যদিও সন্ধ্যা

parenting 2অপরাহ্ণ সুসমিতো: মা অবাক হয়ে মেয়ের সাজগোজ দেখছে। এ কি ধরনের বেয়াড়া কিসিমের প্যান্ট পরেছে। টপসটাও কেমন যেন। মা ফোঁস ফোঁস করছে মনে মনে। মেয়েটা মায়ের গোমড়া মুখ পাত্তা দিচ্ছে না। সে দুলে দুলে এঘর-ওঘর করছে। ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে দেখল তার নিজের পারফিউম শেষ। চেঁচিয়ে মাকে বলল;
: মা,তোমার পারফিউম কই । গিম্মি ইয়োরস।

মা খেঁকিয়ে ওঠেন ।
: আমার পারফিউম নাই। তোর বাপেরটা লাগা

মেয়েটা বাচ্চা ঘোড়ার মতো টকটক করে ছুটে এলো মায়ের সামনে ।
: মা, তুমি ম্যাড? আমি ছেলেদেরটা দিব? ডোন্ট সে স্টুপিড।

মেয়ের একসেন্ট আলাদা। স্বাভাবিক। মেয়ের এখানে জন্ম। বাংলা বলে ফরাসি একসেন্টে। মেয়ের মুখে ‘স্টুপিড’ শব্দটা শুনে মায়ের আরও মাথা গরম হয়ে যায়।

: এসব ঘোড়াড্ডিম কি পোষাক পরেছো ? এত টাইট প্যান্ট পেরেছো কেন ?
: ওহ মা, ডোন্ট সে টাইট। এটা ক্লোজ টু দ্য বডি।

: ওই একই কথা। বিশ্রি লাগছে তোকে। মাদী ঘোড়ার মতো দেখাচ্ছে। এত ছোট জামা পরেছিস কেন? পাছার উপরে জামা..

: মা, সো মিন তুমি। কতোবার বলেছি এ শব্দটা বলবে না। আগলি লাগে..

 

মা আর কথা বলে না। তার মাথায় আগুন। অন্যদিকে মুখ করে রাখে। মেয়েটা তার রুমে চলে যায়। সে ১৬। শনিবার আজ। আজ ওরা রবিনদের বাসায় পার্টি করবে। দুপুর থেকেই মেয়েটা উড়ু উড়ু। সারাদিন ধরে প্ল্যান আজ কি করে সন্ধ্যাটা কাটাবে।

খানিকটা টেনশন, উত্তেজনাও কাজ করছে মেয়েটার। কনফার্ম আজ রবিন ওকে চুমু করবে। সেদিন মেট্রোতে হালকা চুমু করেছিল বটে। কিন্তু মেট্রো ভর্তি লোকজন। একটু সংকোচ ছিল। দ্বিধাও। রবিনটা আস্ত ক্রেজি!

রবিন টেক্সট করেছে, আজ নাকি সারপ্রাইজ আছে। সারপ্রাইজটা কি হতে পারে? মোর দ্যান চুমু ? যদি এর বেশি ডিম্যান্ড করে ও! হি উইল ইউজ কনডোম?

ছোট বোনটা বিকেলের ন্যাপ থেকে উঠে বড় বোনটার সাজগোজ দেখে মুগ্ধ হয়ে যায়। মুগ্ধ হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে ঘুম ভাঙ্গা বড় বড় চোখে। মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে;

: ওয়াও ড্যাম সেক্সি লাগছে। ইউ আর দ্যা বেস্ট।

ছোট বোনটার সপ্রশংস বাণী শুনে বড় বোন আরো যেন উড়ে গেল শনিবার প্রাক সন্ধ্যায়। মায়ের সাথে খিটিমিটি মুছে গেল নিমিষে।

ছোট বোনটাকে বলল;

: মুন, তোমার কাছে কি টুয়েন্টি ডলার হবে?
: আছে, বাট তুমি কবে রিটার্ন করবা?
: নেক্সট উইক। তোমাকে ৫ ডলার ইন্টারেস্ট দিব। টুয়েন্টি ফাইভ দিব। কুইক দাও।

 

মেয়েটা হনহন করে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়, প্রায় প্রজাপতি সন্ধ্যায়। মা কি যেন বলতে গেল মেয়েটাকে, ততক্ষণে ও বেরিয়ে পড়ে। সময় নষ্ট করবার মানে নেই।

মন্ট্রিয়লের ফরাসী সুরভিত সন্ধ্যা। ম্যাপল পাতার গায়ে পড়ে কি যে অপূর্ব লাগছে সন্ধ্যার অনির্বাণ আলো। মোহন, নরোম, মৃদু, টুপটাপ, সিম্ফনি আর পিয়ানোর ধ্বনির রাগে।

মা অসহায় বাংলাদেশের মতো একাকী বসে থাকে লিভিং রুমে। অন্ধকার নেমে এসেছে, উঠে আলো জ্বালাতে ইচ্ছা করছে না। দুমড়ে কান্না পায়। আচানক মনে হয়, সে অসম্ভব একা,এই তার দুই মেয়ে, স্বামী, সংসার, চাঁদের আলোর মতো সুন্দর মন্ট্রিয়ল, কেউ তার নয় ।

ছোটো মেয়েটা দাঁত ব্রাশ করতে করতে লিভিং রুমে ঢুকে মাকে একা অন্ধকারে বসে থাকতে দেখে অবাক হয়ে যায় ।

: মা কি হইসে? তুমি কি স্যাড? লোনলি? পাপা কই?

আচমকা কি যেন হয় মায়ের। ছোট মেয়েটার দিকে তাকিয়েই থাকে। এই যে তার নাড়ি ছেঁড়া ধন  দুই মেয়ে। এই তো সেদিনও একতাল মাংস পিণ্ড ছিল। হাসপাতাল থেকে নিয়ে এল বাসায়..এতুটুকু মুরগীর ছানার মতো, নরোম, সারা গায়ে দুধের গন্ধ। কি করে ওরা দূরে সরে যাচ্ছে !

ছোটটাকে আচমকা জড়িয়ে মা হুড়মুড় করে কেঁদে ওঠে। বুক ভেঙ্গে কান্না। ছোট মেয়েটা মুখ থেকে ব্রাশ বের করে মাকে জড়িয়ে বলতে থাকে;

: মা মা কি হইসে তোমার? আর ইউ ক্রায়িং? তুমি কি স্যাড? পাপাকে ফোন করবো?

মন্ট্রিয়লে জ্যাজের মতো বিষন্ন মাখন ছুরি গলে সন্ধ্যা গাঢ় হতে থাকে। সন্ধ্যার হাতে রাত আগমনীর অমলিন বর্শা ।

ছোট মেয়েটা মাকে জড়িয়ে রাখে। ভুলে যায় যে আলো জ্বালাতে হবে..

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.