‘পুরুষতান্ত্রিকতাকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে’

DSC06582উইমেন চ্যাপ্টার: সন্ত্রাস, সহিংসতা, নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা, এসব কিছুর পিছনেই কাজ করছে উদ্ধত পুরুষালি মনোভাব। কাজেই আমরা যদি বাঁচাতে চাই এই পৃথিবীকে, তাহলে এই পুরুষালি মনোভাবকেই  চ্যালেঞ্জ করতে হবে।

আজ বৃহস্পতিবার ঢাকায় ‘মাসকুলিনিটি এন্ড ভায়োলেন্স এগেইনস্ট উইমেন’ শীর্ষক এক আলোচনা অনুষ্ঠানে একথা বলেন দক্ষিণ এশিয়ার বিশিষ্ট নারীবাদী নেত্রী কমলা ভাসিন। মোহাম্মদপুরে পাক্ষিক অনন্যা পত্রিকা কার্যালয়ে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

তিনি বলেন, স্কুল, বাসা, খেলার মাঠ সব জায়গাতেই পুরুষালি মনোভাবের বীজ বোনা আছে। কাউ বয় পুরুষালিপনা, বাঙালী পুরুষালিপনা সবই বিদ্যমান এই সমাজে। এমনকি নারীদের মধ্যেও পুরুষালি মনোভাব রয়েছে। অনেকক্ষেত্রেই তা প্রকাশ পায়।

কমলা ভাসিন বলেন, সিস্টেমের বিরুদ্ধে কথা বলার কারণে তসলিমা নাসরিনকে এদেশ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। এখন এই দেশে এবং ভারতে যদি সব নারী কথা বলা শুরু করে এবং তাদের বের করে দেওয়া হয়, তাহলে তো এই পুরো অঞ্চলই নারীশূন্য হয়ে যাবে।

হলভর্তি আলোচক-শ্রোতাদের মধ্য থেকে প্রশ্ন উঠে, নারী ক্ষমতায়নের প্রকৃত সংজ্ঞা কি? এইদেশে নারীর ক্ষমতায়ন বলতে আসলে কি বোঝানো হচ্ছে? কোনো একটি সংস্থা বা কোম্পানির প্রধান হওয়াকে বা উচ্চপদে আসীন হওয়াকে?

এ প্রসঙ্গে কমলা বলেন, ‘বহুজাতিক কোম্পানি পেপসি কোলার প্রধান যদি কোন নারী হয়, তাহলে তিনি অনেক উপরে উঠে গেলেন বলে ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু আমি এতে অসুস্থ বোধ করি। কারণ এই পেপসিকোলা বিশ্বের কোটি কোটি শিশুকে অসুস্থ করে দিচ্ছে।এমন একটি কোম্পানির প্রধান হওয়াটা কাজেই কোনভাবেই আমার কাছে ক্ষমতায়ন নয়’।

কথা সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করাই আসল ক্ষমতায়ন। কোন পদ বা পদবী পাওয়া ক্ষমতায়ন নয়। তিনি একাত্তরকে টেনে এনে বলেন, হাঙর নদী গ্রেনেড ছবিতে যে অশিক্ষিত মা তার বোবা ছেলেকে পাকবাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধা ছেলেকে বাঁচাতে, তার সাথে তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী যিনি বাংলাদেশের জন্য লড়াই চালিয়ে গেছেন, তার কোন পার্থক্য নেই। দুজনই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছেন তারা।

কমলা বলেন, পুরুষালি মনোভাব কর্পোরেট বিশ্বেরও প্রতিবিম্ব। নদী, বন, সম্পদ সব শেষ হয়ে যাচ্ছে শুধুমাত্র এই মনোভাবে কারণে। হাজার বছর ধরে যে ভূমি আমাদের সহায় ছিল, চার দশকে তা চাষের অযোগ্য হয়ে গেছে। এর কারণ হিসেবে তিনি লোভ, পুঁজিবাদীকে দায়ী করেন। আর এসবই পুরুষালি আধিপত্যের বহি:প্রকাশ।

তিনি সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে সমালোচিত হেফাজতে ইসলামির আমীর আহমদ শফীর ‘তেঁতুল প্রসঙ্গ’ টেনে বলেন, এসব হুজুরদের মোকাবিলা করতে হবে। এরা ঘরে যেমন সোচ্চার, তেমনি বাইরেও। নারীদের অধ:স্তন করে রাখা এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নারীকে অস্বীকার করাই এদের লক্ষ্য। আধুনিক পুঁজিবাদী পুরুষতান্ত্রিকতা আমাদের চারপাশে। একে মোকাবিলা করা সহজ না হলেও সম্ভব।

