গল্লামারী ব্রিজের নিচে

Muktijuddhoলুতফুন নাহার লতা:  খুলনার সাবরেজিস্ট্রি অফিসের হেড ক্লার্ক সাহেব টুটপাড়ার নূর মোহাম্মাদ শেখ বিষন্ন মনে মাথা নিচু করে ধীর অবশ পায়ে হেঁটে চলেছেন গল্লামারী ব্রিজের ধার দিয়ে। ক্লান্ত, অবসন্ন, ক্ষুধার্ত । ডিসেম্বরের ঠাণ্ডার  ভেতরেও তর তর করে ঘামছেন তিনি। এটা ১৯৭১ সাল। দীর্ঘ নয় মাস মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৬ ই ডিসেম্বর সারা দেশ স্বাধীন হলেও খুলনা স্বাধীন হয়েছিল ১৭ ই ডিসেম্বর।

স্বাধীনের খবর শুনেই গতকাল তিনি পাগলের মত ছুটে বেরিয়েছেন পথে। পথের দুধার দিয়ে ছুটে চলেছে মানুষ । মানুষ হাসছে, মানুষ কাঁদছে যে যাকে পারছে জড়িয়ে ধরছে ! চিৎকার করে কথা বলছে সবাই । লোকে লোকারণ্য চারিদিক । জয়বাংলা শ্লোগানে আকাশ বাতাস কাঁপছে, সবাই ছুটছে, কিন্তু ঠিক কোথায় যাচ্ছে তা বোঝা যাচ্ছে না । কেবল ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে মানুষ! এ এক অসাধারণ ঐতিহাসিক মূহূর্ত।

স্বজন হারানোর আহাজারীতে বাতাস ভারী, আনন্দ আর অশ্রু একই ধারায় প্রবাহিত হচ্ছে । মানুষ ছুটছে মুক্তিবাহিনী দেখতে। অগনিত মানুষ চলেছে তাদের আপনজন যাদের ধরে নিয়ে গিয়েছিল তাদের যদি জীবিত অবস্থায় পাওয়া যায় সে আশায় মিলিটারি ক্যাম্পগুলোতে। বয়রা, খালিশপুর পাওয়ার হাউস, জেলা স্কুলের মাঠ, ডিসি অফিসের সামনে , পি আই এ ( পাকিস্থান এয়ার লাইন্স ) অফিসের সামনে, শহীদ হাদিস পার্কের দিকে, লোকে লোকারণ্য। সারা শহরে এত মানুষ !

সারা বাংলাদেশের বুকের তলায়, পাকিস্তানী নরখাদক বাহিনীর বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা প্রতিবাদের ডিনামাইটটি ফেটে, বঙ্গোপসাগরের তলা দিয়ে বয়ে গেছে দীর্ঘ এই নয় মাস ধরে। আজ আকাশ, বাতাস, ধুলো, মাটি গাছ পালা সব আনন্দে, বিষাদে আর্তনাদ করছে যেন! দেশ স্বাধীন হয়েছে ! বাতাস ভারী হয়ে আছে লাশের গন্ধে। থমথম করছে আকাশ।

নূর মোহাম্মাদ শেখ চোখে কেমন ঝাপসা দেখছেন , মাথাটা দুলে উঠতেই কালভার্টের উপরে বসে পড়লেন তিনি। বাতাস এসে তার সামনে দিয়ে ধুলো উড়িয়ে দিয়ে গেল। খুলনা শহরে মুক্তিযোদ্ধারা ঢুকেছে গতকালই । সার্কিট হাউসের মাঠে, পাকিস্তানি মিলিটারীর খুলনার জি ও সি খিজির হায়াত খান, বাঙ্গালী মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। কাল সে যখন বেরিয়েছে তখনো রুপশার বুক চীরে গান বোট থেকে মর্টার শেলিং হচ্ছে। আর গত দুই দিন ধরেই সে হাঁটছে টুটপাড়া থেকে রুপসা, দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরি , লবনচোরা সাচিবুনিয়া, গল্লামারী ।

