ভবিষ্যৎ ভবিতব্যের হাতে!

Leeসালেহা ইয়াসমিন লাইলী: আমার একটা কুঅভ্যাস আছে! ছেলে মেয়েদের সাথে মাস্টারি করা। একসময় শিক্ষকতা করেছিলাম, সেই অভ্যাসটা যায়নি বলে হয়তো।স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছেলেমেয়েদের দেখলে নানা প্রশ্ন করতে থাকি। এই যেমন পছন্দ অপছন্দ, পাঠ্য বইয়ের বাইরে বই পড়ার অভ্যাস আছে কিনা, খেলাধুলা, বেড়ানো, আড্ডা নানা বিষয়ে। কেউ কেউ আগ্রহ নিয়ে জবাব দেয়, কেউ পালিয়ে বাঁচে। আমি হতাশ হই জবাব পেলেও, না পেলেও। এই হতাশ হওয়াটাও আমার একটা কুঅভ্যাস বটে!

হাতে তেমন কাজ ছিল না সেদিন। কুড়িগ্রাম জেলা শহরের পাশেই নিলারাম উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশ দিয়ে হেঁটে  ফিরছিলাম। অনেকটা পথ ধরে হেঁটে হেঁটে কিছুটা ক্লান্তি বোধ করছিলাম। স্কুল মাঠের পাশের দোকানে ছাত্র-ছাত্রীদের জটলা দেখে দাঁড়ালাম। পাশাপাশি বেগম নুরুন্নাহার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও সেনের খামার উচ্চ বিদ্যালয়। ওদের স্কুলের ইউনিফর্ম দেখে মনে হচ্ছে সব স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী একসাথে।  ওরা আচার, ঝালবুট,বাদাম চিপস কিনছে। টিফিন আওয়ার চলছিল তখন। আমিও ওদের পাশে দাঁড়িয়ে বাদাম কিনলাম। তারপর ওদের পাশেই দাঁড়িয়ে খেতে খেতে গল্প জুড়ে দিলাম। কার কি নাম, কোন ক্লাসে পড়ে, কোন বিষয় বেশী ভাল লাগে …..।

এরপর সেই প্রশ্ন। পাঠ্য বইয়ের বাইরে কি কি পড়ে, কোন খেলা বেশী পছন্দ, কোথায় বেড়াতে ভাল লাগে, কার সাথে আড্ডা দিতে ভাল লাগে, আড্ডার বিষয় গুলো কি কি এমন অনেক প্রশ্ন।

প্রায় ১০/১২ জন নবম-দশম শ্রেণীর ছেলে-মেয়ে পালাতে পারল না। বাকীরা সরে গেল। অনেকটা বাধ্য হয়ে যেন উত্তর দিল প্রশ্নের। আমি যথারীতি হতাশ হলাম। এরা পাঠ্য বইয়ের বাইরে পড়া দুইটা বইয়ের নামও কেউ বলতে পারল না। রবীন্দ্রনাথ থেকে হুমায়ুন আহমেদ কারো কোন বই এরা পড়ে না। তবে হুমায়ুন আহমেদ এর নাটক ও সিনেমার কয়েকটা গল্প এরা টিভিতে দেখেছে। জীবনানন্দের একটা কবিতার চারটি লাইনও এদের মুখস্ত নাই। জাফর ইকবালের নাম শুনে দুজন ছাত্র বলল, উনি তো কবি! ছেলেরা ক্রিকেট খেলার কথা বললেও কোন মেয়েই খেলাধুলায় আগ্রহী নয়। মেয়েরা বেড়ানো বলতে শপিংয়ে যাওয়া আর টিভি দেখে সময় কাটায়। ছেলে মেয়ে কারো আড্ডায় তেমন আগ্রহ নেই। কিন্তু ছেলেমেয়েদের সবাই স্টার প্লাস ও স্টার জলসার সব অনুষ্ঠান দেখে।

বাদ দিলাম পাঠ্য পুস্তকের বাইরের কথা। এবার পাঠ্য বইয়ের কথায় এলাম। বছর শেষে সিলেবাসে কতটি অধ্যায় ছিল, কয়টি গল্প, কয়টি কবিতা, কয়টি প্রবন্ধ পড়া হয়েছে? এরা ছড়া ও কবিতার মধ্যে যেমন তফাৎ খুঁজে পায় না , তেমনি গল্প ও প্রবন্ধের মধ্যেও। সহ পাঠ্যক্রম কি জবাব দিতে পারল না কেউই! গল্পগুলো পড়েনি অনেকেই। একজনও একটা পুরো কবিতা মুখস্ত বলতে পারে না। গল্প-কবিতা-প্রবন্ধ লেখকের নাম গুলিও গুলিয়ে ফেলছে সবাই।

 কিন্তু সবাই পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত। সৃজনশীল পদ্ধতিতে বই ভাল করে না পড়লে পরীক্ষা দেবে কিভাবে? জবাবে সহজ উত্তর ‘নৈর্ব্যক্তিক আছে আর বাকিটা নোট বইয়ে যা পড়েছি লিখলেই পাশ করা যায়।’

এর মধ্যে স্কুলের টিফিন আওয়ার শেষের বেল বেজে উঠল। ছেলে-মেয়েরা দৌড়ে ক্লাসের দিকে চলে গেল। আমিও এক-পা দুই-পা করে টিচার্স কমনরুমে গিয়ে ঢুকলাম। প্রায় সবাই আমাকে চেনায় পরিচয় দেয়ার প্রয়োজন হল না। কিন্তু তারা আমার এমন আগমনে কিছুটা শঙ্কিত বোধ করে কারণ জানতে চাইলেন। আমি এমনি এসেছি জবাব পেয়ে কারো চোখে এতটুকু আস্থা দেখলাম না। আমাকে বসতে বলে কেউ কেউ ক্লাসে চলে গেলেন।

কথা বলছি মমতাজ নাসরীন নামের এক শিক্ষকের সাথে। স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা, শিক্ষক, পাশের হার, পড়ার মান এমন বিষয়গুলো নিয়ে। তিনি দুঃখ করেই বললেন, এই স্কুলে সামর্থবানের ছেলেমেয়েরা পড়ে না। অসচেতন অভিভাবকের সন্তানদের পড়াতে অনেক বেগ পেতে হয়। তাছাড়া ছেলেমেয়েরা আজকাল খুব কম পড়ে ভাল ফল করতে চায়। তারা কখনই পুরো বইটা  পড়ে না ।

তিনি আরো বলেন, জিএসসি পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন করছি। ‘কবি সাম্যের গান বলতে কি বুঝিয়েছেন’ এমন প্রশ্নের জবাবে খাতায় পরীক্ষার্থী লিখেছে, যে মহিলার স্বামী মারা গেছে তিনি যে গান করেন তাকে সাম্যের গান বলা হয়! শুনে হাসব না কাঁদব ভেবে পাচ্ছিলাম না।

এবার প্রধান শিক্ষকের রুমে প্রবেশ করতেই তিনি মিষ্টির প্যাকেট এগিয়ে দিলেন। স্কুলে মিষ্টির প্যাকেটের রহস্য জানতে চাইলে বললেন, স্কুলের নবম শ্রেণীর এক ছাত্রীর সাথে দশম শ্রেণীর এক ছাত্রের বিয়ের মিষ্টি দিয়ে গেছেন অভিভাবক। কত সচেতন ভাবে চলছে এমন ঘটনা! হতাশায় শুকিয়ে যাওয়া গলায় মিষ্টি গিলতে পারলাম না।

লেখক, সাংবাদিক

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.