ভ্যালেরি টেইলরের দেশে!

nariতানিয়া মোর্শেদ: ১৯৬৯-এ গার্ল গাইডস-এর ডিভিশনাল অর্গানাইজার (রাজশাহী) হিসাবে কর্ম জীবন শুরু। নারীদের নিয়ে কাজ। কাজের অংশ ছিল সরকারি হাসপাতালে যে সব নারীদের পরিবার ত্যাগ করতো তাদের (হ্যাঁ এমন পরিবারও ছিল যারা স্ত্রীরোগে আক্রান্ত নারীদের ত্যাগ করত!), জেলখানার কয়েদী নারীদের পুনর্বাসন। ১৯৭১-এও অফিস খোলা রাখতে হয়েছে। এটি ছিল বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বিদেশি ফান্ডের। পাকিস্তানী সরকারের অধীনে নয়। অফিসের সামনের মাঠে রাজাকারদের ট্রেনিং চালু হলে তা বন্ধ করে দিয়েছিলেন অসীম সাহসিকতা আর বিচক্ষণতা দিয়ে। নারীদের অফিসের সামনে পুরুষদের ট্রেনিং হয় কিভাবে এই যুক্তি দিয়ে!

১৯৭৩ পর্যন্ত কাজ করেছেন এখানে। এরপর কিছু সময়ের বিরতির পর (আগেই বলেছি কেন) ১৯৮০ থেকে ইউএসএইড-এর ফান্ডে কাজ শুরু। নারী ও শিশুদের জন্য। পরিবার পরিকল্পনা, শিশুদের ইমিউনাইজেশন (টীকা দান) দিয়ে শুরু। কাজের পরিধি বাড়তে বাড়তে ছয়টি জেলায় চৌদ্দটি ক্লিনিক স্থাপন। সেখানে শিশুর জন্ম থেকে শুরু করে সবার জন্য চিকিৎসা পর্যন্ত চলে।

এই এত বড় কর্মকাণ্ডের শুরু থেকে তিনি। অফিস ভাড়া থেকে ফার্নিচার কেনা থেকে সব, সব কিছু নিজের হাতে করা। একটি স্বেচ্ছাসেবক সংগঠন পরিচালনা পরিষদ হিসাবে ছিল। এনজিও ব্যুরোর রেজিস্ট্রেশন, ফান্ড জোগাড়, প্রতিটা কাজের জবাবদিহিতা সরকার থেকে ফান্ড দাতা সংস্থাকে, সমস্ত কিছু তাঁর দায়িত্ব ছিল। অফিস থেকে কখন বাড়ি ফিরবেন তা নিজেও জানতেন না! ছিল ক’দিন পর পর ট্যুর, ঢাকা অফিসে প্রতিমাসে মিটিং (প্রায়ই একাধিকবার), বিদেশে ট্রেনিং। সে যুগে বাংলাদেশে এধরনের কাজ করতেন হাতে গোণা কয়েকজন নারী।

চাকুরী বাদেও যে কত কিছুর মধ্যে ব্যস্ত থাকতেন! মানুষের সেবা, সমাজ সেবা জীবনের অংশ ছিল, আছে। ক্যাম্পাসের কোন শিক্ষকের স্ত্রীর সন্তান জন্মাবে, রাতের বেলা নিয়ে ছুটলেন হাসপাতালে। চেনা-অচেনা ব্যাপার নয়! কিশোরী মেয়ে বাবা-সৎমায়ের সাথে রাগ করে বাড়ি ছেড়ে রাজশাহী শহরে এসেছে (অন্য জায়গা থেকে), বাড়িতে নিয়ে রাখলেন, আত্মীয়ের মত মাসের পর মাস। পড়তে বললেন। বেশ লম্বা সময় পর বাবাকে ডেকে এনে মেয়েকে বুঝিয়ে বাড়ীতে পাঠালেন। কিছু সময় পর সেই মেয়েকে নার্সিং ট্রেনিং সেন্টারে ভর্তি করে দিলেন। আজ অনেক বৎসর হলো সে নার্স। সেই মেয়ে নিজেকে তাঁর ছোট মেয়ে বলে জানে। দুঃখজনক যে যোগাযোগ হারিয়ে গেছে ক্যাম্পাস ছাড়বার পর। সে খুঁজছে ক্যম্পাসে! তিনি খুঁজছেন নওগাঁর বিভিন্ন হাস্পাতালে, ক্লিনিকে! এ জীবনে কত যে নারীর পাশে, শিশুদের জন্য দাঁড়িয়েছেন জানা নেই। কেউ কোনো বিপদে পড়েছে জানামাত্র ছুটলেন! কোনো না কোনোভাবে সাহায্য করেই ছাড়বেন! কোনো কিছুই কি বিনামূল্যে হয় এ জগতে?

মুল্য দিয়েছেন তিনি (সময়, শক্তি দিয়ে), তাঁর সন্তানরা-পরিবার দিয়েছে অন্যভাবে! সে গল্প এখানে নয়। হয়ত কখনো অন্যভাবে অন্য কোনোখানে, বা হয়তো নয়!

