হ্যালো বাংলাদেশ, শুনতে কি পাও?

Rape victঅপরাহ্ণ সুসমিতো: জেইন মুসতাশ নামে আমার একজন সহকর্মী আছেন। খুব হাসিখুশী প্রাণবন্ত একজন ভদ্র মহিলা । সারাক্ষণ হাসে আর আহ্লাদ করে কথা বলে।

আমি প্রথমদিন ওর ফ্যামিলি নেম শুনে চমকে গিয়েছিলাম। মুসতাশ মানে তো গোঁফ। কারো নামের শেষ অংশ গোঁফ হতে পারে ধারণা ছিল না। বেশ কষ্টে হাসি চেপে রেখেছিলাম সেদিন।

উনি আমার পাশের টেবিলে বসেন। নিচে কফি আনতে গেলে ভদ্রমহিলা সুইট করে চোখ টিপে দেন আমাকে। আমি এই ইশারাটা এখন বুঝি। প্রথমে বুঝতাম না।

আমাদের দেশে কাউকে চোখ টিপে ইশারা করা খুব বাজে দৃষ্টিতে দেখা হয়, কোনো মেয়েকে চোখ টিপে ইশারা করলে তো আপনার খবর আছে। তো জেইনের এই চোখ টেপার মানে হলো নিচে যেহেতু আমি কফি কিনতে যাচ্ছি, আসার সময় যেন ওর জন্য দুটো ক্রিম নিয়ে আসি। কফি কিনলে ক্রিম যেহেতু ফ্রি। আমি মহা আনন্দে ক্রিম নিয়ে আসি জেইনের জন্য।

ওনার গায়ের রঙ আমাদের চেয়ে বেশ ডার্ক (এখানে কালো রঙকে ভদ্র ভাষায় ডার্ক বলে)। প্রথম দেখায় আমি ভেবেছিলাম মরিসাসের হবেন। আমাদের প্রথম পরিচয়ের কথোপকথন অনেকটা এরকম (বলা বাহুল্য ফরাসি ভাষায়);

: তুমি দেখতে অনেক আলাদা । লম্বা চুল । গান করো ? তোমার দেশ কোথায় ?
: ধন্যবাদ । গান করি তবে একাকী,যখন পকেটে টাকা থাকে না । আমি বাংলাদেশের ।
: ও তুমি বাংলাদেশের ? কি সুইট ! কাঁচা মরিচ খাও খুব ? বাংলাদেশের লোক খুব ভালো, তবে শুঁটকি খায় খুব ।

আমি বোকার মতো তাকিয়ে থাকি । তবু মুখে হাসিয়ে ঝুলিয়ে বলি;
: তুমি কোন স্বর্গীয় দেশ থেকে ?
: সিশেল ।
: আবার বলবে কোথায় ? দু:খিত শুনতে পাইনি ।
: সিশেল ।

বিসিএস পরীক্ষা দেবার ফলে দেশ রাজধানী মুদ্রার নাম জানার ব্যাপারে আমার একটা গর্ব ছিল নিজের কাছে । কিন্তু মূহূর্তে আমি ফেল করলাম জেইনের কাছে। হা করে তাকিয়ে রইলাম ওর দিকে। সে বুঝতে পেরছে যে আমি ওর দেশটা চিনতে পারিনি।

রাতে বাসায় এসে গুগল করে দেখলাম যে সিশেল হলো ভারত মহাসাগরের পাশে ছোট্ট দ্বীপ রাষ্ট্র (আফ্রিকা মহাদেশের অন্তর্ভুক্ত)। প্রতিবেশী দেশ মাদাগাস্কার। আয়তন মাত্র ১৫০০ কিমি (৯৩২ মাইল) । সবচেয়ে অবাক হলাম, লোক সংখ্যা মাত্র ৮৬,৫২৫ জন । আমাদের কোনো মফস্বল শহরের চেয়েও কম । রাতেই মুখস্থ করলাম তথ্য ।

পরের দিন ওকে গড়গড় করে সব তথ্য জানিয়ে মুগ্ধ করে দিলাম ।

 

জেইনের সাথে ভালো খাতির হয়ে গেল। এর পর একদিন দেখি ও আমার জন্য মাছ ভেজে নিয়ে এসেছে। অপূর্ব স্বাদ। একটাই সমস্যা, ভয়াবহ ঝাল। আমি একদিন সিঙ্গারা কিনে নিয়ে গেলাম, সাথে ধনে পাতার চাটনি। চাটনিটা দেলোয়ার হোসেন সাঈদী টাইপ। জেইন খাচ্ছে আর আহ উহ করছে । সে কী যে সুন্দর দৃশ্য! পুরো অফিস সে আমার প্রশংসা করে বেড়াচ্ছে ।

আজ সকালবেলা জেইনের সাথে যথারীতি দেখা। খেয়াল করলাম ও বেশ গম্ভীর । বুঝতে পারছি কিছু একটা সমস্যা । এই মহিলা তো সারাক্ষণ হাসে । বিষয় কি ? আমি সহজ করবার জন্য বললাম;
: আমার জন্যে আজকে কি খাবার এনেছো ? কোনো সিশেল স্পেশাল ?

জেইন জবাব দেয় না । বুঝলাম অবস্থা গুরুতর । কিছুক্ষণ চুপচাপ । হঠাৎ জেইন আমার দিকে বিষণ্ণ তাকিয়ে বলে উঠলো নরম গলায়;

: তুমি তো জানো এখানকার বাসে ট্রেনে পাবলিক প্লেসে প্রেগন্যান্ট মেয়ে দেখলে সবাই তার আসন ছেড়ে দেয় সসম্মানে আগামী মায়ের জন্য। আর তোমাদের বাংলাদেশে কি করে মানুষ এরকম প্রেগন্যান্ট মেয়েকে পুড়িয়ে ফেলে ? আমি কাল রাতে টিভিতে নিউজ দেখে আর ঘুমাতে পারিনি । আমাকে কি বলবে, কী হয়েছে ?

আমি চুপ করে রইলাম বসে। কিছু বলতে ইচ্ছে করছে না । মনে হলো আমার মুখ কেউ টেপ দিয়ে আটকে দিয়েছে ।

নিচে নামলাম কফি আনবো। আসার পথে জেইনের জন্য ক্রিম নিয়ে এলাম । এসে থাকি জেইন টেবিলে মাথা রেখে চুপ হয়ে আছে। আমি জেইনের মনটা হাল্কা করার জন্য ওর পাশে গিয়ে বললাম, দেখো তোমার জন্য অনেক ক্রিম এনেছি। জেইন আমার সাড়া পেয়ে মুখ তুলে তাকাল ।

এ আমি কি দেখছি ! জেইন কাঁদছে ।

ক্রিম আর দেয়া হলো না । জ্যাকেট পরে অফিস থেকে নেমে এলাম। বসকে টেক্সট করে দিলাম আজ আমার শরীর ভালো নেই, ছুটি দিও প্লিজ ।

সাঁ- আন্তোয়ান স্ট্রিট ধরে হাঁটছিলাম তীব্র তুহিন মেখে ।

হ্যালো বাংলাদেশ, শুনতে কি পাও? আমার সহকর্মী কাঁদছে ..

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.