এন্ড্রমিডা ছোঁয়ার গল্প

Leena Haq
লীনা হক

লীনা হক: কেক কেটে ছোটবেলায় আমার জন্মদিন পালন হয়েছে বলে মনে করতে পারি না। যতদূর পর্যন্ত স্মৃতি যায়, মা আগের রাতে পায়েস রেঁধে রাখতেন, সকালে সেটা লুচি দিয়ে খাওয়া হতো। আর দুপুরে পোলাও রাঁধতেন সাথে মিষ্টি কোর্মা। খুব কাছের দু’একজন বন্ধু আসতো | এমনকি কোনো নুতন জামাও হতো না।

এই ধরনের জন্মদিন পর্বও মনে পরে খুব বেশী বার হয় নাই, কারণ পিঠাপিঠি ভাইবোন হওয়ার কারণে আমার অন্য ভাইবোনের জন্মদিনও আসতো, আর এইভাবেই পালিত হতো । স্কুলে ক্লাস থ্রি-ফোরে উঠার পরে সবারই জন্মদিন পালন বন্ধ হয়ে গেছিল। কিন্তু কোনোরকম কোনো খেদ ছিল না, কারণ আমাদের সময়ে মধ্যবিত্ত পরিবারে এমনই হয়ে থাকতো। তবে ছোটবেলায় জন্মদিনের বিশেষ আকর্ষণ ছিল – এই দিনটিতে বাবা-মা কেউ বকতেন না।

স্কুলের উপরের ক্লাসে উঠার পরে জন্মদিনের দিন টিফিন পিরিয়ডে মালাইকারি, মন্ডা বা ক্রিম রোল কাছের বন্ধুদের নিয়ে খাওয়া হতো। হয়তো সবাই মিলে একটা হাতে আঁকা কার্ড আর বই – তখন আমরা খুব মাসুদ রানা পড়তাম আর পড়তাম নীহাররঞ্জন বা নিমাই ভট্টাচার্যের উপন্যাস । স্কুল জীবনের বন্ধুদের দেওয়া জন্মদিনের দুটো উপহার, একটা বই, মলাট ছিঁড়ে গেছে, পাতা বিবর্ণ, নিমাই ভট্টাচার্যের ‘মেম সাহেব ‘- আমার কাছে এখনো আছে। যেখানে আমার বন্ধু , জ্ঞান হওয়া অবধি যারা আমার বন্ধু , জলি, বাচ্চু , রায়হানা , জোসেফিন, শবনম আর বেবি – লিখেছে ‘ প্রিয় লীনাকে, জন্মদিনের শুভেচ্ছা ও ভালবাসা সহ ; তারপরে তারিখ , ১৩.১১.১৯৭৯, ময়মনসিংহ আর আছে একটা ভিউ কার্ড – পিছনে লেখা , লীনা , জন্মদিনে অজস্র শুভেচ্ছা । – ফয়সাল , ১৩.১১.৭৯, ময়মনসিংহ । কার্ডটা বইয়ের ভিতরেই ছিল বলে রয়ে গেছে।

ফয়সাল ভাই -আমাদের বন্ধু জোসেফিনের বড় ভাই, আমাদের থেকে মাত্রই দু বছরের সিনিয়র, আমাদের সকল বাঁদরামির সাথী। ফয়সাল ভাই গত বছর আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন- হয়ত সব আনন্দের দেশে।

কলেজে উঠার পরে মনে পড়ে দল বেঁধে যেতাম গাঙ্গিনার পাড় ‘লিটন কনফেকশনারী ‘তে – ততদিনে পিস কেক আমাদের ছোট শহরেও চালু হয়েছে । কেক আর ডালমুট কিনে চলে যেতাম ব্রহ্মপুত্রের তীরে। নৌকো করে চরে গিয়ে নামা আর কতধরনের অভিযান। একই কাজ আমরা প্রত্যেক বন্ধুর জন্মদিনে করতাম।

জীবনে প্রথম কেক কেটে জন্মদিন হয়েছিল যখন মধ্য তিরিশে, আমি পড়তে গিয়েছিলাম নেদারল্যান্ডস। পরিবার থেকে অনেক হাজার মাইল দূরে সেই জন্মদিন পালন করেছিল আমার সহপাঠীরা আমাকে চমকে দিয়ে। আমস্টার্ডাম শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে, সমুদ্রের তীর ঘেঁষা গ্রাম মতন ক্যাম্পাস, কাঠের ডরমিটরির দোতলায় একটা রুমে থাকি আর সময় সুযোগ হলেই দেশে রেখে যাওয়া বাচ্চাদের কথা মনে করে কাঁদি। আমি এসেছি ফল সেমিস্টারে – সেপ্টেম্বরে – নেদারল্যান্ডসে পাতা ঝরা শুরু হয়েছে ততদিনে। আর নভেম্বরে শীতের তীব্রতা শুরু হয়েছে – কনকনে হাওয়া , ঝিরঝিরে বৃষ্টি , বিকেল না হতেই সন্ধ্যে নেমে আসা সেই সাথে আমার মন খারাপ হওয়া শুরু।

