আমার শচীন…

0

sachinনাহিদ দীপা: শচীনকে নিয়ে লিখব। কিন্তু কি লিখব এই মানুষটাকে নিয়ে! আগে যা বলা হয়েছে, সে তো হয়েই গেছে। কিন্তু ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষের দুই টেস্টের পর, আর নামবেন না ২২ গজে ব্যাট হাতে, এই ঘোষণা দেয়ার পর থেকে ভারত তো বটেই পুরা দুনিয়ার ঝানু সাংবাদিকরা খুঁজে বের করতে তন্ন তন্ন করেছেন ওয়েবের সব সাইট, তাঁকে নিয়ে লেখা বই, তাঁর সাক্ষাতকার, আর নিজেদের ঝাঁপি। কি বলা যায়, যা নতুন হবে?

বলা যায়। শচীন কে নিয়ে আমার কথা। যা বলা হয়নি। গত কদিনে আমাকে অনেকেই বলেছে, আমি যে এত শচীন ভক্ত, তা আগে কেউ বুঝতে পারেনি। তাদেরকে আমি বলেছি, প্রেমের কথা কি মুখ ফুটে বলা যায়? কথাটা অপ্রাসঙ্গিক শোনালেও, সত্যি। তখন আমি সেভেন এ পড়ি। আমার পড়ার বইয়ের মাঝে একটা ছবি বের করে আমার মা’র কাছে নিয়ে গেলেন দাদী। বললেন, তোমার মেয়ে কোন ছেলের ছবি বইয়ের মধ্যে রেখেছে, দেখো। মা হাসলেন। আম্মু আবার জিজ্ঞেস করলেন আমার দাদীকে, ছেলে পছন্দ হয়েছে আপনার? দাদী বললেন, দেখতে তো ভালই। তবে এক্ষুণি বিয়ে দিওনা। মেট্রিকটা পাশ করুক।

জানেন সেটা কার ছবি? শচীনের। তখনও সে কিংবদন্তী হয়নি। দুই টাকা দিয়ে শচীনের ওই ভিউ কার্ড কিনেছিলাম। দাদি (আমরা ডাকতাম ববু) বেঁচে নেই। থাকলে দেখে যেতে পারতেন, কি কাণ্ডই না করেছে সেদিনের সেই ছেলেটা। ২৪২ টা সেঞ্চুরি (আন্তর্জাতিক ১০০+জাতীয় ১৪২), হাফসেঞ্চুরি ৪০৮ (আন্তর্জাতিক ১৬৩+জাতীয় ২৪৫)। আন্তর্জাতিক আর জাতীয় খেলা মিলে রান করেছেন ৮৪,৫৪৯…!!! ছোট বেলায় পেইসার হতে চাইলেও, উচ্চতা কম হওয়ায়, ডেনিস লিলি (অস্ট্রেলিয়ান ফাস্ট বোলার) তাঁকে বললেন ব্যাটিংয়ে মন দিতে। এমনই মন দিলেন, যে পুরো  ভারতে ক্রিকেটের আরেক নাম হয়ে গেলেন শচীন, হয়ে উঠলেন ক্রিকেটের ঈশ্বর।

শুধু ব্যাটসম্যান বললে, শচীনের মুন্সিয়ানাকে খাটো করা হবে। পেইসার হতে পারেননি ঠিকই, কিন্তু স্পিনের প্যাঁচে ফেলে কাবু করেছেন অনেক ক্ষুরধার ব্যাটসম্যানকে। ওয়ানডেতে সবচেয়ে বেশি রানতো করেছেনই, সঙ্গে নিয়েছেন ১৫৪ উইকেট। সেও শচীনের রেকর্ডের মুকুটে আরেকটি মুক্তা। আরেকজন অলরাউন্ডার অবশ্য উইকেট শিকারে শচীনকে ছাড়িয়ে গেছেন অনেকটাই। তিনি শ্রীলংকার সনাৎ জয়াসুরিয়া। ওয়ানডেতে তিনি উইকেট নিয়েছেন ৩২৩। তবে রান তোলায় শচীনের চেয়ে ৫ হাজার রানে পিছিয়ে লংকান সিংহ।

ক্রিকেটের ব্যাট-প্যাড তুলে রাখার দিনে, শচীন মাইক্রোফোন হাতে যত কথা বললেন, এর আগে কি বলেছিলেন কখনো? সবার সামনে? ওয়াংখেড়ের মাটি ছুঁয়ে প্রণাম কিংবা, চোখের কোণটা ভিজে ওঠায়, শচীন কাঁদিয়েছেন পুরো বিশ্বকে। তার ব্যাটিং, রান করার আকুলতা, ২৪ টা বছর ভারতীয় দলের একজন হয়ে থাকায় যারা বিরক্তি জানিয়েছেন, তারাও কি একবারও দীর্ঘশ্বাস না ফেলে থাকতে পেরেছেন। এই ২৪ বছরে পুরো ভারতে যত ক্রিকেটার জন্মেছেন, কিংবা রঞ্জি ট্রফি খেলে মেন ইন ব্লুজদের কাতারে আসতে চেয়েছেন, সবাই জেনেছে, তাদের প্রতিযোগিতা ভারতীয় দলের বাকি ১০ জনকে সরানোর। শচীনকে সরিয়ে কেউ দলে ঢোকার কথা ভাবতে পেরেছে কোনদিন? শচীনকে এক শিশু একবার জিজ্ঞেস করেছিল, ২০ বছর আগের শচীন আর এখনকার শচীনের কি পার্থক্য? তিনি জানালেন, একটাই পার্থক্য। ২০ বছরের শচীনের জীবনের ১০ বছর জুড়ে ছিল ক্রিকেট, ১০ বছর তাঁর নিজের। আর ২০ বছর পরে, ৩০ বছরই ক্রিকেটের উপর নিমগ্ন, নিজের সময়ের সঙ্গে, ঐ ১০ বছরের সঙ্গে আর কিছুই যোগ হয়নি। আর কি বলার দরকার আছে?

ক্রিকেটের ইতিহাসে যতটা জায়গা জুড়ে আছেন শচীন, শচীনের জীবনে ক্রিকেটের জায়গা তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি।

লেখক: সাংবাদিক

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.