এ কেমন বর্বরতা!

Police at Gulshanউইমেন চ্যাপ্টার: অফিসের কাজে আজ (বৃহস্পতিবার) যাওয়া হয়নি গণজাগরণ মঞ্চের পাকিস্তানের দুতাবাস ঘেরাও কর্মসূচিতে। যদিও দ্বিতীয়দিনের কর্মসূচিটা নিয়ে মনে একটু দ্বিধা ছিল, তারপরও সতীর্থরা যেখানে, মন তো সেখানেই। তাই দুপুরের পর থেকে অস্থির হয়েছিল মনটা।

ফেসবুকে যখন একের পর এক মঞ্চের কর্মীদের ওপর পুলিশের হামলার ছবি আসছিল, কেমন যেন অবশ লাগছিল নিজেকে। সব পরিচিত মুখ, সেই ফেব্রুয়ারি থেকে একসাথে উঠাবসা, দীর্ঘদিনের আন্দোলনের সাথী একেকজন, খাবার ভাগাভাগি করে খাওয়া, কখনও না খেয়ে থাকা, সবই তো। এমনকি মন কষাকষি, ঝগড়া, ক্ষোভ, তাও একই সাথে। একেকটা বিজয়ে আবার সব ভুলে একে-অপরকে জড়িয়ে ধরা। আপন ঘর যেন এটা একটা।

টেলিভিশনে দেখলাম খুশী কবির আপা, শিপ্রাদি (বোস), রওশন আরা নীপা, শাম্মী হক, লোপা সবাই থানায় বসে আছে, তারও আগে তাদেরকে মোটামুটি নাজেহাল করে তুলে আনা হয়েছে। লোপা আর শাম্মীর জামা ছিঁড়ে ফেলেছে পুলিশ, আরিফ নূর, বাঁধন সব আহত। আহত হলো গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকারও। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তার চোখ বন্ধ।

পুলিশকে কেন এতো আগ্রাসী ভূমিকায় নামতে হলো, তা অজানা। এমনকি সংসদ সদস্য তারানা হালিমও এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন দেখলাম। আগের দিন বনানী নামের একটি মেয়েকে নিজেই নিয়ে গেছিলাম ইউনাইটেড হাসপাতালে, মেয়েটি রাস্তার পাশে বসে কাঁদছিল, ট্রমাটাইজড যাকে বলে। হাসপাতালে পেয়েছিলাম বাপ্পাদিত্য বসু আর নাফিজ বিন্দুকে। বিন্দুর বুকে বেয়নেটের রক্তাক্ত দাগ। ওকে নাকি পুলিশ বুট দিয়ে পাড়িয়েছে। ওখানেই শুনেছিলাম মুক্তিযোদ্ধা ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিনীর আঘাত পাওয়ার কথা। ছুটে এসেছিলাম তাঁর ধানমন্ডির বাসায়। শীতের মধ্যে বাম কাঁধে প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছেন তিনি পুলিশের ধাওয়ার সময় হুড়োহুড়িতে পড়ে। তারপরও নির্বিকার, খেদ নেই মনে, বললেন, আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। শত্রুপক্ষ চিহ্নিত, এখন ওদের দূর করার পালা। জীবনভর আন্দোলন করে আসা ছোটখাটো মানুষটার দৃঢ়তার কাছে আবারও নতজানু হই শ্রদ্ধায়।

এদিকে আরিফ নাকি স্ট্রোক করেছে শুনলাম। আছে সোহরাউয়ার্দী হাসপাতালে। মাত্র কিছুদিন আগেই শিবির তার মাথায় কোপ দিয়েছিল, তারও আগে থেকে তার হার্টে সমস্যা, আর আজ পুলিশের বাড়ি খেয়ে সেই বুকের অবস্থা কি, ভাবতেই গা শিউড়ে উঠছে। বেঁচে আয় ভাই।

আরেক সতীর্থ তৃষ্ণা সরকারের মুখে শুনলাম, লোপাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে পুলিশ ভ্যানে তোলার পর ও নাকি পানি খেতে চাইছিল। আর পুলিশগুলো বলছে, ‘পানি খাইবা? প্রস্রাব খাওয়ামু’। এর আগের দিন বনানী বলছিল, ওকে নাকি মালাউনের বাচ্চা বলে গালিগালাজ করেছিল কিছু পুলিশ।

যে পুলিশ আহত হলে, আঘাত প্রাপ্ত হলে আমরা তার পক্ষ নিই, স্যালুট দিই, সেই পুলিশের মুখে একী ভাষা শুনি আজ! তাও আবার গণজাগরণের কর্মীদের উদ্দেশে! ওরা কি এই মঞ্চের লোকেদের জামাত-শিবির ভেবেছে নাকি! নাকি তাদের বিরুদ্ধ পক্ষ ভেবেছে? কার নির্দেশে তারা আজ গত এগার মাস ধরে অহিংস আন্দোলন করে আসা মানুষগুলোর ওপর খড়্গহস্ত হলো, একটু খোঁজ নেয়া দরকার!

মঞ্চের অন্যতম সংগঠক মারুফ রসুল ঠিকই বলেছেন, “রাষ্ট্র যদি লাঠিচার্জের ভাষায় কথা বলে, গণজাগরণ মঞ্চ বিপ্লবের ভাষায় কথা বলবে”। একদম সময়োচিত কথা। তবে তাই হোক। ইমরান, আরিফসহ যারা হাসপাতালে আছেন, তারা দ্রুত সুস্থ হয়ে ফিরে আসুক, এইটুকু কামনা তো করতেই পারি। আটক মানুষগুলো যে যার ঘরে ফিরে গেছে সমস্ত তিক্ততার অভিজ্ঞতা নিয়েই, তারপরও শান্তি।

সবার শুভবুদ্ধি হোক।

১৯.১২.২০১৩

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.