নদীর ধারে এই পথ ধরে ধরে সে তার বিস্ফারিত দুই চোখ মেলে খুঁজে চলেছে তাঁকে । তার একমাত্র সন্তান সতেরো বছর বয়সী ইউসুফ শেখের লাশ খুঁজছে সে। অগনিত লাশ ভেসে যাচ্ছে রুপসার জলে বিশেষ করে গল্লামারী ব্রিজের নিচ দিয়ে। মানুষ ঊর্ধশ্বাসে সেদিকে ছুটছে, সবাই বলছে গল্লামারীতে নাকি ঢাকার রায়ের বাজারের মত বধ্যভূমি বানিয়েছিল খানসেনারা । কোনো মতে পায়ে ভর দিয়ে আবার উঠে দাঁড়ালো নূর মোহাম্মাদ শেখ। তাঁর পা কাঁপছে ! সে যেনো আর কিছুতেই এগুতে পারছে না ! যতই সে ব্রিজ পেরিয়ে নিচে নামছে তাঁর আশাহীন অশ্রু আর বাঁধ মানাতে পারছেনা সে ! নদীর দুই ধারে অসংখ্য মানুষের লাশ। লাশের গন্ধে সে দম ফেলতে পারছে না, আবার নাকে কাপড় দিয়ে নাক বন্ধ করতেও পারছে না যদি এই গন্ধের মধ্যে তার ইউসুফের গায়ের গন্ধ থাকে ! এই আশংকায় তার বুক কাঁপছে।

শত শত মানুষ নদীর দুই ধারে জড়ো হয়ে তাদের আত্মীয়-স্বজনকে খুঁজে ফিরছে। পচে গলে রক্ত মাংস মাটিতে মিলে গেছে এমন সব লাশ এখন আর লাশ নেই কেবল কংকাল। মানুষ জন টেনে টেনে উপরে তুলে সারি দিয়ে রাখছে তা দেখে চেনার উপায় নেই কোনটা কার । কেবল মাথার খুলি আর খুলি ! যত দূর চোখ যায় কেবল মাথার খুলি আর কংকাল। মাঝে মাঝে আবার সদ্য মরা লাশ, যাদের কে এই দিন কয়েক আগে ঘর থেকে ধরে এনে মেরেছে তাদের দেহাবশেষ এখনো তরতাজা, এতটুকু মলিন হয়নি। মানুষ নাকে কাপড় চেপে ধরে কেবল বিস্ফারিত দুই চোখ খুলে দেখছে আর ভাল করে চেনার চেষ্টা করছে এ লাশ তার স্বজনের কি না!

নুর মোহাম্মাদ শেখের সেই বিস্ফারিত চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে চলেছে সে ভাল করে কিছু দেখতেও পাচ্ছে না । মনে মনে সে সময়ের একটা হিসেব করার চেষ্টা করছে । ইউসুফের লাশ কতটুকু পচতে পারে এই সময়ের মধ্যে । ডান হাতের আঙুল গুনে দেখছে আন্দাজ কত দিন হতে পারে । কারণ সে জানেনা কবে কখন ইউসুকে ওরা মেরেছে। সেপ্টেম্বর মাসের ২২ তারিখে শেষ তাকে দেখেছিল ইউসুফের মামা মোজাম শেখ। খালিশপুর বিহারি ক্যাম্পের পাশে একটি হিন্দু পোড়ো বাড়ীতে মিলিটারী ক্যাম্পের নির্যাতন সেলের একটি অন্ধকার ঘর থেকে বের করে এনে, কিছুক্ষণের জন্য দেখা করিয়ে দিয়েছিল রাজাকার কমান্ডার সলেমান ফকির । ইউসুফের সারা শরীরে কালো কালো রক্ত জমাট বাঁধা । বাঁ দিকের চোখটা তুলে নিয়েছে । বাম হাত খানা মুচড়িয়ে ভাঙ্গা । ইউসুফ ভাল করে দাঁড়াতে পর্যন্ত পারেনা ! সে মা’র হাতে গরম ভাত খেতে চেয়েছিল আর ফ্যাসফ্যাসে ক্লান্ত গলায় বলেছিল ‘মা কে কাঁদতে মানা করো মামা ! জয় আমাদের হবেই । ‘

