নির্বাচন: আলোচনা এবং সমঝোতা

Sina Akhterসীনা আক্তার: এই মূহূর্তে দেশের অধিকাংশ মানুষের একটাই চাওয়া, সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন। কিন্তু আমরা আম-জনতা যা চাই, সকল রাজনৈতিক দলগুলো তা চায় কি!

একটা নির্বাচন হতে যাচ্ছে বটে, কিন্তু সে নির্বাচনে দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ বিরোধী জোটের অংশগ্রহণ এখন পর্যন্ত অনিশ্চিত। আ.লীগ সহ সরকারী জোট চায় বহুদলের সরকার এর অধীনে, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে নির্বাচন। অন্যদিকে, বিএনপি জোট চায় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার এর অধীনে নির্বাচন।  সংবিধানে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা  ইতোমধ্যে বাতিল করা করেছে।  কাউকে না কাউকে এই ব্যবস্থা বাতিল করতে হতো, কারণ একটা গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থায় নির্বাচনকালীন একটা অ-নির্বাচিত সরকার ব্যবস্থা  চিরদিন চলতে পারে না।

দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির আলোকে বলা যায়, যে সরকারই এই ব্যবস্থা বাতিল করতো, বিরোধীপক্ষ তা সহজে গ্রহণ করতো না। মানে, বিএনপি জোট ক্ষমতায় থাকতে যদি তত্ত্ববধায়ক সরকারের কোন বিকল্প ব্যবস্থা নেয়া হতো, আ.লীগ হয়তো তা গ্রহণ করতো না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এখনও পরস্পরের প্রতি আস্থা-সম্মান-পেশাদারী মনোভাবের অভাব রয়েছে বলেই মনে হয়। প্রসংগক্রমে উল্লেখ্য, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত গত সকল জাতীয় নির্বাচনে দেখা গেছে, যে দল পরাজিত হয়েছে তাঁরাই নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনেছেন। ভবিষ্যতে যে এর ব্যতিক্রম হবে তা হলফ করে বলা যায় না। তাই তত্ত্বাবধায়ক বা বহুদলীয় সরকার এর চেয়ে অনেক বেশী জরুরী একটা সুষ্ঠু নির্বাচন, তাতে সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ এবং নির্বাচন এর ফলাফলের প্রতি সকল দলের ইতিবাচক এবং পেশাদারী মানসিকতা-আচরণ।

নির্দলীয় তত্ত্ববধায়ক সরকারের বিকল্প হিসাবে আ.লীগ প্রস্তাবিত নির্বাচনকালীন বহুদলীয় সরকার ব্যবস্থা একেবারে অন্যায্য নয়।  কারণ এই ব্যবস্থায় একটা নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ রয়েছে।একটা নিরপেক্ষ সুষ্ঠু নির্বাচন কিভাবে করা যায় সে বিষয়ে বিএনপি জোটকে বাস্তবসম্মত কৌশল প্রস্তাব করে এবং  আলোচনা-পর্যালোচনার মাধ্যমে ঐকমত্যে আসতে হবে।  সমঝোতা-সমাধানের লক্ষ্যে কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়ার  ক্ষেত্রে আ.লীগ এবং বিএনপি জোট দুপক্ষকেই সত্যিকার অর্থেই আন্তরিক হতে হবে; তবে সরকারী দল হিসাবে আ.লীগের দায়িত্ব একটু বেশী বলেই আমি মনে করি।

নির্বাচনকালীন সময়ে ‘সরকার প্রধান’ হিসাবে শেখ হাসিনার ব্যপারে বিরোধী জোটের আপত্তি স্পষ্ট। যে কারণেই হোক দীর্ঘদিন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে আস্থাহীনতা তৈরী হয়েছে তা এত দ্রুত দূর হবে আশা করা যায় না। আরো স্পষ্ট করে বলা যায়, এ ধরনের পরিস্থিতিতে সরকার প্রধান হিসাবে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে আ.লীগ জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে- আশা করা যায় না।  তাই বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিবেচনা করেই আ.লীগকে নির্বাচনকালীন ‘সরকার প্রধান’ এর দায়িত্বে ছাড় দেয়া দরকার। নিন্মোক্ত প্রস্তাব বিবেচনা করা যেতে পারে,

১. বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সরকার প্রধান থাকতে পারেন কিন্তু নির্বাচন পরিচালনায় তিনি কোন দায়িত্বে থাকবেন না। রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে নির্বাচন হতে পারে, যেখানে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত নেবার পূর্ণ স্বাধীনতা এবং সর্বোচ্চ ক্ষমতা থাকতে হবে।

২. বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সরকার প্রধান থাকতে পারেন কিন্তু নির্বাচন পরিচালনায় তিনি কোন দায়িত্বে থাকবেন না। মন্ত্রীদের নিজ মন্ত্রণালয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবার সর্বোচ্চ ক্ষমতা থাকতে হবে এবং নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনভাবে নির্বাচন পরিচালনার সর্বোচ্চ ক্ষমতা থাকতে হবে।

৩.  রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকালীন সরকার প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তাঁর পদ ছেড়ে দিবেন।

একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে সরকারী দলের চেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে; যেমন-বিরোধী জোটকে বার বার সংলাপের আমন্ত্রণ জানানো, বহুদলীয় সরকারে যে কোন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেবার প্রস্তাব এবং স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর উক্তি -তিনি প্রধানমন্ত্রীত্ব চান না, বরং মানুষের শান্তি চান। এ সবই ইতিবাচক মনোভাবের লক্ষণ কিন্তু কর্মপন্থায় এই মনোভাব প্রতিফলন বেশী জরুরী, মানে সমস্যা সমাধানের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ দরকার। একইভাবে আমরা বিরোধী জোটের আন্তরিক চেষ্টা এবং ইতিবাচক উদ্যোগ দেখতে চাই। দূর্ভাগ্যজনকভাবে গত কয়েকমাসে বিরোধী জোটের কর্মসূচী থেকে মানুষ-দেশ কোন ইতিবাচক ফলাফল পায় নি। ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরির নামে হরতাল-অবরোধ- সহিংসতা কখনো কাম্য নয়। এ ধরনের কর্মকাণ্ড বিরোধী জোটের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সদিচ্ছাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আদর্শ-মতের ভিন্নতা থাকবে কিন্তু আলোচনা-যুক্তি-তর্ক দিয়ে সে ভিন্নতা প্রকাশই সম্মানজনক আচরণ।

বিরোধিতার নামে সহিংস কর্মকাণ্ড কোন সভ্য- বিবেকবান মানুষের কাছেই গ্রহণযোগ্য নয়, এবং সেই সহিংসতাকে কু-যুক্তি দিয়ে জায়েজ করার চেষ্টা কখনো দায়িত্বশীল আচরণ হতে পারে না। এতে দেশে-বিদেশে এই বার্তাই দেয়া হয় যে,  রাজনৈতিক দলগুলো প্রজ্ঞা-কৌশল-আলোচনা-পর্যালোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানে সক্ষম নন, কি লজ্জা! দেশের এই নাজুক পরিস্থিতিতে দেশী-বিদেশী বিবেকবান মানুষেরা ইতোমধ্যে নানাভাবে চেষ্টা করছেন যাতে সকল রাজনৈতিক দল একটা শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমস্যার সমাধান করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন।

কিছুদিন আগে আমেরিকায় বাজেট নিয়ে সরকার এবং বিরোধী দলের মতপার্থক্যের কারণে বিরোধী দল সে দেশের জনপ্রশাসন আংশিকভাবে অচল করে দিয়েছিল। এর জন্য বিরোধী রিপাবলিকান দলকে কোন হরতাল-আগুন-রক্তপাত- সহিংসতা করতে হয়নি। বরং তাঁরা বিরোধিতা করেছেন যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে, আবার সমঝোতা করেছেন আলোচনা-পর্যালোচনার  মাধ্যমে এবং এটাই হচ্ছে গণতন্ত্রের চর্চা। আমার বিশ্বাস আমাদের রাজনীতিবিদরা চাইলে তাঁরাও পারেন, এর জন্য দরকার আর একটু বেশী আন্তরিক ইচ্ছা, একটু বেশী দেশ-জনগণের প্রতি সত্যিকার ভালবাসা।

ড. সীনা আক্তার, গবেষক।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.