বিদায় মাদিবা, বিদায়

nelson mandelaউইমেন চ্যাপ্টার: চলেই গেলেন তিনি। সব প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে নিজেকে সঁপেই দিলেন গন্তব্যহীন গন্তব্যে। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা আর নেই। ফুসফুসের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ের ইতি টেনে জীবন-মৃত্যুর সীমারেখা মুছে দিলেন তিনি। বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ইতিহাসে কিংবদন্তী এই নেতা বৃহস্পতিবার জোহানেসবার্গে তার বাড়িতে মারা গেছেন বলে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমা।

‘প্রকৃত নেতাকে তার জনগণের মুক্তির জন্য সব ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত থাকতে হবে’-নেলসন ম্যান্ডেলার সবচেয়ে শক্তিশালী এক মন্তব্য। যিনি তার নিজের জীবনে চর্চা করে গেছেন, তাই বলে গেছেন অন্যদের উদ্দেশ্যে। এই সময়ের সবচেয়ে বড় যে ‘আইকন’ তিনি নেলসন ম্যান্ডেলা ওরফে মাদিবা। তিনি অনেকদিন ধরেই চলে যাচ্ছিলেন, আজ একেবারেই গেলেন। রেখে গেলেন ‘লিগ্যাসি অব উইসডম’। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানব সভ্যতার ইতিহাসে তিনি থাকবেন, থাকবে তাঁর কাজ, তাঁর বিখ্যাত সব উক্তি।

তাঁর প্রেরণাদায়ক উক্তিগুলো শুনে আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, ম্যান্ডেলা শুধু নেতা এবং ন্যায়বিচারের জন্য লড়াকুই ছিলেন না, তিনি আরও শিখিয়ে গেছে অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে কি করে নিজের শেষ সীমারেখাটুকু অর্জন করা যায়। কাকে বন্ধু বানানো যায়, কখন রশি টেনে ধরতে হয় আর কখন ছেড়ে দিতে হয়।

সংকট-সমস্যায় সার্বক্ষণিক নিজেকে সঁপে দেওয়া ম্যান্ডেলা সবসময় বিশ্বাস করতেন, মুক্তি মানে কারও দাসত্ব থেকে মুক্ত করে দেওয়া নয়, বরং এমনভাবে জীবনযাপন করা যাতে অন্যদের স্বাধীনতার প্রতি সম্মান দেখানো যায়। জীবনের একটা বড় অংশ বন্দী হিসেবে কাটিয়েও তিনি রেখে গেছেন মানবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। যেকোনো ভিন্নতা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে যে মানব হৃদয় লাগে, সেটা তাঁর ছিল।

তিনি বলতেন, ‘গায়ের রং, অতীত, অথবা ধর্মের কারণে একজন অপরজনকে ঘৃণা করার শিক্ষা নিয়ে কেউ জন্মায় না। মানুষকে ঘৃণা করতে শিখতে হয় এবং যখন তারা এটা শিখতে পারে, তার মানে এই যে, তারা ভালবাসতেও শিখতে পারে। ভালবাসা মানুষের হৃদয়ে খুব স্বাভাবিকভাবেই আসে’। ম্যান্ডেলা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, জীবন হচ্ছে বিশাল সব চ্যালেঞ্জের সমারোহ এবং একটি বড় পর্বতে চড়ার পর যে কেউ আবিষ্কার করতে পারে যে, আরও অনেক পাহাড় আছে, যেগুলো তাকে ডিঙোতে হবে’।

জীবনে অনেক বড় বড় বাধা থাকা সত্ত্বেও দক্ষিণ আফ্রিকার এই নেতা কখনও নেতিবাচকতাকে প্রশ্রয় দেননি। তিনি বলতেন, ইতিবাচক থাকার উপায় হচ্ছে মাথা সূর্যের দিকে রাখা এবং এক পা এগিয়ে যাওয়া। মানবতার প্রতি আমার বিশ্বাসে যখন খুব তিক্ততার সাথে পরীক্ষা করা হতো তখন অনেক কালো মূহূর্ত গেছে আমার জীবনে, কিন্তু আমি কখনও পরাজয়ের কাছে নতি স্বীকার করিনি। এটা করা মানেই পরাজয় এবং মৃত্যু’।

বিংশ শতকের বিখ্যাত দার্শনিকদের একজন ম্যান্ডেলা এটাও বিশ্বাস করতেন যে, প্রকৃত নেতাকে হতে হবে তার জনগণের প্রকৃত চালক। এই তিনি নিজেই নিজের সমস্ত জীবন উৎসর্গ করে দিয়েছেন মানুষের মুক্তির জন্য, কল্যাণের জন্য। জীবনভর তিনি বর্ণবাদ আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়ে গেছেন।

