যেখানে ভালবাসা সীমানা ছাড়িয়ে যায়

Philline Typhoonউইমেন চ্যাপ্টার: পৃথিবীতে এখনও অনেক পুরুষ আছে যারা তাদের ভালবাসার জন্য সব দিতে পারে। হামৌদি তেমনই একজন পুরুষ। তিনি তার হবু বউকে শুধু দুর্যোগ থেকে উদ্ধারই করেননি, পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে গিয়ে খুঁজে পাওয়ার পর ক্ষতবিক্ষত কনেকে বিয়েও করেছেন। ঘটনাটি ঘটেছে ফিলিপাইনে। এটি একটি জীবনের গল্প, অনেক সময় এসব গল্প হার মেনে যায় বাস্তবতাকে।

হুসাম হামৌদি থাকেন কানাডার মন্ট্রিয়েলে। তার বিয়ে ঠিক হয়েছিল ফিলিপাইনের এক মেয়ের সাথে, আগামী বছর মে মাসে। কিন্তু টাইফুন হাইয়ান সব ওলটপালট করে দিয়েছে। হবু বউটিকে মৃত্যুর মুখ থেকে তিনিই বাঁচিয়ে নিয়ে এসেছেন। কিন্তু এজন্য তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে দীর্ঘপথ, কানাডা থেকে ফিলিপাইন। তিনি তার হবু বউকে খুঁজে পান টাইফুন-বিধ্বস্ত ফিলিপাইনে ততোধিক বিধ্বস্ত একটি ক্লিনিকে। ক্লিনিক থেকে উদ্ধারের পর গত শনিবার হামৌদি এবং গ্রেস আকোজোদো হাসপাতালেই বিয়েটা সেরে ফেলেন।

টাইফুন হাইয়ানের আঘাতে গুরুতর আহত আকোজোদোর সারাু শরীরে এখন কাঁটাছেঁড়া, সেলাই। হাইয়ানের আঘাতে ফিলিপাইনে এ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা পাঁচ হাজারেরও বেশি। কিন্তু ডান চোখে গুরুতর আঘাত, হাতের কব্জি ভেঙ্গে গেছে, আঙ্গুলগুলোও থেতলে আছে, সেইসাথে আছে ভয়াবহ পায়ের সংক্রমণ।পুরো মুখে তার সেলাই।

কেবু দ্বীপ থেকে একটি সংবাদ সংস্থাকে হামৌদি বলেন, ‘আমি যদি এখানে না পৌঁছাতাম, তাহলে কী হতো তা ভাবতেও পারছি না। হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আরও এক সপ্তাহ এভাবে পড়ে থাকলে তার পা কেটে ফেলতে হতো’।

কানাডা থেকে ফিলিপাইন যাত্রা হামৌদির জন্য অত সহজ ছিল না। তিনি বিমান ভাড়া জোগাড়ের জন্য গাড়িটি বিক্রি করে দেন, যেখানে চাকরি করেন, সেখান থেকে পেয়েছেন তিন হাজার ডলার। এরপরও হামৌদির এই উদ্ধার অভিযান কল্পকাহিনীকেও হার মানায়।

ফিলিপাইনে পৌঁছার পর হামৌদি আবিষ্কার করেন যে, যে নৌকাটির টিকিট তিনি কেটেছিলেন আকোজোদোর শহরে যাওয়ার জন্য, সেটি বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে অন্য একজনের কাছে। তিনি তখন অন্য একটি নৌকার জন্য পাগলের মতো ছুটে বেড়িয়েছেন। অরমক ক্লিনিকে যখন তিনি শেষপর্যন্ত পৌঁছান, পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠে।

‘চারদিকে নোংরা, আবর্জনার স্তুপ, মনেই হচ্ছিল না এটা কোন ক্লিনিক’। হামৌদি বলেন, ‘যখন আমি গ্রেসকে খুঁজে পাই সেখানে, বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাই। কসাইয়ের মতো সেলাই দেয়া হয়েছে ওর ক্ষতগুলোতে, কিছু ক্ষত তখনও হা করে ছিল, সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছিল কোন কোনটি থেকে এবং ব্যান্ডেজ বদলানো হচ্ছিল না। পশুদের মতো আচরণ করা হচ্ছিল গ্রেসের সাথে’।

হামৌদি ৪০০ ডলার খরচ করে আকোজোদোকে ক্লিনিক থেকে বের করে নিয়ে আসে। কিন্তু ফিরবে কিভাবে? নৌকাই যে নেই। হামৌদি দখন একজন উপকূল রক্ষীবাহিনীকে অনুরোধ করে একটি নৌকা জোগাড় করে দিতে। গ্রেস আর হামৌদির বিয়ের তারিখ ছিল আগামী মে মাসে, কিন্তু এই অবস্থায় আর দেরি করতে চাইলো না দুজনের কেউই।

কেবু হাসপাতালে নিয়ে আসার পর আসোজোদোর পরপর কয়েকটি অপারেশন হয়, তার দাঁত ঠিক করা হয়, হাতের কব্জিতেও অপারেশন হয়। মন্ট্রিয়েলে ফেরার আগে তার মুখে সার্জারির প্রয়োজন আছে বলে জানান হামৌদি।

পেশায় ওয়েব টেকনিশিয়ান হামৌদি তার সবটুকু দক্ষতা কাজে লাগিয়ে অনলাইনে ১১ হাজার ডলার জোগাড় করেন। হাইয়ানের মতো শক্তিশালী টাইফুনে ক্ষতবিক্ষত আকোজোদোর মনেও এতে জোর আসে। হামৌদি বলেন, ‘শুরুতে আকোজোদো বাঁচবে কিনা, সেই আশাই ছিল না। কিন্তু এখন সে হাসে, কথা বলে, সে তার জীবনের স্বাদ আবার ফিরে পেয়েছে’।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.