‘দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা, কারও দয়ায় পাওয়া নয়’

BD Mapরওশন আরা নীপা: “দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা আমি , কারও দয়ায় পাওয়া নয়” ! বাংলাদেশ ছোট্ট একটি দেশ, মাত্র ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই দেশ বিশ্বের পরাক্রমশালী সামরিক শক্তির সাথে দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ফলে বিশ্বের মানচিত্রে তার জায়গা পায়। সেই সংগ্রামে আমরা হারিয়েছি আমাদের ৩০ লাখ বাঙ্গালীকে আর তিন লাখ নারী হয়েছেন নির্যাতিত। মাত্র নয় মাসে এত বেশী রক্তপাত, অত্যাচার নৃশংসতার উদাহরণ বিশ্বের আর কোন দেশের স্বাধীনতার জন্য হয়েছে কিনা আমার জানা নাই।

এই দেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের ওপর শুধু যে পাকিস্তানী বাহিনীই অত্যাচার করেছিল তা নয় তাদের পূর্ণোদ্যমে সহায়তা করেছিল এদেশীয় দালালরা যারা আলবদর আল শামস্ আর রাজাকার বাহিনী গড়ে তুলেছিল। আর তাইতো ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর এদেশ বিজয় লাভ করলেও পরিপূর্ণ মুক্তি আসেনি সেদিন। যে অসাম্প্রদায়িক সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে সেদিন এদেশের মেহনতি মানুষ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তার যাত্রা শুরু হলেই খুব দ্রুতই পট পাল্টাতে থাকে। স্বাধীনতার মাত্র তিন বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালে বাঙ্গালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে হত্যার মধ্য দিয়ে এই দেশ আবারও পিছনে হাঁটতে থাকে। বঙ্গবন্ধু যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করলেও তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই দেশ আবারও চলে যায় পাকিস্তানের অনুসারী প্রেতাত্মাদের হাতে! সামরিক শাসনের আড়ালে চলে দুর্বৃত্তায়ন!

গণতন্ত্রকে হত্যা করে তৎকালীন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান হত্যা , ক্যু আর ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন। একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়েও হত্যা করেন কর্নেল তাহের সহ ১৭৭ জন বীর মুক্তিযোদ্ধাদের। তিনি শাহ আজিজুর রহমান এর মত ঘৃণ্য রাজাকারকে প্রধানমন্ত্রী করেন তারই ধারাবাহিকতায় তাঁর স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, মতিউর রহমান, মুজাহিদ আর নিজামীর গাড়িতে আমাদের অহংকার লাল সবুজের পতাকা তুলে দেন। আমাদের সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী তাদের তথাকথিত নিরপেক্ষতা আর সুবিধাবাদীর চরিত্রে নির্লজ্জ ভাবে নিজেদের উপস্থাপন করে। এই গোষ্ঠী খুব সুচিন্তিতভাবে এদেশের মানুষের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের বিকৃত ইতিহাস চর্চায় অভ্যস্ত করে তোলে।

যে দেশটির জন্ম হয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষতা আর অসাম্প্রদায়িকতার মূলমন্ত্র বুকে নিয়ে সেই দেশটিকেই গত ৪২ বছর ধরে একটি ইসলামিক মৌলবাদী রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠার সর্বতো চেষ্টা করা হয়েছে । আন্তর্জাতিকভাবে মডারেট মুসলিম কান্ট্রি হিসাবে প্রচার করতে থাকে এবং অনেকাংশে সফলও হয়। ৮০‘র দশকে এক নষ্ট এবং ভ্রষ্ট প্রজন্ম এই প্রচেষ্টার ফসল। যাদের কাছে আমরা প্রতিনিয়ত শুনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে, যুদ্ধাপরাধের নামে দেশকে বিভক্ত করবার হুমকি ধামকি। অন্ধকারের গহ্বর থেকে আলোর বাতি হাতে এই সময় আবারও কাণ্ডারি হলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। নিজের জীবন বিপন্ন করে এই দেশের মানুষের পাশে এসে দাঁড়ালেন।

৮০-৯০ দশ বছরের রাজপথের সংগ্রামে গণতন্ত্র পুনরায় যাত্রা শুরু করলো। কিন্তু ষড়যন্ত্র শেষ হলো না। এবার হত্যার টার্গেট হলেন শেখ হাসিনা । বার বার তার উপর গ্রেনেড হামলা করা হলো। ১৯৯৬ সালে তিনি যখন ক্ষমতাসীন তখনও তার সমাবেশে গ্রেনেড হামলা করা হয় কয়েকবার। ২০০১ সালে বিরোধী দলের উপর ন্যাক্কারজনক ভাবে গ্রেনেড হামলা করেন বেগম খালেদা জিয়া এবং তার পুত্রের ইন্ধনে । সারা বিশ্ব খুজলে এরকম ন্যাক্কারজনক ঘটনা বোধহয় আর কোথাও ঘটেনি। আশ্চর্য জনক ভাবে তখনকার আর্ন্তজাতিক মানবাধিকার সংস্থা সহ সারা বিশ্ব নীরব থেকেছে যেমন থেকেছে, আমাদের দেশীয় দালাল সুশীল সমাজ!