কি ধরনের চ্যালেঞ্জ বা উঠানামা একজন মানুষের জীবনে আসে, তা কোন ব্যাপার না, এগিয়ে যাওয়ার একটাই উপায়, তাহলো দাঁড়িয়ে থাকা, আতংক-ভীতিকে জয় করা এবং পরবর্তী বিচারের জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখা। ‘বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় সাফল্য কিন্তু কখনও ব্যর্থ না হওয়া নয়, বরং যতবার ব্যর্থতা আসবে ততবারই উঠে দাঁড়ানোর মধ্যেই আসল সাফল্য’।

‘আর সাহস কখনও ভয়ের অনুপস্থিতি নয়, বরং এর পিছনে ছোটার জন্য অন্যদের অনুপ্রাণিত করে’।

ম্যান্ডেলার কাছে, সাফল্য হচ্ছে তাই, যা কিনা কতবার আমি পড়ে গেছি এবং কতবার উঠে দাঁড়িয়েছি, তা নির্ধারণ করে’। বিশ্ব রাজনীতির জটিলতা নিয়ে একবার তিনি বলেছিলেন, ‘তুমি যদি তোমার শত্রুর সাথে শান্তি স্থাপন করতে চাও, তবে তার সাথে তোমাকে কাজ করতে হবে। তখনই সে তোমার পার্টনার হবে’। তিনি খুব দৃঢ়তার সাথে বিশ্বাস করতেন যে, ‘প্রতিটি মানুষের ভিতরে মহত্ব অর্জন করার সামর্থ্য আছে’। ‘প্রত্যেকেই তাদের অবস্থার ঊর্ধ্বে উঠে সফলতা অর্জনের ক্ষমতা আছে যদি তারা তাদের কাজের প্রতি আগ্রহ ধরে রাখতে পারে এবং নিবেদিত হয়’।

ম্যান্ডেলার মতে, শিক্ষা হচ্ছে মানবতার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। তিনি বলেন, ‘শিক্ষা সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র যা তুমি বিশ্বকে পরিবর্তনে ব্যবহার করতে পারো’।

৯৫ বছর বয়সী ম্যান্ডেলা জোহানেসবার্গের হাউটন শহরতলিতে নিজ বাড়িতে বিশেষ ব্যবস্থায় নিবিড় চিকিৎসায় ছিলেন। ফুসফুসে সংক্রমণজনিত অসুস্থতার কারণে প্রিটোরিয়ার মেডিক্লিনিক হাসপাতালে প্রায় তিন মাস চিকিত্সা নেওয়ার পর গত ১ সেপ্টেম্বর বাড়িতে ফেরেন তিনি।

দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষাঙ্গ প্রেসিডেন্ট ও বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রবাদপুরুষ ম্যান্ডেলা ২৭ বছরের কারাজীবন থেকে বেরিয়ে বর্ণভেদে রক্তাক্ত দেশটিকে গণতন্ত্রের পথ ধরিয়েছিলেন। ৯৫ বছরের জীবন তিনি উৎসর্গ করেছিলেন সেই সংগ্রামের পথেই।

টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট জুমা বলেন, পূর্ণ রাষ্ট্রীয় সম্মানে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া হবে। তিনি জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখার নির্দেশ দেন।

“প্রিয় দেশবাসী, আমাদের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট, আমাদের সবার প্রিয় নেলসন রোহলিহলা ম্যান্ডেলা চলে গেছেন,” বলেন জুমা।

“নিজের বাড়িতেই শান্তিপূর্ণভাবে তিনি মারা গেছেন।”

জুমার ওই ঘোষণার পরপরই বিশ্বের সব প্রান্ত থেকে একের পর এক শোক বার্তা আসতে শুরু করে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেন, “এই পৃথিবীতে আমরা যাদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছি, তাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী ও সবেচেয়ে সাহসীদের একজন, সত্যিকারের

একজন ভাল মানুষকে আমরা হারালাম।”

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বলেন, “ম্যান্ডেলা ছিলেন আমাদের সময়ের মহানায়ক। পৃথিবীর এক আলোকবর্তিকা আজ নিভে গেল।”

