ক্ষমতার লোভে নয়, আদর্শের তাগিদে কাজ করেছি: দীপুমনি

DipuMoniউইমেন চ্যাপ্টার: মন্ত্রী হবো কোনদিন ভাবিনি। বাবা রাজনীতিক ছিলেন। তার কাছ নীতি আদর্শের গুরুত্ব শিখেছি। আর সেই আদর্শের তাগিদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া দায়িত্ব পালন করেছি। ক্ষমতার লোভে কোনো কিছু করিনি।

গতকাল বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের কাছে এভাবে প্রতিক্রিয়া জানান সদ্য বিদায়ী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি।

দেশের প্রথম নারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিদায়লগ্নে বলেন, নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য এখানে আসা। ওই সময় শেষে সবাইকে চলে যেতে হয়। তবে নিঃসন্দেহে আজকের অনুভূতিটা অন্যরকম। বিগত পাঁচ বছরে অনেক সাফল্য পেয়েছি, কিছু অতৃপ্তিও আছে।

গতকাল দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনক্লজ মিলনায়তনে সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দীপু মনিকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় সংবর্ধনা জানান। ওই সময় দীপু মনিসহ উপস্থিত সকলেই আবেগ আপ্লুত হয়ে  পড়েন।

এর আগে সকাল সাড়ে ১০টায় জাতীয় পতাকাবাহী গাড়িতে চড়ে দীপু মনি মন্ত্রণালয়ে আসেন। তারও আগে সকাল সাড়ে নয়টার মধ্যে মন্ত্রণালয়ে আসেন সচিব শহীদুল হকসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। গত পাঁচ বছরের কর্মস্থলে পৌঁছানোর পর সচিবসহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন দীপু মনি।

দুপুর ১টা থেকে ৩ ঘণ্টাব্যাপী অনুষ্ঠানে তাকে বিদায় সংবর্ধনা জানায় মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। তিনি মন্ত্রণালয়ের সব কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সাংবাদিকদের ধন্যবাদ জানিয়ে সবার কাছে দোয়া ও শুভকামনা চান।

বৃহস্পতিবার রাত ১১টা ৪০ মিনিটে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তিনি সৌদি আরব সফরে গেছেন। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পাসপোর্টে নয়, সংসদ সদস্য’র পাসপোর্ট ব্যবহার করেই তিনি সৌদি আরব যাচ্ছেন বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে আজ শুক্রবার সকালেই নতুন দায়িত্ব প্রাপ্ত পররাষ্ট্র মন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী দপ্তরে আসবেন বলে জানান পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক।

প্রায় পাঁচ বছর মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনের পর বিদায়ের মূহূর্তে মন্ত্রী আবেগ আপ্লুত হলেও সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তার মুখে ছিল চির পরিচিত সেই হাসি।

দীপু মনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের যখন দায়িত্ব নেই, তখন অনেক কর্মকর্তা বলেছিলেন, বাংলাদেশের কোনো পররাষ্ট্র নীতি নেই। তবে কূটনৈতিক সম্পর্ক আছে। আমি তাদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলেছি, বিগত সময়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেসব নীতিতে যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তাই বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতি।

তিনি আরো বলেন, গত ৫ বছরে বাংলাদেশের অনেক বড় বড় অর্জন আছে। কোথাও কাজ শুরু হয়ে সাফল্যের সঙ্গে শেষ হয়েছে, আবার অনেক কাজ শুরু হয়ে শেষ হয়নি। কিছু পদক্ষেপ শুরু হয়নি তাই অতৃপ্তি রয়েছে। আজ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজের পরিধি অনেক বিস্তৃত হয়েছে। তবে জনবল অনেক কম। অপ্রতুল জনবল নিয়েও  এ সরকারের কূটনৈতিক অর্জন অনেক। মন্ত্রী থেকে শুরু করে মন্ত্রণালয়ের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গত কয়েক বছর অনেক নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন। তাদের পরিশ্রমের ফলেই বাংলাদেশের এসব অর্জন সম্ভব হয়েছে।

