড়ছেন না। এর মাঝে বেশ কয়েকজন আমাদের বিষয়ে বোধহয় কথা বললেন কিন্তু উনারা ছাড়বার বিষয়ে কথা বলছেন না, আমাদের ঘিরে আছেন তিনজন পুলিশ কর্মকর্তা , গল্পের ছলে নানা খবর নিচ্ছেন ।

আমি বুঝতে পারছি ওনারা ইন্টারগেশন করছেন। ঘড়ির কাঁটায় ৫ টা বাজে, ৬ টা বাজে, না কোন অগ্রগতি নেই। একসময় আমি ওদের জিজ্ঞেস করলাম আমাদের নিয়ে কি করবেন ? ওনারা এড়িয়ে গেলেন । আমি তখন আশা ছেড়ে দিয়েছি ।

মনে মনে প্রস্তুতি নিতে লাগলাম হাজত বাসের। বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী স্মরণ করতে লাগলাম । তাঁর প্রথম কারাবাস হয়েছিল অষ্টম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায়, ১৩/১৪ বছর বয়সে। আর আমার বয়স তো ৪২ পেরিয়েছে! আমি পাশে বসা অনন্য আর হাসানকে দেখলাম , ওদের কে সাহস আমাকেই জোগাতে হবে , মনে মনে শক্তি সঞ্চয় করলাম। এভাবেই কেটে গেল প্রায় ৫ ঘন্টা! একসময় এক অফিসার এসে বললেন, আপনাকে কি কেউ নিতে এসেছে? আমি একটু হাসলাম, এর মধ্যে অনন্য বলল ওর মা এসেছে। সবকিছু মিলিয়ে অভিজ্ঞতাটা খারাপ না। তবে ৫ ঘন্টার বন্দী দশা থেকে বের হবার সময় মনে হলো সবে তো শুরু হলো সামনে বোধহয় আরও অনেক কিছু পাওনা আছে।

তো —- জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু

লেখক পরিচিতি: গণমাধ্যম কর্মী।

শেয়ার করুন:
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.