“পর্নোগ্রাফি নিয়ে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা হচ্ছে, কসমেটিকস, চাইল্ড পর্নোগ্রাফি এসবও পুরুষতান্ত্রিকতারই ফসল। ফেয়ার এন্ড লাভলী নিয়ে ব্যাপক আন্দোলন হয়েছে, তারপরও কি কমেছে? ফেয়ার হ্যান্ডসাম বাজারে এসেছে এর পাল্টা হিসেবে। এসব দেখে-শুনে কখনও কখনও নিজেকে হোপলেস মনে হয়। দশকের পর দশক ধরে একই কথা বলে আসছি, কিন্তু সমাধান হচ্ছে না”।

আলোচনায় উঠে আসে, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৫০ ভাগ পুরুষ। আর এদেরই একটা সিংহভাগ সন্ত্রাস কাজে জড়িত, অপরাধের সাথে জড়িত, আত্মঘাতী বোমা হামলাকারীরাও পুরুষই হয় অধিকাংশ ক্ষেত্রে।সেই তুলনায় কয়জন নারী এসব অপরাধের সাথে জড়িত?

দক্ষিণ এশিয়ায় ধর্ষণের সংখ্যা আশংকাজনক হারে বাড়ছে উল্লেখ করে কমলা ভাসিন বলেন, ধর্ষণের শিকার হলে পরিবার থেকে বলা হয়, ‘ইজ্জত চলে গেছে। ইজ্জত কি আমার যৌনাঙ্গে, যে কারও স্পর্শে এটা চলে যাবে? এ থেকে মুক্ত হতে হবে। মুখ খুলতে হবে। এমন ঘটনার শিকার হলে সোজা পুলিশের কাছে যেতে হবে, মুখ খুলতে হবে, তারপর স্বাভাবিক জীবন চালিয়ে যেতে হবে। ধর্ষণের শিকার হওয়া মানে জীবন শেষ হয়ে যাওয়া নয়, কিছুতেই নিজেকে ‘ভিকটিম’ ভাবা চলবে না। বলা যেতে পারে, ‘সারভাইভার’। এসব ক্ষেত্রে পরিবারের ভিতরে যে পুরুষালি মনোভাব রয়েছে মেয়েদের প্রতি, সেটার পরিবর্তন ঘটাতে হবে।

“পুরুষরা কখনই রক্ষক নয়, কারণ রক্ষকই ভক্ষক হয়। রক্ষা করার কী দরকার? তার চেয়ে বরং পুরুষকেই দাঁড়াতে হবে সবধরনের পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে, মানবতা রক্ষায়ই তাদের এই কাজটি করতে হবে। তবেই সহিংসতা বন্ধ হবে, নতুন করে রক্ষারও দরকার হবে না”।

কমলা ভাসিন মেয়েদের উদ্দেশ্যে বলেন, “পুরুষরা যদি নিজেদের না শোধরায় তাহলে তোমরা অবিবাহিতই থেকে যেও। কারণ কোন স্বামী বা পতিকে বিয়ে করতে হবে না। স্বামী, পতি এসব শব্দ অসাংবিধানিক। আমরা চাই পার্টনারস। সাথী। স্বামী না। স্বামী মানে তো প্রভু। আমাদের প্রভুর প্রয়োজন নেই”।

“‘ডিগনিটি’, ‘সেলফ রেসপেক্ট’ না থাকলে একা থাকাই ভাল। ইউরোপের অনেক দেশেই জনসংখ্যা কমে যাচ্ছে। কারণ পুরুষের ওপর আস্থা রাখতে না পেরে মেয়েরা সন্তান জন্ম দিতে চাইছে না। পুরুষরা দায়িত্ব না নিলে আমাদের মেয়েদেরও এমন সিদ্ধান্তে আসা উচিত”।

কন্যাদান কেন হবে? কন্যা কি জিনিস যে দান করা হবে? সবাইকে মানবিক হতে হবে। নারী বা পুরুষ কেউ পুরুষালি মনোভাবাপন্ন হোক, তা চাই না।

কথা সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন প্রশ্ন করেন, মেয়েদের মধ্যে যে পুরুষালি ভাব আছে, তা কিভাবে কন্ট্রোল করবো?

