রাজনীতি যখন ‘পলিটিক্স’

Hasina-Khaledaসুমন্দভাষিণী: বহুল আলোচিত অর্থপাচার মামলায় বেকসুর খালাস পেয়েছেন আদালতের ভাষায় ‘পলাতক আসামী’ বিএনপি চেয়ারপারসন তনয় তারেক রহমান। তিনি আবার দলের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্টও। তবে একই মামলায় তারেকেরই একসময়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের জেল হয়েছে সাত বছরের। সাথে ৪০ কোটি টাকা জরিমানা। তারেকের কিছুই হয়নি। এর আগে মানি লন্ডারিংয়ের পৃথক মামলায় তারেকের ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোর ছয় বছর সাজা হয়েছিল।

রায়ের পর আবার স্তম্ভিত জাতি। কারও মুখ দিয়ে কথা সরছে না। মামলার অন্যতম আসামী তারেক রহমানকে এই মামলায় কারাবাস করতে হয়েছিল, পরে চিকিৎসার কথা বলে লন্ডন চলে যান। আর আসেননি। তার বিরুদ্ধে তখন গ্রেপ্তারি পরোয়ানা পর্যন্ত জারি করা হয়। আর মামুনের জেল খাটার বয়স প্রায় সাত বছর হয়েই গেছে। তিনি চিকিত্সা করাতে বিদেশ যেতে পারেননি, তাই তার ঠাঁই হয়েছে শ্রীঘরেই। আজ রায়ের পর আবার তাকে সেখানেই পাঠানো হলো।

ঠিক আজকেই একটা কবিতার লাইন মনে পড়ে গেল-হিন্দু পুরানে রামের সৎ মা বর চেয়েছিলেন, সেটি ছিল এরকম-

‘এক বরে ভরতেরে দেহ সিংহাসন

আর বরে শ্রী রামেরে পাঠাও কানন

চতুর্দশ বৎসর থাকুক রাম বনে

ততদিন ভরত বসুক সিংহাসনে’।। (অবিকল মনে নেই, কিছুটা ওলট-পালট হয়ে থাকতে পারে, তবে সার কথা এটাই)। এর মানে সহজ, নিজের ছেলেকে সিংহাসনে বসানোর অনুরোধ করেছিলেন, আর সৎ ছেলেকে নির্বাসনে পাঠাতে। সাধারণ জনগণও আজকের রায়ে কেন জানি একটা আঁতাতের গন্ধ পাচ্ছে। বলাবলি করছে, আওয়ামী লীগ-বিএনপি একটা সমঝোতায় এসে গেছে। সেজন্যই তারেককে খালাস দেওয়া হলো। এখন উনি সদর্পে দেশে ফিরে আসবেন, দলের দায়িত্ব নেবেন। মানুষ ছুটবে নতুন নেতৃত্বের পিছনে। আর এদিকে আরেকজন খোকাবাবু তো আছেনই দেশে। অর্থাৎ আমাদের ভবিষ্যত রাজনীতির নেতৃত্ব মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া গেল।

এরই মধ্যে আরেক দল আবার স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলছে। তাদের মত হলো, দেশ আপাতত জ্বালাও-পোড়াও থেকে মুক্তি পেল হয়তো বা। কিছু মনির, মন্টু, নাসিমার প্রাণ বাঁচবে, নিজের জান নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে আবার ঘরে ফিরে আসবে, এর চেয়ে শান্তি আর কী হতে পারে!

এখানে আরেকটা কথা আছে। মামুনের সাত বছর জেল হয়েছে, এরই মধ্যে তার কারাবাসের বয়সও সাত বছর হয়ে গেছে। কাজেই নিন্দুকেরা যে বলাবলি করছে, ‘শিগগিরই বেরিয়ে আসবেন মামুন, সেই পথটাও রায়ই নির্ধারণ করে দিয়েছে’, সেটা্ কতটা সত্য?

হাসি-তামাশাও কম হচ্ছে না। ‘নিরপেক্ষতা’ শব্দটি আবার নতুন প্রাণ ফিরে পেল আদালতের এই রায়ে। গতকালও বিএনপি বলছিল যে, তারেককে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে সরকার। আর আজই রায় ঘোষণার পরপর তারা সংবাদ সম্মেলন করে বলে ফেলেছেন, তারেক রহমান নির্দোষ বলেই আদালতের রায়েও তার প্রতিফলন ঘটেছে। তবে কথা উঠছে, এতোদিন যারা ‘চোরের মার বড় গলা বলে’ মন্তব্য করে আসছিলেন, তাদের কী হবে! চোরের চুরি তো আর প্রমাণ হলো না। তাহলে কিসের ভিত্তিতে তারা ‘চোর’ সাব্যস্ত করেছিলেন একজনকে, দেশান্তর পর্যন্ত হতে হয়েছে চুরির দায়ে, কেন? কথা হচ্ছে, আদালত আর রাজনীতি কি সমার্থক শব্দ হতে চলেছে এইদেশে?