মোজাম মামা তার গলায় মায়ের দেয়া, আল্লার নিরানব্বইটি নাম লেখা একটি তাবিজ বেঁধে দিয়ে চলে আসার সময় পিছন থেকে ইউসুফ তার হাত টেনে ধরে চোখে চোখ রেখে নি:শব্দে কেবল ঠোঁট নেড়ে বলেছিল ‘ জয় বাংলা’। ইউসুফের চোখে ছিল সে কী আত্মবিশ্বাসের দ্যূতি ! মোজাম শেখ ফিরে এলে ইউসুফের মা মাটিতে গড়িয়ে কেঁদেছে তাকে একবার নিয়ে যাবার জন্যে ! সলেমান ফকিরের সাথে কথা হয়েছিল মাসখানেক পরে আবার একবার দেখা করানোর ব্যাপারে ! কিন্তু একমাস পরে সেখানে গিয়ে আর ইউসুফকে পাওয়া যায়নি ! সলেমান ফকির বলেছিল, ওরা মুক্তিযোদ্ধাদেরকে এক জায়গায় রাখে না, হয়তো অন্য ক্যাম্পে সরিয়ে ফেলেছে, সে খোঁজ নিয়ে জানাবে !

ইউসুফ মওলানার কাছে তদবিরের জন্য পরামর্শ দিয়েছিল সলেমান ফকির ! নূর মোহাম্মাদ শেখ আবার চোখ মুছে আংগুল গুনতে শুরু করে । জোড়াকল বাজার থেকে ইউসুফকে ধরে নিয়ে গেছে আগস্টের শেষে। সেপ্টেম্বর , অক্টোবর , নভেম্বর , ডিসেম্বর এই ক’মাস আর তাকে দেখেননি নূর মোহাম্মাদ । তাঁকে নিয়ে গিয়ে অত্যাচার করে তার আরো বন্ধু বান্ধবের নাম বের করার চেষ্টা করেছে । কারা কারা তার সঙ্গে আছে , তারা কোথায় কোথায় মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করছে , কেন সে বাগেরহাট পি সি কলেজের (প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজ) বোর্ডিং থেকে খুলনায় ফিরেছে, তার বাবা নূর মোহাম্মাদ শেখ মুক্তিযোদ্ধাদের কে সাহায্য করছে এ বিষয়ে সে কি কি জানে এই সব ।

এসময় টুটপাড়ায় নূর মোহাম্মাদ শেখের প্রতিবেশী জামাতে ইসলামের নেতা টুটপাড়া পিস কমিটির সেক্রেটারি মোল্লা হারুনুর রশীদ দয়াপরবশ হয়ে রাজাকার বাহিনীর জনক মওলানা ইউসুফের কাছে তাকে নিয়ে যায় ছেলেকে ছাড়িয়ে আনার জন্য।খুলনায় পাকিস্থানী আর্মি প্রধান তখন ব্রিগেডিয়ার খিজির হায়াত খান । তার সঙ্গে দেখা করিয়ে ইউসুফকে ছাড়িয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেন মওলানা ইউসুফের সহকারি কাদের বক্স। আসলে নূর মোহাম্মাদ শেখকে একটা শিক্ষা দেবার কথা সে ভোলে না কাদের বক্স । তাদের কাছে খবর আছে যে, সে গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করছে । ছেলেকে মুক্তিযুদ্ধে নামিয়েছে । ঢাকায় বিচ্ছু বাহিনীর আদলে খুলনায় বাহিনী তৈরি করার চেস্টা করছে। ওষুধ , কাপড়, খাবার এসব গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে ! আর্মি ক্যাম্পে ব্যাটাকে একবার নিতে পারলে হয় । কিন্তু নূর মোহাম্মাদ শেখ ঠিকই বুঝে ফেলেন এদের চক্রান্ত ! স্ত্রীর অসহায় আর্তনাদ তাঁকে দিশেহারা করে তুলেছে ! কিন্তু শত চেষ্টাতেও একমাত্র সন্তান ইউসুফকে ছাড়ানোর কোন পথ বের করতে পারেননি নূর মোহাম্মাদ শেখ ।