তিনি বলেন, সব সময় বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে সত্যিকারের বাংলাদেশ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ ক্ষুধা-দারিদ্র্যপীড়িত ও জঙ্গিবাদের দেশ হিসেব পরিচিত ছিল। কিন্তু এখন এই চিত্র বদলে গেছে। অনেক অর্জনের জন্য বাংলাদেশ বিশ্বের মানচিত্রে উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ অর্থ ও ক্ষমতার জোরে খুব শক্তিশালী নয়, কিন্তু বাংলাদেশের শক্তিশালী ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি আছে। মন্ত্রীর অভিজ্ঞতার কথা উঠতেই তিনি বলেন, মন্ত্রী হবো কোনোদিন ভাবিনি। আমার বাবা তুখোড় রাজনৈতিক বোদ্ধা ছিলেন। তার জীবনে বহু ত্যাগ রয়েছে। তার কাছ নীতি আদর্শের গুরুত্ব শিখেছি। তাই তো ক্ষমতার লোভে নয়, যা কিছু করেছি রাজনৈতিক আদর্শের তাগিদেই মানুষের জন্য কাজ করেছি।

নবগঠিত মন্ত্রণালয়ে নিজের না থাকার বিষয়ে আগে থেকেই জানতেন স্বীকার করে দীপু বলেন, মন্ত্রণালয় ছোট করার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী যাদের সঙ্গে শেয়ার করেছেন আমি সেই  সৌভাগ্যবানদের একজন। সেই সময়েই বিষয়টি জানতে পেরেছি। প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ তিনি আমাকে কিছুদিনের ছুটি দিয়েছেন। মন্ত্রী থাকাকালে নিজের নির্বাচনী এলাকায় অনেক ভালো কাজ করতে পেরেছি। এখন সেখানে দলের হয়ে নির্বাচনের কাজ করতে পারব। আগামী নির্বাচনে দেশের মানুষ নিশ্চয়ই আমাদের আবার জনগণের সেবা করার সুযোগ  দেবেন।

মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনকালে কোনো ব্যর্থতা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, অনেক বিষয়ে যেমন অর্জন আছে, তেমনি কিছু ক্ষেত্রে অতৃপ্তিও রয়েছে। তবে আপনারা যদি তিস্তা চুক্তি নিয়ে বলেন, তাহলে বলবো এটা কোন অতৃপ্তি বা ব্যর্থতা নয়। তিস্তা চুক্তি অবশ্যই সই হবে। আজ বা আগামী মাস অথবা যেকোন সময়। আর এই সরকারের তৈরি করা দৃঢ় সম্পর্কের কারণেই তা হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট সরকার ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পরদিন মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়। ওইদিন অর্থাৎ ৭ জানুয়ারিতে দেশের প্রথম নারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত করা হয় রাজনীতির ময়দানের পরীক্ষিত এবং প্রধানমন্ত্রী আস্থাভাজন মেধাবী নেত্রী ডা. দীপু মনিকে। একে তো নারী, তার ওপর অনভিজ্ঞ একজনকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ায় সেসময় বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠে। প্রথমদিকে কিছুটা ভুলভ্রান্তি থাকলেও নিজ মেধা ও শিখে নেওয়ার গুণের কারণে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দীপু মনি প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন, আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধিসহ আন্তর্জাতিক সকল ক্ষেত্রে দেশের ইমেজ পুনরুদ্ধারে তৎপর হয়ে উঠেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার কারণে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নারীদের দেখতে আমরা এখনও অভ্যস্ত হয়ে উঠিনি। এই মানসিকতার পরিবর্তন দরকার। নারী বা পুরুষ যেই হোন না কেন দায়িত্ব সকলের কাছেই সমান। দায়িত্ব পালনের চ্যালেঞ্জ সবার বেলায়ই রয়েছে। তাই এখন দিন বদলের সময়ে নারী-পুরুষ হিসেবে নয়, যোগ্যতা ও মেধা দায়িত্ব পালনের প্রধান মাপকাঠি হওয়া উচিত’।