এইরকম আবহাওয়ার মাঝে একদিন আমার বন্ধু এগনেস বললো আজ সন্ধ্যায় কি করছো! এগনেস উগান্ডার নাগরিক, আমার মতোনই দুই সন্তানের মা, ছেলেমেয়েদের রেখে এসেছে দেশে তার স্বামীর কাছে। আমার সহপাঠী, মেজর বিষয় তো বটেই এমনকি মাইনর বিষয়গুলিও আমাদের এক। আমার সাথে প্রথম দিন থেকেই বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছে। আমার তীব্র মন খারাপের সময়গুলোতে সে আমাকে বোনের মতন করে সঙ্গ দেয়। তার কাঁধে মাথা রেখে কেঁদে হালকা হই। মাঝে মাঝে সেও কান্নায় শরিক হয়। আমাদের কাছের বন্ধু ভিয়েতনামের মেয়ে হা আর তুরস্কের ছেলে আবদেল এই কান্নাকাটির নাম দিয়েছে – বাংলাদেশ -উগান্ডা যৌথ প্রযোজনা !

তো বললাম, কিছু না, ক্লাস শেষে আজ লাইব্রেরি যাবো ভাবছি। এগনেস বলল, লাইব্রেরি বাদ দিয়ে চলো, বরং হা এর রুমে যাই ভাত খেতে। সাতটার একটু আগে গেলেই হবে। হা ‘ এর কাছে সবসময় ভাত আর কৌটো বোঝাই চিংড়ি মাছের শুঁটকি থাকে। আমরা প্রায়ই তা খেতে যাই। ইচ্ছে না থাকলেও গেলাম এগনেসের সাথে এই কনকনে ঠাণ্ডায় ভারী কাপড় জামা পরে, বুট পায়ে, ছাতা মাথায়। হা থাকে আমাদের থেকে আধা কিলোমিটার দূরের আরেকটি ডর্মে। দোতলায় থাকার রুম, নিচের তলায় বারোয়ারী রান্না আর খাবার ঘর। ভিতরে ঢুকে কোট আর বুট খুলে, সিঁড়ির দিকে যাচ্ছি – এগনেস হাত ধরে টানলো খাবার ঘরের দিকে – ঘষা কাঁচের দরজা খুলে ঢুকতেই কোরাসের সুরে কানে তালা – ‘হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ …’ , আনন্দে-বিস্ময়ে অভিভূত আমি হাসি কান্নায় আলোড়িত। সামনে তাকিয়ে দেখি সাদা হার্ড বোর্ডে রঙিন বাংলা অক্ষরে লেখা ‘ শুভ জন্মদিন লিনা ‘। বিস্ময়ে প্রায় অজ্ঞান হতে হতে যে কথাটা প্রথম মনে এলো তাহলো আমার নামের বানানটা ভুল লিখেছে, হ্রস্ব ই কার নয়, দীর্ঘ ঈ কার হবে ! মানুষ এমন অকৃতজ্ঞ !

পরে শুনলাম, এই অসাধ্য কর্মটি সাধন করেছে নরওয়েজিয়ান সহপাঠী জন – সে আগের উইক এন্ডে ট্রেনে করে হেগ শহরে গিয়ে আইএসএস এর একজন বাংলাদেশী ছাত্রকে খুঁজে এই লেখাটি লিখিয়ে এনেছে। আজ থেকে এক যুগেরও বেশি আগের সেই জন্মদিনটি এখনো স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করে। চাকরি জীবনে অফিস থেকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা পাওয়াটা একটা রুটিন – বস থেকে শুরু করে সাপোর্ট স্টাফ সবার জন্যই একটি ফুলের তোড়া আর সকল সহকর্মীর স্বাক্ষর করা জন্মদিনের কার্ড বরাদ্দ। কখনও -সখনও কেক-সিঙ্গারাও খাওয়া হয়। এর মধ্যেও কাছের কেউ কেউ ব্যক্তিগতভাবেও শুভেচ্ছা জানায় । সহকর্মী, বন্ধু, – গোবিন্দ আর তার স্ত্রী সীতা – রাত ১২ টা বাজার সাথে সাথে ফোন করলো কাঠমান্ডু থেকে।

ভাইয়েরা, বোন সবাই জানায় শুভেচ্ছা। এখন যোগ হয়েছে তাদের ছেলেমেয়েরা, কারও খালা, কারও ফুফু আমি । লং ডিসটেন্স কল করে ছোট ভাই আর বন্ধু কেউ কেউ। জন্মদিনের উপহারও যে একদম পাওয়া যায় না, তাও নয়। কাছের কেউ কেউ আবার সারপ্রাইজ উপহারের চমকও দেওয়ার চেষ্টা করে। অনেক আগে ছেলেমেয়ে আর ছোট বোনের বাচ্চারা মিলে বিশাল আয়োজন করেছিল – আমি খুব সম্ভবত ১৩ তারিখেই দেশের বাইরে থেকে ফিরেছিলাম। সেটাও ছিল অনেক বড় চমকে দেওয়া আনন্দ।