মার্চের শুরুতে ঢাকার রাজপথে যখন আগুন ঢেলে পড়ছে ! উত্তাল সেই দিনগুলোতে খুলনা সাব রেজিস্ট্রি অফিসের হেড ক্লার্ক নূর মোহাম্মদ শেখ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে নিজেকে মনে প্রাণে উদ্বুদ্ধ করেন। একসময় মহাত্মা গান্ধীজীর স্বদেশী আন্দলনের সাথে জড়িত নূর মোহাম্মাদ শেখ বিশ্বাস করতেন , মৌখিক প্রতিবাদে আর কাজ হবে না। পাকিস্তানী স্বৈরশাসকদের শক্ত জবাব দিতে হলে প্রতিরোধ আন্দোলন করে সম্মুখ সমরে ঝাপিয়ে পড়তে হবে। লড়াই ছাড়া এ আন্দোলনে টেকা যাবে না ।অফিস শেষে প্রায় প্রতিদিন খুলনা শহিদ হাদিস পার্কের মিটিং এ হাজির হতে দেখা যায় তাকে। এ নিয়ে তার সহকর্মী জামাত পন্থী ইসহাক মন্ডল অনেক কথাই বলেন কিন্তু সে এতে ভ্রুক্ষেপ করে না । সামান্য একজন সরকারি কর্মজীবি সে কিন্তু তার অভিজ্ঞ্যান ও চেতনা তাকে নিয়ে গিয়েছিল সকল কিছুর উর্ধে। প্রায়শই মিটিং থেকে ঘরে ফিরে পাটী পেতে বসে গরম ভাতে সাদামাটা একটি তরকারি দিয়ে রাতের খাবার খেতে খেতে স্ত্রী সালেহা বেগমকে বলতেন এসব কথা। বলতেন ‘দেখ সালেহা এই দেশ একদিন স্বাধীন হবে । ব্রিটিশদের মত পাকিস্তানীদের তাবেদারি থেকেও বাঁচবে বাঙ্গালী। এ হল ক্ষমতার লড়াই। জহির রায়হানের জীবন থেকে নেয়া ছবিতে দেখ নি ? কেমন করে ক্ষমতার লড়াই চলে ?’ সালেহা বেগম সে কথা শোনেন বটে কিন্তু মনে মনে ভয়ে সিটিয়ে থাকেন । তার ইউসুফ খুলনা নগর আওয়ামী লীগের সদস্য হয়ে সারা বছর ধরে কাজ করে বেড়াচ্ছে । দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার লিখছে । সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত মাইকিং করে করে গলা ভেঙ্গে ঘরে ফিরছে । খাওয়া নাওয়া ঘুম হারাম করে সে রাত দিন স্লোগান দিয়ে বেড়াচ্ছে ।

ইউসুফ সবে মাত্র মেট্রিক পাশ করে বাগেরহাট পি সি কলেজে ভর্তি হয়েছে। বাচ্চা ছেলে তার ! এখনো সে দুনিয়ার কত কিছু জানে না অথচ কি সরল দেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়েছে সে বাবার কাছ থেকে । স্বামীকে নিয়েও চিন্তার শেষ নেই সালেহা বেগমের বিশেষ করে একেবারে নিকটতম প্রতিবেশী যখন জামাতের নেতা । ৭ই মার্চের ভাষণ শোনার জন্য সবাই ঘিরে ধরেছে রেডিও । সালেহা বেগমের ঘর, ঘরের জানালা ও বারান্দা ভর্তি মানুষ। ঘরের ভেতর রেডিওর ভলিউম সর্বচ্চো বাড়িয়ে দেয়া যাতে সবাই শুনতে পায়। বঙ্গবন্ধু স্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে দিলেন যার যা আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকতে। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার । সালেহা বেগম এই ভাষণ শোনার পরে আর ভয় পায় না । তিনিও শক্ত হয়ে উঠে দাঁড়ান। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেবেন এবং তারপর একটি যুদ্ধ শুরু হতে পারে যে কোন সময়ে এটা সবাই বিশ্বাস করে। পাকিস্তানী সরকার আমাদের দেশটাকে শেষ না করে ছাড়বে না । চারিদিকে হই হই রব পড়ে গেছে কি জানি কি হয় । স্কুল কলেজ বন্ধ হয়ে যাবে যে কোন সময়ে ।মার্চের মাঝামাঝি হঠাৎ বাগেরহাট থেকে ইউসুফ খুলনায় ফিরে এল । জিজ্ঞেস করলে বললো কলেজ বন্ধ করে দিয়েছে । দেশ স্বাধীন হয়ে যাচ্ছে মা । তারপর কেমন করে কিছুদিনের মধ্যেই সারা শহর শূন্য হয়ে গেল ।