২০০৯ সালের ৭ জানুয়ারি থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেছেন দীপু মনি।

এই পাঁচ বছরে দীপুমনির সাফল্য হিসেবে যা যা ধরা হয়: বিএনপি-জামাত জোট সরকারের পাঁচ বছর আর ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী দুই বছর এই টানা সাত বছর ধরে মুখ থুবড়ে থাকা পররাষ্ট্র নীতিকে উজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন তিনি। ওই অর্ধ যুগের বেশি সময়ে বিশ্ব দরবারে জঙ্গিবাদের চারণভূমি, ব্যাপক দুর্নীতি ও মানবাধিকার লংঘণের নানা ঘটনায় বাংলাদেশ ইমেজ সংকটে ভুগছিল। একদিকে জোট সরকারের ব্যর্থ পররাষ্ট্রনীতি শুধু ঘনিষ্ট প্রতিবেশি দেশ ভারতই না, বরং বর্হিবিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করে বাংলাদেশকে এক বন্ধুহীন রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল। উপরন্তু ২০০৭ সালের এক-এগারোর মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের টানা দুই বছর ক্ষমতায় থাকাও বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে  প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল।

প্রথম বছরে দীপু মনির নেতৃত্বে পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের চমকপ্রদ কূটনৈতিক পদক্ষেপগুলোর অন্যতম হচ্ছে সমুদ্রসীমা নির্ধারণে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য জাতিসংঘে সালিশ আদালতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত। আর এ কারণেই মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ নিয়ে বিরোধ মীমাংসা তথা সমুদ্র বিজয় মহাজোট সরকারের পাঁচ বছরের বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত।

 মিয়ানমারের সঙ্গে অমীমাংসিত সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধের ঐতিহাসিক সমাধানের পর ২০১৪ সালে একইভাবে আন্তর্জাতিক আদালতে ভারতের সঙ্গে জয়ী হওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে এগুচ্ছে বাংলাদেশ। গত পাঁচ বছরে মন্ত্রনালয়ের ছোট-বড় প্রতিটি ইস্যুর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সংশ্লিষ্ট থেকেছেন মন্ত্রী নিজে।

তিস্তা চুক্তি সই, স্থল সীমান্ত চুক্তি অনুমোদন এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও সীমান্ত হত্যা নিয়ে হতাশা থাকলেও দীপু মনির মন্ত্রীত্বকালেই প্রতিবেশি দেশ ভারতের সঙ্গে সীমানা চিহ্নিত করা, সীমান্ত ম্যাপ স্বাক্ষর, তিনবিঘা করিডোর সার্বক্ষণিক খোলা রাখা, বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অমীমাংসিত ইস্যুর সমাধান, আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, ঢাকায় বিমসটেকের সচিবালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত, বঙ্গবন্ধু দুই খুনীকে ফিরিয়ে আনতে আইনজীবি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ, বৈদেশিক কর্মসংস্থানের জন্য নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান, নতুন কূটনৈতিক মিশন খোলাসহ বিভিন্ন বিষয় কূটনৈতিক অগ্রগতি বা অর্জন মহাজোট সরকারের ঝুলিতে এসেছে।

তার সময়ে বাংলাদেশ সফর করেছেন শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসে, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী, ভারতীয় রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি, জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন, জার্মান প্রেসিডেন্ট ক্রিশ্চিয়ান ভুলফ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন, মালয়েশিয়ান প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকসহ বিভিন্ন দেশের শীর্ষ ও ক্ষমতাধর নেতৃত্ব। এসব হাই প্রোফাইল সফর দ্বিপক্ষীয় কূটনীতিক সাফল্যকেই নির্দেশ করে।

তবে বার বার বিদেশ সফরে গিয়ে কম সমালোচিতও হননি দীপু মনি।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.