রোজ নামচা: সাহেরা কথা-৩

nariলীনা হক: গতকাল দুপুরে গা কাঁপিয়ে জ্বর এলো, সকাল থেকেই নাক দিয়ে জল ঝরছিল – অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে এসে কম্বল গায়ে সেই যে শুয়ে পড়লাম , আজ সকালে বিছানা ছাড়লাম সাহেরার ডাকে। আমার জ্বর দেখে সে আদা আর মধু দিয়ে চা বানিয়ে নিয়ে এসেছে, সাথে একটা হাতে বানানো গরম রুটি । রুটি খেতে না চাইলে সে জানালো এমনিতেই রাতে না খেয়ে থাকার জন্য আমার শরীর থেকে ‘এক চড়ুই ‘ এর রক্ত চলে গেছে । হাসলাম যদিও কিন্তু তার মমতা উপেক্ষা করা গেল না ।

চা রুটি খেয়ে আবারও বিছানায়- স্নানের জল গরম হচ্ছে – অফিসে যেতেই হবে – সকাল সাড়ে ১১ টা আর বিকেল সাড়ে ৩ টায় মিটিং নির্ধারিত আছে বহুদিন আগে থেকেই। সাহেরা ঘর ঝাড়ু দিচ্ছে , দিতে দিতে কথা বলে সে , ‘আফা , তোমরা এট্টু ভালো হইলে আর হরতাল পার হইলে ( যেন হরতাল নদী পার হবে – হাসি আমি এই কথায় ) – মোর টাকাগুলান ব্যাঙ্কের থাকি তুলা নাইগবে’! সাহেরার একটি পোস্ট অফিস একাউন্ট আছে – সেখানে সে বেতনের টাকা থেকে কিছু কিছু করে জমা রাখে। খুব যে জমে তাও তো নয় । কত টাকাই আর মাইনা সে পায় !

জিগ্যেস করি টাকার দরকার পড়ল কেন হঠাৎ ! সে জানায় , তার বড় ভাই- একটি মাত্র ভাই তাদের তিন বোনের , পলাশবাড়ীতে থাকে, মোটর সাইকেল ভাড়া দেয়ার ব্যবসা করে । মানে সে মোটর সাইকেলে করে লোক আনা নেওয়া করে পয়সার বিনিময়ে, এটাই তার জীবিকা । সেকেন্ড হ্যান্ড ৫০ সিসি মোটর সাইকেলটি সাহেরার ভাই শেয়ারে কিনেছিল তার শ্যালকের সাথে। ভাইয়ের শ্যালক বিদেশ যাবে বলে মোটর সাইকেল বিক্রি করে আরও কিছু টাকার বন্দোবস্ত করে, কিন্তু শ্যালকের স্ত্রী সন্তানসম্ভবা – প্রথম সন্তান , এই অবস্থায় সাহেরার ভাইয়ের শ্যালক বিদেশ যেতে পারবে না, তো সাহেরার ভাই যদি যেতে চায় তাহলে বাকি টাকা দিয়ে সে যেতে পারে ।

তাছাড়া দালালকে বেশ কিছু টাকা অগ্রিম দেওয়াও হয়ে গেছে । এখন সাহেরার বাবা কিছু জমি বিক্রি করছেন, ভাইয়ের শ্যালক বলেছে দালালকে দেওয়া টাকা আর শ্যালককে ফেরত দিতে হবে না, আর বোনেরা যদি কিছু সাহায্য করতে পারে। সাহেরার একটি বোন সাভারে থাকে, তার স্বামী তাকে ছেড়ে গেছে এক মেয়েসহ, সে একটা গার্মেন্টসে কাজ করে মেশিন অপারেটর- সেই বোন দিবে ২৫ হাজার টাকা । সাহেরার কাছেও ২৫ হাজার টাকা দিতে অনুরোধ করেছে ভাই।