৭ই মার্চের পর থেকে শেষ নাগাদ টুটপাড়া থেকে সব বনেদি হিন্দু পরিবারগুলো রাতারাতি উধাও হয়ে গেল। টুটপাড়া কালাচাঁদ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে নগেন সরকারের বিরাট বড়ো সাদা ধবধবে টানা বিশাল বারান্দাওয়ালা বাড়ী, বাড়ীর সামনে বারান্দা বরাবর সারি সারি গোটা বিশেক কাঠমল্লিকার গাছ ! ফুলে ফুলে ম ম করত পুরো এলাকা ! ও বাড়ীর মেয়েরা বিকেলে ছাদে উঠে দুই বেনীতে রাঙা ফিতের ফুল বেঁধে এক্কা দোক্কা খেলত । বৌদের গলায় দুলতো সোনার বিছেহার তারা বড় বড় পানের বাটা নিয়ে ঐ সাদা টানা বারান্দায় বসে গল্প করত আর গোল সেলাই ফ্রেমের ভেতর বেঁধে টেবিল ক্লথে নানান রঙের সুতোর কারুকাজ করত । রাস্তার দুপাশে দুটি আটা ভাঙ্গানো, ধান ভাঙ্গানো কল, সারা দিন গোওওও শব্দে পাড়া মাথায় করে রাখত । কালাচাঁদ স্কুলের ( স্থানীয় লোকেরা বলতো কালাচান স্কুল ) সামনে স্বর্নকার আসিত দত্তের বাড়ী, জর্জদের বাড়ী, সুশীল সরকারের বাড়ী, রাতারাতি কেমন করে সব শুন্য হয়ে গেল । ভুতের বাড়ীর মত পড়ে রইল সব। জোড়াকল বাজার থেকে হিন্দুদের দোকান গুলো নিঃশব্দে বন্ধ হয়ে গেল। বিরান হয়ে গেল খুলনার ডাক বাংলার মোড় , শান্তিধামের মোড় , তারেরপুকুর এলাকা , ডাক্তার অনন্ত মল্লিক আর ডাক্তার নগেন দত্তের বাড়ী , ধর্মসভা এলাকা।মাত্র ক’দিনের মধ্যে পুরো খুলনা শহর ভৌতিক শহর হয়ে উঠল।

