গোয়ালন্দ

Simple life-Piashগোয়ালন্দ
অপরাহ্ণ সুসমিতো

 

ওরে আমার মন গোয়ালা দিন দুবেলা

দুধ যোগাবি
দুধ রেখো না আলগা করে হিংসা বিড়াল

সদাই ঘোরে ..

টিনের খুপড়ি থেকে দরাজ কন্ঠ ভেসে আসে । কে গান গায়,কে ? আমি জানালার শিক ধরে দাঁড়াই । মাথা উঁচু করে দেখি সামনের দোকানে কাজ করে সদরুদ্দিন ভাই,শিরিষ গাছের নিচে পা ছড়িয়ে চোখ বন্ধ করে গান করছে । সদরুদ্দিন ভাইকে নিয়ে সবাই হাসাহাসি করে । কারন পুরুষ মানুষ, রাগ নাই চ্যাতব্যাত নাই । খালি হাসে । একটু সুযোগ পেলেই গান ধরে । হনুফা খালা তার পান খাওয়া কুচকুচ দাঁত বের করে বলে;

: সদরুদ্দিনের লিঙ্গ নাই ।

শুনে সব মেয়েদের কী হাসি । আমার বুকটা ধ্বক করে ওঠে ।

শেষ রাতে সবাই ঘুমায়,দূরে নিশিপক্ষী ডাকে । আমার ইচ্ছা করে পারিন্দা হয়ে সদরুদ্দিন ভাইকে নিয়ে কামরুখকামাক্ষা দেশে চলে যাই । ও গান করবে,আমি ঘুঙুর পরে নাচব ।

ও ও ও

বাচপানই গি তানগেলি

ছোটি ছোটি মিঠে চোরি ঘাটেসে বান্ধে

আমার চোখ ভিজে যায় । সকাল এসে জানালায় কড়া নাড়ে চড়ুই এর কোমল ঠোঁটে । পাখির ঠোঁট আমার খুব প্রিয়,পাখির চোখও । দেখে মনে হয় কী সুন্দর কাজল দিয়েছে চোখে ।
আমি কান্না মুছে চোখে কাজল দেই পাখির আদলে ।

গোয়ালন্দ ফেরিঘাটের কাছেই আমাদের পাড়া । লোকজন লুঙ্গিটা তেরসা করে ধরে,সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলে মাগীপাড়া ।

সন্ধ্যা নামতে লোকজন ভুরভুর মদ খেয়ে জর্দা পান খেতে খেতে আসে..আমরা খুপড়ির সামনে এসে দাঁড়াই । আমার চোখে পাখির কোমল কাজল,ঠোঁটে নি:স্বার্থ ভালোবাসা লিপস্টিক ।
ভদ্দরনোকরা ইঁদুরের মতো চোখ করে আমাদের দেখে,কখনো মুখের দিকে তাকায় না,বুকের দিকে তাকায়,গতরের দিকে তাকিয়ে মাপজোক করে । কেউ কেউ ওখানে ফস করে হাত দেয় ।

আমার সাথের বিলকিস ফিক করে হেসে দেয় । আজ বিলকিস খুব হাসছে ।

সদরুদ্দিন ভাই পরশু বিকেলে আমাকে যা বলেছে শুনে তো আমার হার্টফেল হবার দশা । হনুফা খালা নাকি বিলকিসকে গরু মোটা তাজা করার ইনজেকশন দিয়েছে । বিলকিসটা খুব রোগা দুর্বল,কাস্টমাররা ওকে নেয় না ।

আমার বিলকিসকে দেখে ভয় লাগে । মেয়েটা এত হাসছে কেন ?

এক হুজুর আমার সামনে এসে দাঁড়ায় ।
: এই মাগী বসবি ?
: মাগী ডাকেন কেন ? আমার নাম রুমঝুম ।
: চুপ । আমরা ২ জন । কতো নিবি ?

গোয়ালন্দ ঘাটে তিরবির করে ইলিশের চালান চলে যায় দূরদূরান্তের উদ্দেশ্যে । রাত নামে বাবু বাবু করে । ধুলো উড়িয়ে ট্রাক গুলো থামে ফেরীর জন্য । আমাদের কাস্টমার বাড়ে । সদরুদ্দিন ভাই আমার হাতে কতোগুলো কনডম গুঁজে দেয় । হাসে শুধু । কী মায়া ..

হুজুর ও তার সঙ্গী আমাকে নিয়ে উৎসবে নামে । দাঁত কামড়ে থাকি ..চোখে ভাসতে থাকে…টের পাই আমি পারিন্দা হয়ে উড়তে থাকি,চোখের কাজল ভিজে যাচ্ছে ..সদরুদ্দিন ভাই আমার হাত ধরে বলে ;

: শুধু আজকের রাত । কাল আমরা নতুন দেশে যাব ।

আচানক গগন বিদারী চিৎকার ভেসে আসে নিচ তলা থেকে । পুরো পাড়া হৈচৈ । শোরগোল । মেয়েরা ভয়ে দৌঁড়াচ্ছে ..

সদরুদ্দিন ভাইয়ের হাসি হাসি মুখ কিন্তু সমস্ত শরীরে লাল রক্তের পিচকারী । বাম হাতে কি ছুরি ? উপর থেকে আমি বুঝতে পারি না স্পষ্ট ..হনুফা খালার গলাটা দুই ভাগ হয়ে পড়ে আছে সদরুদ্দিন ভাইয়ের পাশে..

আহ রক্তে ভেসে যাচ্ছে গোয়ালন্দ ..রাতের ইলিশ রাতেই চলে যাচ্ছে দূরের বন্দরে । চাঁদের আলোতে ইলিশগুলো কী সুন্দর চকচক করছে গো……।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.