জানতে চাইলাম, ভাই কোন দেশে যাবে, কি কাজ, কত মায়না – সাহেরা কিছুই জানে না। কিন্তু তাতে সে মোটেও চিন্তিত নয় । বরং ভাইয়ের সম্ভাব্য বিদেশ যাত্রা আর জীবন পরিবর্তনের স্বপ্নে সাহেরা নিজেও কিছুটা বিভোর। সাহেরার পোস্ট অফিসের জমা বই আমার কাছে থাকে, খুলে দেখি সাহেরার জমা হয়েছে ১২ হাজার টাকার মতন। জানাতে সে বললো ‘ ১১ হাজার টাকা সে তুলবে নিজের জমা থেকে আর ১৪ হাজার সে ধার করবে। জিগ্যেস করলাম কোনো এনজিও থেকে নিবে কিনা । জানালো তিন হাজার টাকা সে একটা এনজিও গ্রুপ থেকে নিবে আর বাকি ১১ হাজার টাকা নিবে সুদে- প্রতি হাজারে মাসে ১০০ টাকা মানে ১২% সুদে ।

কিন্তু কেন সে এত কষ্ট করে ভাইকে টাকাটা দিবে? উত্তরে জানায় সে ‘একখান মোটে ভাই, একটা সুযোগ যদি হইছে জেবনটারে ভাই বদলাইতে পারে ! মোরা বইনের ঘরের জেবন তো আফা এমন করিই কাটি যাইবে, ভাইখান যদি সুখে থাকে ‘!

ভাই কি টাকাটা ফেরত দিবে? বলে সে ‘ ভাই কইছে , নিদানের সুম ( প্রয়োজনের সময়) তোমরা মোক টাকা দিয়া সাহায্য করেন, মোর দিন ফিরিলে মুই সগার (সবার) সগ ঋণ শুধে দেইম । কারোর টাকা মুই মারি খাইবার নোয়ায় ।’

আবার জানতে চাই , তোমার স্বামী কি জানে এটা? সে কি বলে ? তাছাড়া টাকা যদি ফেরত না দিতে পারে ভাই ! সাহেরা ঝাড়ু দেওয়া বন্ধ করে বসে আমার খাটের পাশে, বলে ‘ আফা, জানিয়াই মুই টাকা দেইম ভায়োক। এই টাকা আমার কষ্টের টাকা, ওমরার ( তার স্বামীর) কোনো হক নাই এই টাকাত । তোমরা তো জানেন খায়া না খায়া , এক জামা পিন্দিয়া, কুনো শখ না করিয়া – এই টাকা মুই জমাছি , করাইল থাকি ওইদ (রোদ ) বিষ্টি মাথায় করি হাঁটি আসি, রিসকায় উঠি না , সময় সময় তোমরা বিস্টির দিনে যে রিসকা ভাড়া দেন, তাও আমি জমাই । স্বামীর ঘরের কথা যদি জিগান , তাক কহিছি , তিন হাজার দেয়া নাগবে ভাইকে, তাতেই ওমার (স্বামীর) মুখ পাতিলার তলের মতন হইছে ! ‘

বেআক্কেলের মতন আবার জিগ্যেস করি , ভাই যদি না ফেরত দিতে পারে টাকাটা ! থমকে দাঁড়ায় সাহেরা, ‘না দিবার পারলে নাই দিবে , তবু সান্তনা থাকবে যে ভাইয়ের সুখের জন্য টাকাখান মুই খরচ করিছি । সারা জেবন তো সংসারের ঘানি টানি গেলাম- মনের কষ্ট , শরীরের কষ্ট , মোর তো কুনো সুখ শান্তি হবার নোয়ায়, মোর ভাই খান এলা যুদিন সুখে থাকে ।’

ভাইফোঁটার এক সপ্তাহের মাথায় ভাইয়ের জন্য নিঃস্বার্থ ভালবাসার এই জীবন্ত উদাহরণের সামনে আমি আর বেশি কিছু বলি না। খেয়ে না খেয়ে জমানো টাকা দিয়ে সেই সাথে আকাশচুম্বী সুদে ধার করে ভাইয়ের স্বপ্ন সত্যি করার জন্য সাহেরা যা করছে – তা কি সাহসিকতায় যম দুয়ারে কাঁটা দিতে যাওয়ার চাইতে কোনো অংশে কম ?

পৃথিবীর সব ভাইয়েরা ভালো থেকো গো তোমরা ।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.