উত্তরে কমলা ভাসিন বলেন, হিটলারের তো কোন টেম্পল বা মন্দির নেই। সে শক্তি খাটিয়েছে, শক্তির পূজা কেউ করে না। আসল শক্তি হচ্ছে ভালবাসার শক্তি। এক্ষেত্রে পুরুষালি মনোভাব যদি হয়ই, তা হতে হবে ‘পাওয়ার অব লাভ’। আমাদের প্রশ্ন করতে হবে সেসব ক্ষমতাসম্পন্ন নারীদের, যারা পুরুষালি শক্তি ব্যবহার করে বা যারা পেপসি বা সিগারেটের মতো কোম্পানি লিড দেয়।

নারীর চোখে বিশ্ব দেখতে হবে। নারীর চোখ দিয়ে যখন বিশ্বকে দেখা হয়, তখন সেটা রাজনৈতিক হয়ে যায়। অনেক বড় বড় নেতা আছেন যারা গণতান্ত্রিক বলে নিজেদের পরিচয় দেন, কিন্তু খবর নিয়ে জানা যাবে, বাড়িতে ততোটাই সামন্ততান্ত্রিক।

কমলা বলেন, “অনেকেই বলেই আমরা নারীবাদীরা নাকি শান্তিপূর্ণ ঘরে আগুন লাগাচ্ছি, ভেঙ্গে দিচিচ্ছ। কিন্তু শান্তিপূর্ণ পরিবার আসলে কই? বলা হয়, নারীবাদীদের ঘর টেকে না। কিন্তু হাজারও উদাহরণ আছে, যারা নির্বিঘ্নে ঘর করছে, সবাইকে নিয়ে সংসার করছে। সমতার লড়াই দুই আদর্শের মধ্যে, এটা নারী-পুরুষের বিষয় না।

“মাতৃতান্ত্রিকতা এবং পুরুষতান্ত্রিকতা একই জিনিস। দুটোই উদ্ধত”। একজন নারীবাদী যে কেবল পুরুষের বিরুদ্ধেই যাবে তা ঠিক নয়। নারীবাদী হলে তার তখন ধর্ম, শিক্ষা, সম্পর্ক ভাইবোন-স্বামী-বাবা সবকিছু নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়”। নিজের উদাহরণ টেনে কমলা বলেন, “২৪ বছর বয়স পর্যন্ত বৃহস্পতিবারে মাথা ধুতে পারতাম না ভাইয়ের কল্যাণ কামনা করে। এটাই নিয়ম ছিল বাড়ির। অথচ আমি ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া স্টুডেন্ট, মাস্টার ডিগ্রি ইকনমিকসে, কিন্তু করে গেছি নিয়ম পালন। একদিন প্রশ্ন করলাম, ভাই কি কোনদিন বোনের জন্য কোন একটি দিন এমন করে? করে না। তাহলে আমি কেন করবো? সেই থেকে শুরু”।

নারীবাদী সেই যে কিনা স্বীকার করে যে, নারীরা সমাজে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে কোন না কোন ফর্মে। যারা পিতৃতান্ত্রিকতার বিপক্ষে, তারাই ফেমিনিস্ট বা নারীবাদী। তাছাড়া যারা অহিংস তারা সাধারণত নীরব হন। কিন্তু মুখ খুলতে হবে। আমরা সংখ্যায় অনেক। একত্র হতে হবে আমাদের।

নারী নেতৃত্ব প্রসঙ্গে কমলা ভাসিন বলেন, নারীনেত্রীরা তো শুধু রাজনীতিতে। স্বামী এবং বাবার মৃত্যুর পর তারা আসছে। অপেক্ষা করতে হয়েছে তাদের মৃত্যুর জন্য। আমি তো কোন প্রকৃত নারীনেত্রী দেখি না রাজনীতিতে, এক মমতা ব্যানার্জি ছাড়া।

প্রশ্ন উঠে, হিন্দুধর্মে আছে, ছেলে না হলে মুখাগ্নি করবে কে? তাহলে তো স্বর্গে যাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে।আর ছেলে না হলে সম্পত্তির দেখভাল করবে কে? মেয়েরা তো এই কাজ পারবে না”। কমলা ভাসিন এর উত্তরে হেসে বলেন, “আমি তো বলেছি, ‘কপারটি চাই না, চাই প্রপার্টি’।

আলোচনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কথা সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন, পাক্ষিক অনন্যা’র সম্পাদক তাসমীমা হোসেন, নারী নেত্রী শিরীন হক, লেখক ঝর্না রহমান, ফওজিয়া খোন্দকার ইভা, শিপ্রা বোস প্রমুখ।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.