টুটপাড়া কবরস্থানের পিছনে ভুতের বাড়ী নামে যে পোড়ো বাড়ী ছিল সেখানে আনসার ক্যাম্পে শুরু হল রাজাকার প্রশিক্ষণ । জামাতি ইসলামি দলের সদস্যরা ছাড়াও পাড়ার দু চার ঘর গরীব কর্মপোজীবী মানুষ যারা ঠেলাগাড়ী চালাতো বা ঘর তৈরীর কাজে কামলা খাটত তাদের কেউ কেউ প্রলোভনে পড়ে রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিলো । টুটপাড়ার একজন ভাল রাজমিস্ত্রি ছিল কালা মিয়া, তার স্ত্রীকে সবাই ‘কালা বউ ‘ বলে ডাকতো , সেই কালাবউ এর আগের ঘরের ছেলে সলেমান ফকির যে কিনা টুটপাড়ায় হুজুর সেজে তাবিজ কবোজ দিয়ে মা বোনদের অন্ধ ভক্তি পেয়ে বড় হুজুর হবার স্বপ্ন দেখত, সেও নানা ভাবে এই রাজাকার গঠন প্রক্রিয়ায় জড়িয়ে গেল । তার হুজরাখানার কর্মী পচুর বাপ রাজাকার হয়ে, দুখানা লুঙ্গী দুখানা মোটা শাড়ী পাঁচ সের মোটা চাল আর কিছু ডালডা নিয়ে এল । টুটপাড়ার দু চার ঘর মানুষ তখনো যারা বাড়ীঘর ফেলে পালিয়ে গ্রামের দিকে যেতে পারেনি , তাদের কেউ কেউ আবার পচুর বাপের এই অর্জন দেখতেও এল । পচু’র বাপ কাঁধে রাইফেল ঝুলিয়ে নতুন লুঙ্গী পরে মুখে পান দিয়ে ইউসুফ দের বাড়ীতে এসে সালেহা বেগমকে সামনে পেয়ে বলল ” ও খালা আমারে কিরাম দেহায় ? আমি রাজাকার হইছি । উরা এই রাইফেল আমারে দিছে কিন্তু এ জম্মের ওজন , আমার চাইয়েও বেশী ।” সালেহা বেগম পচুর বাপকে সাফ সাফ জানিয়ে দিলেন এবাড়ীতে সে যেন আর না আসে । চারিদিকে মিলিটারী ক্যাম্প হয়েছে। বয়রা, খালিশপুর পাওয়ার হাউস , গল্লামারী রেডিও স্টেশন ,রূপসা ফেরী ঘাট , স্টিমারঘাট , সার্কিট হাউস পি আই এ অফিস , সর্বত্র মিলিটারী আর জামাতী ইসলামি দলের নেতারা । দিনে দুটি একটি রিকশার টুং টাং আর রাত হলে ভারী গাড়ির আওয়াজ ! মাঝে মাঝে নারী কন্ঠের আর্তনাদ !

এমনি করে বয়ে চলেছে যারা এখনো খুলনা ছেড়ে যায়নি তাদের জীবন । সব কিছু বন্ধ । বাজার ঘাট দোকান পাসান , কেবল জোড়াকল বাজারের চায়ের দোকান আর দু একটি মুদিখানা দোকান ছাড়া । যুদ্ধের দিনগুলো প্রায় প্রতিটি বাড়ীতে বাংকার খোড়া হয়েছে সব বাড়ীর সামনের দরজায় তালা লাগানো । কেমন করে সোনার দেশ শ্মশান হয়ে গেল তাই ভাবেন নূর মোহাম্মাদ শেখ । ক্লান্ত ,অবসন্ন , বিধ্বস্ত, পায়ে সে হেটে হেটে নেমে এল নীচে একেবারে নদীর ধারে । বিস্ফারিত চোখে সে খুঁজছে সব লাশের ভেতরে ইউসুফকে ! চেনা যাচ্ছে না কাউকে, অল্প কিছু সদ্য মৃত লাশ ছাড়া , নদী থেকে ভেসে যাওয়া লাশ দেখলেই লোকজন সেই দিকে দৌড়ে যাচ্ছে আবার নিজের না হলে ফিরে এসে জটলা পাকাচ্ছে ! এ যে কি এক অর্ধদগ্ধ সময় ! মানুষ দম বন্ধ করে রোবটের মত এদিকে একবার ওদিকে একবার দৌড়ে দৌড়ে তাদের আপন জনের লাশ খুঁজছে । খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত নূর মোহাম্মাদ শেখও এক সময় কাদামাটির ওপর বসে পড়ে আরো অসংখ্য নারী পুরুষের সাথে । দিন প্রায় শেষ হতে চলেছে । ক্লান্তিতে হাত পা ভেঙ্গে আসছে নূর মোহাম্মাদ শেখের,এবার ঘরে ফিরে যেতে হবে, একথা ভেবেই কান্নায় সে ডুকরে উঠল, তার গলা দিয়ে কেমন পশুর মত কুই কুই করে একটি গোঙ্গানীর শব্দ বেরুল ! ইউসুফ কে খুঁজে না পাওয়া , এই অসফল অন্বেষণ ! এই ব্যর্থ খুজে ফেরার ভার নিয়ে কেমন করে ঘরে ফিরবে সে । কী করে ফিরে যাবে শূন্যহাতে সালেহার সামনে !

