রোজ নামচা: সাহেরা কথা – ৪

ma-meyeলীনা হক: আজকে সাহেরা এসেছে দেরি করে – কারণ হিসেবে অনেক মন খারাপ করা, বুক ভেঙ্গে যাওয়া একটা খবর জানালো।

সাহেরা থাকে করাইল বস্তিতে, পাশেই আবার টি এন্ড টি বস্তি। গতরাতে টি এন্ড টি বস্তিতে একটি সাত বছরের মেয়ে খুন হয়েছে। পুলিশ এসেছিল রাতে, সকালে আবার এসেছে তো সাহেরা সেখানে একটু গিয়েছিল। শুনলাম, সাত বছরের বাচ্চা মেয়েটিকে তার বাবা -মা -দুজনেই গার্মেন্টসে কাজ করে- সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরে খুঁজে পাচ্ছিল না। প্রতিবেশীদের ঘরে নাই, রাস্তায় খেলছে না, দোকানে নাই,- নাই …নাই….নাই …। ঝিলের জলে ডুবলো কিনা মা বাবা কেঁদে আকুল – এই অবস্থায় কেউ আবিষ্কার করলো যে বাড়িতে তারা ভাড়া থাকে, সেই বাড়িওলার ঘরের খাটের নীচে কাঁথা চাপা দেয়া মেয়েটির মৃতদেহ। ধর্ষণের পর শিশুটিকে খুন করা হয়েছে।

জানা গেল বাড়িওয়ালার ছেলেই খুনী – সে ইতোমধ্যে পলাতক। তার এক সাগরেদকে ধরে জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ জেনেছে – পড়ন্ত দুপুরে শিশুটি খেলছিল উঠোনে, ধর্ষক তাকে ডেকে দোকান থেকে সিগারেট এনে দিতে বলে। সিগারেট এনে দেওয়ার পরে তাকে আইসক্রিম কেনার টাকা দেওয়ার জন্য ঘরে নিয়ে ধর্ষণ শেষে গলা টিপে মেরে ফেলে শিশুটিকে। সাগরেদটি আরও জানায়, সেই সময় বেলা ৩টা সাড়ে ৩টার দিকে বাড়িটি একদম খালিই ছিলো। শিশুটি খুব ফুটফুটে ছিল দেখতে। পুলিশ বাড়িওয়ালা, সাগরেদ আরো দুজনকে ধরে নিয়ে গেছে। শিশুটির মৃতদেহ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে পোস্টমর্টেম করার জন্য।

ঘটনা বর্ণনা করতে করতে সাহেরা ওড়নায় চোখ মোছে। কান্না জড়ানো স্বরে বলে’ মোর মাইয়া আফা, সাত বছর হইছে, মোর মাইয়া খান আফা খুবই সোন্দর, আমার নাহান কালা নোওয়ায়। সকালে ইস্কুলত যায় ৭ টার সময়, ফিরি আসে ১০ টায়। তারপরে একেলায় থাকে। ওমার বাপে তো ঘুরি ঘুরি বেড়ায়। কাম হতি ফিরি যাতি যাতি মোর তো বেলা পড়ি আসে – ৪ টা বাজি যায়। সগল সময় মোর কলিজাটা মাইয়াটার জন্য ধক ধক করে আফা! আইজতো কেবল মোর দেহখান ধরি কামত আইলাম- মনটা মোর ঘরত পড়ি আছে।”

আমি চায়ের কাপে চুমুক দিতে পারি না, বুকের মধ্যিখানে সাহেরার সমান সমান কষ্ট নিয়েই মনে মনে বলি , সাহেরা, যখন আমার মেয়েটাও একলা ঘরে থাকে, আমারও কলিজাটা ধক ধক করে।মুখে বলি, মেয়েকে তুমি বরং সাথে করে নিয়ে এসো সাহেরা, আমার কোনো সমস্যা নাই। উত্তরে জানায় সে,”তোমরা কইছেন সেই কথা আফা, কিন্তু অন্য বাসার বেগমসাহেব তো রাজী হইব না।”

চুপ হয়ে যাই। মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে কথাটা। আবার বলি, তুমি নাহয় পুরো সময় মেয়েকে আমার বাসায়ই রাখলে, কাজ শেষ হলে এখান থেকে নিয়ে যেও- আমার মেয়েটারও একা থাকা ঘুচলো। সাহেরা চিন্তিত ‘ কিন্তু আফা, মাইয়ার ইস্কুল কি হইবে, পড়া তো করা নাগবে। মাইয়াক মুই কছু- মাগো তোমরা ঘরের বাহির না হন, কাইও ডাকিলে না যান, কিছু দিলে না খান!”

একুশ শতকে কেন এমন বৈরী অবস্থা তৈরি হবে আমাদের মেয়েদের জন্য! কেন সাহেরার সাত বছরের মেয়েকে ঘর বন্দী হয়ে থাকতে হবে পুরুষ বেশী হায়েনার কবল থেকে নিরাপদ থাকার জন্য? এ কোন ধরনের আদিমতায় বাস করছি আমরা! ভালো লাগে না …কিচ্ছু ভালো লাগে না…..

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.