মেধার হাতে আঁকা কার্ডগুলো এখনও আছে – যেখানে সে মাকে এঁকেছে বড় করে, মায়ের হাত ধরে সে আর তার ভাই, জন্মদিনের কেক আর বেলুনও আছে সেই ছবিতে। এইবার ছোট্ট মেধা রাত ১২ টায় একটা কিটক্যাট চকলেট নিয়ে এসেছে মায়ের রুমে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে । ছেলে ফোন করেছে – একবার তার সময়ে ১২ তারিখ দুপুর – তখন আমার ১৩ তারিখ হয়েছে মাত্র। আবার ফোন করেছে আমার সময় ১৩ তারিখ সন্ধ্যায়, তার তের তারিখ সকাল।

ইদানিং যুক্ত হয়েছে ফেসবুকের বন্ধুরা। সবাই, সবাই শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। অনেকে ইনবক্স করেছেন। লজ্জাও লাগে আবার ভালোও লাগে ! বন্ধু কচি ফোন করবে, কিরে কি করছিস কালকে – এটাই তার জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানোর ধরন !

ছোট খালাকে বড্ড মিস করি এই দিনটিতে – জীবনে একবারের জন্যও কোনদিন মিস করেন নাই জন্মদিনের কথা ! সময়ের ব্যবধান সত্বেও ঠিক ঠিক ১২টা এক মিনিটে ফোন করতেন। সেই সময়ে যদি দেশে না থাকতাম, যেই দেশে থাকতাম সেখানেই ফোন করতেন। চিকিৎসার কারণে চেন্নাইয়ের ভেলোরে ছিলাম – হোটেলের ফোনে কল করেছেন, রুমে ফোন কানেকশন নাই, খবর দিয়েছেন আমি যেন রিসেপশনে এসে থাকি, উনি আবার কল করবেন! এখন ভাবি কিভাবে সম্ভব করতেন! পছন্দের জিনিস কিনে রাখতেন, কেউ দেশে এলে পাঠিয়ে দিতেন, নিজে তো আর প্রতি বছর কানাডা থেকে আসতে পারতেন না ! চলে গেছেন আমাদের একেবারে ছেড়ে – কিন্ত আমি যেন স্পষ্ট শুনি তার গলা – ‘শুভ জন্মদিন বাচ্চা ! কত বড় হয়ে গেলি রে মামনি ! কি চাই এবার জন্মদিনে !” যেন এখনো কিশোরী আমি!

আর মা ফোন করেন। তিনি রাত ১২টায় ফোন করেন না কোনদিন। তাঁর কোনো তাড়া নাই। দিনের যে কোনো প্রহরে তাঁর সুবিধা মতন সময়ে তিনি ফোন করেন। কখনো প্রথাগত জন্মদিনের শুভকামনা জানান না। আর দশটা দিনের মতই কেমন আছি, কি রান্না হলো জানতে চান ! আমার ছোট বেলার দু একটা স্মৃতি মনে করেন, হাসেন, আবার কাঁদেনও, আর বলেন ভালো থেকো, সাবধানে থেকো, তোমার জন্য বড্ড চিন্তায় থাকি – বার বার বলেন।

বার কয়েক এমন হয়েছে ভুলে গেছি দিনটির কথা, কিন্তু প্রিয়জনেরা ভুলে নাই কখনো। ছেলেবেলায় জন্মদিন ছিল পায়েস খাওয়ার আনন্দ, বকা না খাওয়ার আনন্দ – শুধুই আনন্দ। তারুণ্যে জন্মদিনে বন্ধুদের সাথে ঘুরে বেড়ানোর আনন্দ সেইসাথে বড় হচ্ছি এই আনন্দ – যেন বড় হয়ে আকাশ ছুঁয়ে ফেলবো – এন্ড্রমিডা।

এখন মধ্য বয়সে এসে জন্মদিনের অভিনন্দন আর শুভকামনায় সিক্ত হতে হতে ভাবি – মানুষ হিসেবে ছুঁতে পারিনি এন্ড্রমিডা, কিন্তু আফসোস নাই এতোটুকু। দেখেছি জীবন, জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত সামলে নেওয়ার চেষ্টা করেছি। ঠিকঠাক মানুষ হওয়ার চেষ্টা করেছি – সফলতার হিসেবে নয়, পারফেক্ট হওয়ার নিক্তিতে নয়, ভুল করা কিন্তু ভুল স্বীকার করতে ভয় না পাওয়া এমন মানুষ। এই চেষ্টাটা হয়তো পুরোপুরি সফল হয় নাই, কিন্তু যেটুকু খামতি রয়ে গেছে – আফসোস নাই । কারণ আমি জানি জীবনের এই চেষ্টায় পরিবার, বন্ধু, সহকর্মীদের যে সহযোগিতা, স্নেহ ভালবাসা পেয়েছি – তা যদি একখানে করা যেতো এন্ড্রমিডা ছাপিয়ে ছায়াপথ ছাড়িয়ে যাবে সেই ভালবাসা।

কোনদিন কি এই ভালবাসার পুরোপুরি যোগ্য হয়ে উঠতে পারবো আমি । চেষ্টা করবো , শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করবো ! আই প্রমিস !

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.