নেলসন ম্যান্ডেলার মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।

১৯১৮ সালের ১৮ জুলাই জন্ম নেয়া নেলসন রোলিহ্লাহ্লা ম্যান্ডেলা তার নিজের দেশের মানুষের কাছে অনেক বেশি পরিচিত  ‘মাদিবা’ নামে, এটি তার গোত্র নাম। নিজের গোত্রে অজ গ্রামীণ জীবন থেকেই তার উত্থান। সেখান থেকেই তিনি আন্দোলণ শুরু করেছিলেন সংখ্যালঘু শক্তিমান শ্বেতাঙ্গ সরকারের বিরুদ্ধে।

তার সেই তুলনারহিত সংগ্রাম তাকে দাঁড় করিয়েছে বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে শ্রদ্ধাস্পদ ও ভালবাসার অন্যতম এক নেতা হিসেবে।

জুমা তার ভাষণে বলেন, “আমাদের জাতি এক অভিভাবক হারালো। এ দিনটি অনিবার্য জানলেও এ অতুলনীয় ও অমোচনীয় ক্ষতি আমাদের মন থেকে মুছে যাওয়ার নয়।”

দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার আদায়ে শ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের ডাক দিয়েছিলেন তিনি।

৩০ বছরের সংগ্রামের পরে দেশটিতে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখা সংখ্যালঘু শ্বেতাঙ্গরা ধীরে ধীরে নমনীয় হতে শুরু করলে দেশ পুনর্গঠন ও ক্ষমা ঘোষণা করার ক্ষেত্রেও বিলম্ব করেননি মহান এই নেতা।

১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার সব জাতিগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে প্রথম নির্বাচনে দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তিনি।

১৯৯৯ সালে তিনি রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

১৯৯৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ নেতা এফ ডব্লিউ ডি ক্লার্কের সঙ্গে যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার অর্জন করেন।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে ম্যান্ডেলার সামনে ছিলো বর্ণবাদের ভিত্তিতে অসমতা ও বঞ্চনায় কয়েক যুগ ধরে পিষ্ট হতে থাকা দক্ষিণ আফ্রিকাকে একত্রিত করার বিপুল কর্মযজ্ঞ।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে এ লক্ষ্যেই কাজ করে গিয়েছিলেন তিনি ও তার প্রশাসন।

তার এ লক্ষ্যযাত্রার মূল নিদর্শন ছিল ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’, যার মাধ্যমে বর্ণবাদবিরোধী দীর্ঘ সংগ্রামের সময়ে উভয়পক্ষের দ্বারা সংঘটিত অপরাধসমূহের বিচার করা হয়েছিলো।

এর মধ্যে দিয়ে জাতিগত দাঙ্গার ক্ষত সারিয়ে তোলা ছাড়াও, আত্মবিরোধ থেকেও বেরিয়ে আসার সুযোগ পায় দেশটির নাগরিকরা।

১৯৯৯ সালে ম্যান্ডেলা স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়ে দেন আধুনিক অর্থনীতিতে উন্নততর বোধ ও ব্যবস্থাপনা দক্ষতাসম্পন্ন উত্তরসূরীদের হাতে।

দক্ষিণ আফ্রিকার বাইরে আফ্রিকার অন্যান্য দেশের নেতাদের জন্যও এটি এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

রাজনীতি থেকে অবসর নেয়ার পরে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় এইডস রোগের ছড়িয়ে পড়া রোধে কাজ শুরু করেন।

তার এ মিশন ব্যক্তিগত সংগ্রামে রূপ নেয় ২০০৫ সালে তার একমাত্র জীবিত ছেলে এ রোগে মারা যাওয়ার পরে।

২০১০ বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল খেলার সময় শেষবারের মতো জনসমক্ষে আসেন ম্যান্ডেলা।

সোয়েতোর সেই স্টেডিয়ামে ৯০ হাজার দর্শক দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে সেদিন তাকে স্বাগত জানায়।এই সোয়েতোতেই সংগ্রামের নেতা হিসেবে অভিষেক হয়েছিলো ম্যান্ডেলার।

১৯৬৩ সালে কুখ্যাত রিভোনিয়া ট্রায়ালে হত্যার অভিযোগে (ক্যাপিটাল অফেন্স) বিচারের সময় কাঠগড়ায় ম্যান্ডেলার দেয়া বক্তব্যটি তার রাজনৈতিক জীবন ও দর্শন সম্পর্কে তার সাক্ষ্য বহন করে।

তিনি বলেছিলেন, “আমার সারাজীবন আমি উৎসর্গ করেছি আফ্রিকার জনগণের সংগ্রামের প্রতি। আমি লড়েছি শ্বেতাঙ্গ শোষণের বিরুদ্ধে, আমি লড়েছি কৃষ্ণাঙ্গ শোষণের বিরুদ্ধেও।”

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.