নিজের সন্তানের গায়ের জামা খুলে দিয়ে দিয়েছেন বস্ত্রহীন শিশুকে। শিশু সন্তান তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছে, আর নিয়েছে জীবনের পাঠশালায় পাঠ! সন্তানের জীবনের মহামূল্যবান পরীক্ষা (সে সময়) বাড়িতে নিয়ে এসেছেন আত্মীয়কে। কখনো সন্তান জন্মদান কারণ, কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা, কখনো চিকিৎসা। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্ল্যাটে বাস। স্কয়ার ফুটে বেশ বড় হলেও বাজে ডিজাইনের কারণে মাত্র দু’টো বেড রুম! যেখানে সন্তান পড়ছে, সেখানেই থাকো সবাই! সারা জীবন বাড়িতে কেউ না কেউ থেকেছেন, এই সেদিন পর্যন্ত। জীবনের নির্মম পরিহাস, সন্তানদের বাবা অসুস্থ হয়ে নয়দিন হাসপাতালে (আইসিইউ-তে থাকাসহ), পাশে কেউ নেই! না, সন্তানরাও নয়! এ কেমন জীবন!

কোনো নামের আশায়, পুরষ্কারের আশায় করেননি, করেন না এসব কাজ। ১৯৯৬ থেকে তাঁর প্রতিষ্ঠানের ক্লিনিকে জন্মানো শিশুদের জন্ম নিবন্ধন (বার্থ সার্টিফিকেইট) দেওয়ার চল চালু করেন। শহরের মেয়রের সাইন দিয়ে তার ভ্যালিডিটি দেখনো হতো। পরবর্তীতে সেই মেয়র এই কাজ দেখিয়ে বিদেশে গেছেন, পুরষ্কার পেয়েছেন। আরও পরে ২০০২ থেকে বাংলাদেশ সরকার এই বার্থ সার্টিফিকেট চালু করেন।

না, তাঁর নাম কোথাও নেই। থাকবার কথা কী! না গ্রাম, না শহর এমন জায়গায় স্কুল না থাকবার জন্য শিশুরা পড়তে পারে না। এলাকার প্রভাবশালী মানুষদের কাছ থেকে জমির ব্যবস্থা করে গাছের তলায় স্কুল শুরু করান। পরবর্তীতে জাপান সরকারের কাছ থেকে ফান্ড এনে স্কুল বিল্ডিং করান। সব কিছু ঠিক করে দেওয়ার পর সরকার স্কুলটিকে স্বীকৃতি দেয়, তার আগে নয়!

প্রায়ই প্রবাসী কন্যা বলে, এর খোঁজ নিতে পারবে, তার জন্য কিছু করতে পারবে ইত্যাদি। আর তিনিও শত ব্যস্ততার মধ্যে ঠিকই করে দেন সেসব কাজ! শিক্ষাটা তাঁর বাবা-মা’র কাছ থেকেই পাওয়া।

সন্তান বলে চলেছে, অনেক হয়েছে, আর কত, এবার ছাড়ো। তাঁর চিন্তা, তিনি ছেড়ে দিলে বাকী এমপ্লয়িদের কি হবে? এতগুলো পরিবার চলবে কি করে? “নামমাত্র” পরিচালনা পরিষদের মানুষগুলো যুগের সাথে তাল মিলিয়ে সব জায়গায় “টাকার” সন্ধান শুরু করলেন! স্বেচ্ছাসেবায় যে কোনো টাকা নেই ভুলে গেলেন!

তিনি ভাবলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে নিয়ে আসলে হয়ত ভালো কিছু হবে! প্রথম একজন পুরুষকে নিয়ে আসলেন পরিচালনা কমিটিতে। মানুষকে সহজেই বিশ্বাস করা মানুষটি বুঝতেও পারলেন না কাকে নিয়ে এসেছেন! এসেই সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সব জায়গায় নিজের আত্মীয়, চেনা মানুষ নিয়োগ করতে লাগলেন, অফিসের-ক্লিনিকের বিভিন্ন যে কাজ থাকে সেগুলোতে আত্মীয়দের-চেনা মানুষদের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ করলেন! সব কিছু গুছিয়ে শেষ কার্ড প্লে করলেন। বয়সের কার্ড! যদিও এই কাজে বয়সের বাধ্যবাধকতা নেই! এদিকে তিনি কিন্তু ঠিক করেই রেখেছিলেন যে ফান্ড শেষ হবে সেপ্টেম্বরে, তিনিও কাজ ছাড়বেন সে সময়। কিন্তু না দু’মাসও সহ্য হলো না সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পেশার মানুষটির। আর পরিচালনা পরিষদে থাকা শহরের অতি পরিচিত দু’জন নারী ডাক্তার, যুগের পর যুগ যাদের সাথে কাজ করা তারাও বিশেষ কিছুর লোভে (যদিও তাদের প্রয়োজন নেই বিশেষ কিছুর) নীতিবোধ, বিবেক সব পরিত্যাগ করলেন! দাতা সংস্থাও বিস্মিত এ ঘটনায়। কিন্তু তারাও কিছু করতে পারেনি।

বত্রিশ বৎসর ধরে তিল তিল করে গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠান থেকে গ্লানি নিয়ে রাজশাহী ছাড়লেন! তাঁর একবারও কি মনে হয়েছিল তিনি  ভ্যালেরি টেইলরের (সিআরপি’র) দেশেরই বাসিন্দা!

(আমায় ক্ষমা করো মা, আমি তোমার প্রতি হওয়া অন্যায়ের কোনো প্রতিবাদ করিনি। আমার সে ক্ষমতা নেই। তবে চেষ্টাও করিনি, কারণ আজ দূর্জনদেরই যুগ। আমি তোমাকে অন্য ভাবে হারাতে চাইনা!)

(লেখক যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী)

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.