আমরা কেন ভোট দেব?

Voteঅন্যমাধ্যম থেকে নেয়া: ক্ষমতায় থাকা, আর ক্ষমতায় যাওয়ার নীতিহীন রাজনীতির খেলায় ঝলসে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের জীবন। রাজপথে জ্বলছে আগুনের লেলিহান শিখা। আতঙ্কিত পথচারীরা। তার পরও জীবন ও জীবিকার তাগিদে শত বাধা অতিক্রম করেও মানুষ ছুটে চলে কর্মক্ষেত্রে। কখন কোথা থেকে ছুটে আসবে ককটেল, পেট্রলবোমা, তা কেউ জানে না। মনের ভেতর আতঙ্ক, মৃত্যুভয় নিয়ে হরতাল নামক দানবীয় পরিস্থিতির মাঝেও মানুষকে রাস্তায় বের হতে হয়।

দেশের দুটি জোটের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা হরতালের পক্ষে-বিপক্ষে নিজ নিজ অবস্থান থেকে তর্জন-গর্জন করেন। দুই দলই জনগণের উদ্দেশে অন্য দলের নীতিহীনতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ২০০৬ সালে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিরোধী দলে থেকে যে ভাষায় কথা বলেছে, ২০১৩ সালে বর্তমান বিরোধী দল একই ভাষায় কথা বলছে। তখনো ক্ষমতাসীন দলের কাছে সংবিধান মানুষের চেয়ে বড় ছিল, আজও ক্ষমতাসীনদের কাছে মানুষের চেয়ে সংবিধানই বড়।

গণতন্ত্র, সংবিধান—এ ধরনের কঠিন কঠিন শব্দ, শব্দের অর্থের সঙ্গে পরিচিত ছিল না কিশোর মনির। তার পরও আগুনে ঝলসে গিয়ে অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে তাকে। মনির, কাশেম, মন্টু পাল মরে বেঁচে গেছে কিন্তু এখনো যারা আগুনে ঝলসানো শরীর নিয়ে মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে, তাদের কী হবে? কে দেবে তাদের চিকিৎসা খচর? কে দেখবে তাদের সংসার?

হরতালে যদি মানুষ না মারা যায়, সহিংসতা না হয় তাহলে ক্ষমতাসীনেরা বলেন বিরোধী দলের আন্দোলনের মুরোদ নেই। অন্যদিকে হরতালে যত লাশ তত হরতালকারীদের লাভ। আন্দোলন কতই চাঙা।
একদল যা বলছে, অন্যদল তাকে মিথ্যে বলছে। দুই দলের মিথ্যে তথ্য, মিথ্যে কথার মাঝে সত্য খুঁজে পাওয়া কঠিন।
যারা তাদের নিজ নিজ অবস্থানে অটল থেকে দেশটাকে অস্থির করে তুলেছে, মানুষের অধিকারের কথা বলে মানুষের জীবনকে বিষিয়ে তুলেছে, তাদের জন্য আছে সুরক্ষিত বাড়ি, নিরাপদ রাস্তা, সুচিকিৎসা, মজাদার খাবার, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল। আর আমাদের জন্য আছে মৃত্যুর ফাঁদ যানবাহন, কাজের অভাবে অনাহারে থাকা, অর্থের অভাবে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ এবং সময়মতো পরীক্ষা দিতে না পারায় খারাপ ফলাফলের দায়ভার।
অন্ধ এবং বধির রাজনীতি মানুষের কান্না শোনে না, মৃত্যুর মিছিল দেখে না, দানবীয় কর্মকাণ্ড অবলোকন করে না। ক্ষমতায় থাকার দম্ভ আর ক্ষমতায় যাওয়ার লালসার আগুনে ঝলসে যাচ্ছে আমাদের বেঁচে থাকার স্বপ্ন।
লাখ লাখ শিক্ষার্থীর পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। শিশুরা স্কুলে যেতে পারছে না। প্রতিদিনই আহত এবং নিহত মানুষে সংখ্যা বাড়ছে। কর্মহীন শ্রমিক ঘরে শুয়ে-বসে দিন কাটাচ্ছেন। অসুস্থ রোগী ঘরে ছটফট করছে। হরতালে চিকিৎসকের কাছে যেতে পারছে না। এমনই এক গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জাঁতাকলে পিষ্ট আমরা দুই পক্ষকে কেন ভোট দেব? গত ৪২ বছরে আমরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করে একদল থেকে অন্যদলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছি। রক্তস্নাত পথে, লাশের মিছিলের মাঝে প্রতিবারই ক্ষমতাবানেরা ক্ষমতার মসনদে অধিষ্ঠিত হয়ে তৃপ্তির হাসি হেসেছে। বিরোধী দল কিছুদিন যেতে না যেতেই খুঁজে পেয়েছে ক্ষমতাসীনদের ব্যর্থতা, শুরু করেছে জনগণের নামে আন্দোলন।
জনগণের খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার যে দেশে ভূলুণ্ঠিত হয়, সে দেশে জনগণের অধিকার রক্ষার নামে যে নির্লজ্জ আন্দোলন, সংবিধানের নামে যে ঔদ্ধত্য, তা কেন জনগণকে ভোট দিতে নিরুৎসাহিত করবে না?
সংবিধান রক্ষার জন্য ক্ষমতাসীনদের যে স্বেচ্ছাচারিতা, তা আমাদের সন্তানদের শিক্ষাজীবন ধ্বংস করে দিচ্ছে। জনগণের ভোটাধিকারের নামে বিরোধীদের যে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড, তা আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে দিচ্ছে।
আমাদের ভোট রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতায় বসাবে। আমাদের কী হবে? প্রতি পাঁচ বছর পর পর একই সংবিধান, একই গণতন্ত্র, একই আন্দোলন। কেবল বেড়ে যায় মৃত মানুষের সংখ্যা, আহত মানুষের সংখ্যা, হিংস্রতার ছোবল।

১৫ লাখ পরীক্ষার্থীর অভিভাবকেরা এ দেশের বড় দুটি দলকে কেন ভোট দেবেন? ক্ষমতার বদল আমাদের জন্য কোন শুভ বার্তা বয়ে আনবে?

আমরা কি রাজনৈতিক হিংস্রতার ছোবল থেকে মুক্তি পাব? হরতাল নামক দানবীয় অস্ত্রটি কি আন্দোলন থেকে বাদ যাবে? আমার সন্তানের স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা কি আমি পাব? আমার কন্যা কি নিরাপদে রাস্তায়-ঘরে বিচরণ করতে পারবে? বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা কি মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারবেন? যদি এসবের নিশ্চয়তা না দিতে পারে কেউ? তাহলে কেন আমরা ভোট দেব?

শাকিলা নাছরিন: একজন ভুক্তভোগী নাগরিক।

(লেখাটি প্রথম আলো থেকে নেয়া)

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.