হঠাৎ কে যেন তাকে চিৎকার করে ডাক দেয় ‘ ও কাকা দ্যাহেন দি আইসে এট্টা লাশ পাওয়া গেছে তার গলায় মান্দোলি আছে ” সারা দিন ধরে ইউসুফ কে খোঁজার সময় বার বার উনি কেবল গলায় মাদুলী থাকতে পারে এমন কথা বলছিলেন । আশেপাশের মানুষেরা তা শুনেছে বহুবার ! এখন এই সন্ধ্যার মুখে ওরা তেমন কাউকে দেখে নূর মোহাম্মদ শেখকে ডাকছে । চোখ মুছে কাছে গিয়ে ভাল করে ঝুঁকে দেখছেন কিন্তু চেনা যাচ্ছে না ! হ্যাঁ, গলায় মাদুলী আছে বটে কিন্তু লাশ খানিকটা পচে উঠেছে , কেমন গলা গলা ভাব । হঠাত সে দু হাতে জড়িয়ে ধরে গলার তাবিজে দাঁত দিয়ে কামড়ে ভেঙ্গে দেখতে চাইলেন ভেতরে নিরানব্বইবার আল্লার নাম আছে কিনা !

নুর মোহাম্মাদ শেখের ঠোঁটে মুখে পচা রক্তমাংশ কাদাসহ তাবিজ খুলে এলো, হ্যাঁ আল্লার নাম ! এই তো ! এই তো আল্লার নাম ! এই তো ইউসুফ ! তার গগন বিদারী চিৎকারেও গলা দিয়ে কেবল জবাই করা পশুর গোঙ্গানির মতো কষ্টের আওয়াজ বেরুলো ! সেই চাপা তীব্র গোঙ্গানির শব্দ গল্লামারী ব্রিজের ধার ছুঁয়ে সারা আকাশ পরিব্যাপ্ত হয়ে গেল ! রূপসা ছুয়ে আসা জল গল্লামারীর ব্রিজের নিচ দিয়ে বয়ে যেতে যেতে সে গোঙ্গানি বুকে করে বয়ে গেল অনন্তের দিকে। নূর মোহাম্মাদ শেখের গা থেকে ময়লা আলোয়ানটা খুলে নিয়ে তা দিয়ে জড়িয়ে,সবাই মিলে ইউসুফকে তুলে দিল তাঁর দুহাতে । আলোয়ানের চার কোনা দিয়ে বাঁধা, একটি বড় পোটলা দু’হাতে বুকে করে ধরে তিন চাকার ভ্যান গাড়ীতে উঠে বসল সে । ভ্যান চলেছে ধীরে ,ধীরে, অন্ধকারে । গল্লামারী , হাবেলীবাগ , গোবরচাকা হয়ে সোজা এসে শান্তিধামের মোড়, সিটি কলেজ , তারের পুকুর , নগেন ডাক্তারের বাড়ী, কালাচান স্কুল ছেড়ে এসে জোড়া কল বাজারে সে যখন পৌছাল তখন মধ্যরাত ! নারকেল গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের আকাশ থেকে এক টুকরো জ্যোৎস্না এসে পড়েছে আলোয়ানে বাঁধা শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ইউসুফ শেখের গলে যাওয়া লাশের উপর !!

(উৎসর্গ: শহিদ শিরু মিয়া ও তার ছেলে শহিদ কামাল। এই গল্পের নূর মোহাম্মাদ শেখের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আমার বড় ভাইয়ের জন্য, ভয় ভাবনা নিয়ে উৎকন্ঠিত আমার বাবার ছায়া দেখতে পাই )

সেপ্টেম্বর ৩০,২০১২ নিউইয়র্ক

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.