গণজাগরণ মঞ্চে বক্তব্য দেওয়ায়……

Gonojagoronউইমেন চ্যাপ্টার: গত ৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকার শাহবাগে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে গড়ে উঠা আন্দোলনে আনা হয়েছিল বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা রাহেলা বেগমকে। গণজাগরণ মঞ্চের হাজার হাজার মানুষের সামনে বক্তব্যও রেখেছিলেন সাহসী এই নারী। বেশ কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলেও তাঁর সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়েছিল তখন। তবে গণমাধ্যমে তাঁর ওপর একাত্তরের নির্যাতনের কথা প্রকাশ্যে বলার কারণে ঘটে যায় আরেক বিপর্যয়। সমাজপতিদের কাছে প্রায় বিস্মৃত ‘খারাপ মেয়ে’  আখ্যাটি আবার তাঁর গায়ে সেঁটে দেওয়া হয়।

শুধু তা-ই নয়, গণজাগরণ মঞ্চে বক্তব্য দেওয়ার পর রাহেলার মেয়ে চম্পাকে তাঁর স্বামী মিলন তিন সন্তানসহ তালাক দেন। চম্পা এখন মায়ের অভাবের সংসারে এসে উঠেছেন।

রাহেলার কথা, একাত্তরের একদিন বগুড়া থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি গাড়ি সিরাজগঞ্জে এসে পৌঁছায়। শহরে নির্বিচারে ঘরবাড়ি পোড়াতে থাকে পাকিস্তানি সেনা ও তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকাররা। রাহেলা বেগম ও তাঁর স্বামী বেলগাতি গ্রামের এক হিন্দুবাড়িতে আশ্রয় নেন। ওই বাড়িতে তাঁরা ছাড়াও আরো তিনজন নারী একটি ঘরে লুকিয়ে ছিলেন। ঘরে ঢুকে পড়ে হানাদাররা। নারীদের ওপর চালায় অকথ্য নির্যাতন। স্বামীর সামনেই রাহেলার ওপর চলে এ নির্যাতন। এ ঘটনার পর রাহেলা বেগমকে তালাক দেন তাঁর স্বামী।

এত বছর পরও অভিমানে বীরাঙ্গনা রাহেলা বেগম স্বামীর নামটি উচ্চারণ করতে চান না। সাংবাদিকদের শুধু জানান, পাঁচ বছর পর আবার বিয়ে হয় তাঁর। দ্বিতীয় স্বামী মারা গেছেন বছর সাতেক আগে। দুই সন্তানের মধ্যে ছেলেটি পড়ালেখা করেছেন স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে। তবে বীরাঙ্গনা মায়ের ছেলে হওয়ায় কোথাও চাকরি হয়নি তাঁর। মুক্তিযোদ্ধার তালিকায়ও নাম ওঠেনি এই বীরাঙ্গনার। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের কোথাও তাঁর নাম নেই।

রাহেলা থাকেন সিরাজগঞ্জের সয়াধানগড়া বাসস্ট্যান্ডের পাশে পুকুরপাড় বস্তিতে। এ বস্তির জায়গা সরকার অধিগ্রহণ করেছে। অধিগ্রহণের চিঠিও জেলা প্রশাসন থেকে দেওয়া হয়েছে বস্তিবাসীকে। যেকোনো সময় উচ্ছেদ হওয়ার আশংকায় দিন কাটাচ্ছেন মুক্তিযোদ্ধা রাহেলা।

সিরাজগঞ্জে বীরাঙ্গনাদের পুনর্বাসনের কাজ শুরু করেছিলেন সখিনা হোসেন ও নারী মুক্তিযোদ্ধা আমেনা বেগম। গ্রামে গ্রামে ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করে ৩৫ জন বীরাঙ্গনাকে বের করেন এই দুই নারী। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সিরাজগঞ্জে আসার পর ওই ৩৫ জন বীরাঙ্গনাকে সঙ্গে নিয়ে এক মঞ্চে ওঠেন। সেদিনের ভাষণে বঙ্গবন্ধু বীরাঙ্গনাদের ‘মা’  বলে ডেকেছিলেন। সেদিনকার সেই সম্মান ছাড়া বীরাঙ্গনাদের স্মৃতিতে আনন্দ-সুখের আর কোনো স্মৃতি নেই।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হলে পুনর্বাসন কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যায়। ৩৫ জন বীরাঙ্গনার মধ্যে এরই মধ্যে ১৪ জন মারা গেছেন। মৃত্যুর পর সবার যেমন জানাজা অথবা সৎকার হয়,, এ বীরাঙ্গনাদের ক্ষেত্রে তাও হয়নি।

সারা দেশের বীরাঙ্গনাদের মতো সিরাজগঞ্জের রাহেলা বেগমও মুক্তিযোদ্ধা সনদ পাননি।
সিরাজগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার গাজী সোহরাব আলী বলছিলেন, ‘আমরা মৌখিকভাবে জানিয়েছি বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য;, কিন্তু সরকার এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত এখনও নেয়নি।’

৩৫ জন বীরাঙ্গনাকে নারী পুনর্বাসন কেন্দ্রে আনার কাজ করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধা আমেনা বেগম। এখনও সুখে-দুঃখে জীবিত বীরাঙ্গনাদের সঙ্গেই আছেন এই নারী মুক্তিযোদ্ধা। বীরাঙ্গনাদের নাম মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় ওঠানোর ব্যাপারে নিরলস চেষ্টা করে যাচ্ছেন। সরকারের বিভিন্ন স্থানে দরখাস্ত করছেন তিনি।

আমেনা বেগমের মতে, মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম উঠলে স্থায়ী একটা ভাতা পেতেন বীরাঙ্গনারা। তাঁদের সন্তানরাও মুক্তিযোদ্ধা সনদের সুফল পেত। অথচ ন্যূনতম সম্মান তো দূরে থাক, স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরও কলঙ্ক লেপে দেওয়া হচ্ছে তাদের সাথে, তাদের সন্তানদের জীবনও দুর্বিষহ করে তোলা হচ্ছে।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.