কিন্তু হার মানেননি শেখ হাসিনা। জীবনের সকল মায়া ত্যাগ করে তিনি এই দেশের মানুষের কল্যানে নিবেদিত করেছেন তাঁর শপথ এই দেশকে তাঁর বাবার স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসাবে গড়ে তুলবেন। আর তাইতো ২০০৮ সালের নির্বাচনে তাঁর প্রতিশ্রুতি ছিল যুদ্ধাপরাধের বিচার। গত পাঁচ বছর ধরে অত্যন্ত স্বচ্ছভাবে এই বিচার কাজ চলছে। সারা বিশ্বের সব যুদ্ধাপরাধের বিচারে যখন আসামী পক্ষের কোন রকম আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগের উদাহরণ খুব একটা দেখা যায় না সেখানে বাংলাদেশে বিচার আপীল এর সুযোগ, আইনজীবী নিয়োগ সহ সকল পর্যায় অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে নিরূপণ করা হয়েছে। এই বিচারের এক পর্যায়ে কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন এর সাজা এই দেশের মানুষকে আবারও রাস্তায় নামিয়ে আনে।

Nipa
রওশন আরা নীপা

গত ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, এই দেশের ইতিহাসে আবারও একটি মাইলফলক! কাদের মোল্লা যে কসাই কাদের নামে পরিচিত ১৯৭১ সালে ৪০০ জন মানুষকে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত তাঁর যাবজ্জীবন কোনভাবেই মেনে নেয়া যায়না ! সারা বিশ্ব আবারও দেখলো শাহবাগ গণজাগরণ। আবারও ইতিহাস কোন একজন মানুষের মৃত্যুদণ্ডের জন্য লক্ষ লক্ষ মানুষ একটানা দুই মাস রাস্তায় অবস্থান ! এখানে লক্ষণীয় ৯০ এর পরের প্রজন্ম আবারও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ভাসিত! এবং এই প্রজন্মই জন্ম দেয় শাহবাগ আন্দোলনের।

আবারও আন্তর্জাতিক লবিং দেশীয় এজেন্ট ইত্যাদির মাধ্যমে নানা মানবাধিকার লংঘনের সমালোচনা করবার চেষ্টা নানা অপপ্রচার । কোন কিছুতেই না পেরে হত্যা , সহিংসতা সহ ধ্বংসযজ্ঞ করে ভয় দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। নির্বাচনের ইস্যুকে কেন্দ্র করে অবরোধ আর হরতালের নামে গত দুই মাস চলছে সহিংসতার উৎসব। চলন্ত বাসে পেট্রোল বোমা মারা, ট্রেনের লাইন উপড়ে ফেলা , ককটেল, পিটিয়ে পুলিশ হত্যা এসব কোন কিছূই তথাকথিত মানবাধিকার সৈনিক দের চোখে পড়েনা শুধূ চোখে পড়ে কাদের মোল্লার মত ঘৃন্য রাজাকারদের ফাঁর রায়! তাইতো চূড়ান্ত রায় দেওয়ার পরেও কার্যকর না করবার মত আব্দার করে বসেন জাতিসংঘ নামক সংস্থার প্রতিনিধিরা! এত সব রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে এই দেশের জনগণ তাঁদের ন্যায়বিচারের জন্য আবারও আন্দোলনে নেমেছে।

এর মূল কারণ এই দেশের মাটি আর আবহাওয়া ঐতিহাসিক এবং নৃতাত্ত্বিক ভাবে কখনই উগ্রবাদিতাকে প্রশ্রয় দেয়নি । আবার এই দেশই স্বাধীনতার জন্য নিজের বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছ। সূর্য সেন, প্রীতিলতা, বাঘা যতীন, ক্ষুদিরাম এরকম অসংখ্য বিপ্লবীর পূণ্যভূমি এই দেশ । যার সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান জাতির জনক শেখ মুজিবর রহমান। যিনি আমাদের দিয়েছিলেন ৭২ এর অবিসংবাদিত সেই সংবিধান যেখানে ধর্মনিরপেক্ষতা আর অর্থনৈতিক সামাজিক ন্যায়বিচার এর মুল মন্ত্র উচ্চারিত হয়েছিল। আর তাঁরই রক্ত তার কন্যা শেখ হাসিনা আজ আমাদের আবারও ফিরিয়ে দিলেন আমাদের বিশ্বাস ! এই দেশ আমাদের , এই দেশ আমাদের মতে চলবে কোন বিদেশী প্রভুদের কথায় নয় কারন আমরা বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার বাঙ্গালী!

জয় বাংলা , জয় বংগবন্ধূ!

 লেখক পরিচিতি: মিডিয়াকর্মী ও চলচ্চিত্র নির্মাতা

ইমেইল: [email protected]

শেয়ার করুন:
  • 9
  •  
  •  
  •  
  •  
    9
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.