রায় ঘোষণার পরপরই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে নিন্দা জানানোর হিড়িক পড়ে গেছে। একজন লিখেছেন,  ‘মাত্র ৫ হাজার টাকা ঋণ শোধ করতে পারেনি বলে, আমাদের পুলিশ কোমরে দড়ি বেঁধে ধরে নিয়ে গেছে কৃষক মনোয়ারকে ! জয়পুরহাটের কালাই গ্রামে সবার ঋণের পরিমাণ ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার; এই টাকা পরিশোধে তাদেরকে বেছে নিতে হল কিডনি বিক্রির মত চরম পথ !! বরিশালের আগৈলঝাড়ায় এনজিও’র ঋণের টাকা পরিশোধ করতে না পেরে দুই সন্তানের জনক আত্মহত্যায় বাধ্য হল কয়েকদিন আগে। আর … আর ২০ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করার কারণে রাজপুত্র তারেক কিন্তু বেকসুর খালাস !!! দারুণ কমেডি রাষ্ট্র এই ‘ছোনার বাংলাদেশ’ !

আরেকজন লিখলেন, ‘রাজনীতির খেলা ভালোই জমে উঠেছে, আমরা হলাম গিয়ে একটা গাধা জাতি। তলে তলে সব মাসতুতো ভাই। ৮২ সালে এরশাদ চাচা ক্ষমতায় এসেই ‘আটকুঁড়ে’ বাদশার নাম ঘুচাতে কয়েকদিনের মধ্যেই পয়দা করে ফেলেছিলেন আস্ত একটা মানব সন্তান। আমরা গর্দভকুল চক্ষুকর্ণের বিবাদ ভঞ্জন করে মেনে নিয়েছি সেইসব কর্ম।

তারপরে অনেক ইতিহাস, অনেক পানি যমুনা-মেঘনায় গড়িয়েছে। আমরা সেইসবেরও সাক্ষী। নতুন কবিতা লেখা হলো যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে। কত টালবাহানা, কত গড়িমসি, কতকিছু। আইনজীবীদের মুখেই শুনলাম, টাকার ছড়াছড়ি হচ্ছে বিচারের রায় নিয়ে। একাত্তর একাত্তর বলে আমরা গুটিকয় মানুষ যতোই চিৎকার করি না কেন, দেশ রক্ষার লাগাম যাদের হাতে, তাদের বুকে দেশ বা পতাকা বলে কিছু নেই। আজ আরেক নাটক মঞ্চস্থ হলো। মামুনের জন্য আজ প্রথমবার কিছুটা ফিল করলাম। বেটা আরেক রাম বলদ, কার সাথে গিয়ে বন্ধুত্ব করলো, আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। বলির পাঁঠা আর কাকে বলে! তবে ভবিষ্যত নেতাদের চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। এই দল-সেই দল, রাজা আমাদেরই ভাই বেরাদর’!

একজন অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট লিখেছেন, ‘সারা দেশের মানুষ জানে ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত তারেক তার সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে কি ব্যাপক লুটপাট দূর্নীতি অনিয়ম করেছিল। হয়তো টাকার অংকে সে দূর্নীতি পদ্মাসেতু বা হলমার্ক বা শেয়ারবাজার কেলেংকারীর চেয়ে নগন্য। তাই বলে বিচারক তো আর তাকে খালাস দিতে পারেন না। বড় চোরকে রক্ষা করতে হবে বলে তো ছোট চোরকে খালাস দিতে পারেনা বিচারক। চোর তো চোরই। ‘তারেক চোর না’ আদালতের এই ঘোষণা একটি রাজনৈতিক ঘোষণা। বিএনপিকে শান্ত রাখতেই এই রায়। এদেশে অপরাধীর বিচার হয় না, রায় হয় রাজনীতির প্রভাবে। এদেশে নিরাপরাধ মানুষ অন্যায়ভাবে সাজা পায়।
মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয় নাই’।

নাটকের আসলেই শেষ নেই, তাই কথারও শেষ নেই। আজ যখন সবার চোখ আদালতের রায়ের দিকে, ঠিক তখনই ‘দলছুট’ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদ চলে গেলেন চট্টগ্রামে হেফাজতে ইসলাম এর আমীর আহমদ শফীর ‘দোয়া’ চাইতে। যে শফী তার ‘তেঁতুল তত্ত্বের’ জন্য কিছুদিন আগেই ব্যাপকভাবে আলোচিত-সমালোচিত হয়েছেন, সংসদে যাকে নিয়ে তুলোধুনো করা হয়েছে, সেই শফীর কাছেই তিনি ‘দোয়া’ চেয়ে নির্বাচন করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছেন। মহাজোটে থাকবেন না, সেকথাও উচ্চারণ করেছেন। সেইসাথে হেফাজতে ইসলাম এর কুখ্যাত ১৩ দফা দাবি মেনে নেওয়ারও আশ্বাস দিয়ে এসেছেন যদি ক্ষমতায় যান।

শফী নাকি একথাও বলেছেন, এই দেশে যেই ক্ষমতায় যাক বা থাকুক না কেন, ১৩ দফা তাকে মানতেই হবে।

খুবই ভাল কথা। শেষপর্যন্ত এই ১৩ দফার নিচেই আসতে চাইছেন এরশাদ।মনে পড়ে গেল, হেফাজতিরা ঢাকায় যখন সমাবেশ করেছিল, তখন এই এরশাদই তাদের খাবার জুটিয়েছিলেন। কাজেই বর্তমানে হেফাজতিদের আশ্রয় চাওয়াটা তার ন্যায্য পাওনাই বলা চলে।

খেলার পর খেলা। সকালে এক খেলা, বিকেলে আরেক। দেখা যাক, শেষপর্যন্ত কোথাকার জল কোথায় গড়ায়! মাত্র কিছুদিন অপেক্ষা। আমরা তো দর্শক, আমজনতা, গ্যালারিতে বসলাম।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.