অন্তর্গত আর্তনাদ

women abstractলুতফুন নাহার লতা: পায়ের আঙুল থেকে চুমু খেতে শুরু করেছে সেলিম। দুই পায়ে সোনার চিকন দুটি চেন আরো একটু উপরে উঠে দুল দুল করে দুলছে। নিলুফারকে আজ অপূর্ব সুন্দর লাগছে ! মনে হচ্ছে সে যেন ভারতীয় কামসূত্রের নায়িকা, যেনো পাথরে খোদাই করা কৃষ্ণের লীলাসঙ্গিনী পদ্মের পাতার পরে বসে আছে বেদনায় লীন। কি এক আকুল করা তৃষ্ণায় আজ সেলিম থর থর করে কাঁপছে, তার ভেতরে রাগ, দুঃখ, অভিমান, অপমান, জ্বালা, যন্ত্রণা সব এক সাথে দলা পাকিয়ে উঠেছে। সে বুঝতে পারছে নিলুফার আজ যেন নিজেকে সম্পূর্ণ ছেড়ে দিয়েছে ওর হাতে, যেন তার নিজের কোন ইচ্ছে নেই, অনিচ্ছে নেই ।

এই ভর সন্ধ্যে বেলায় সেলিমের আর কিচ্ছু করার নেই কেবল নিলুফার তার সকল ধ্যানের কেন্দ্রবিন্দু । আজ সে কেমন চিরকাঙ্গালের মত আচরণ করছে, অস্ফুট শব্দে কেবল ফিস ফিস করে ডাকছে,নিলু, নিলু , নিলা , নিলি। তার মনে হচ্ছে যেন নদীর দুকূল ভেঙ্গে বুকের ভেতর ঝুপ ঝুপ করে পড়ছে । সে সব হারাতে চলেছে । নিলুফারের সাথে তার এই মন দেয়া নেয়া , দেহের দেউলে এই পূজার উৎসব, প্রাণের টানে এই মিলনের স্রোতে ভাসা, এর সব কিছুর এই শেষ আয়োজন। আজকের পরে নিলুফার আর আসবে না তার কাছে ।

মাথার কাছে হাত ঘড়িটা খুলে রাখলো নিলুফার, রাখার আগে আরো একবার দেখে নিল সময়টা, সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা বাজে। আজ তার সময়ের কোনো তাড়া নেই । দৌড়ে দৌড়ে রাস্তায় নেমে ট্যাক্সি , বেবিট্যাক্সি বা সিএনজি নিয়ে নির্দ্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ঘরে ফেরার তাড়া নেই তার । চাই কি আজ সে থেকেও যেতে পারে সেলিমের কাছে। মিলনের ফ্লাইট এসে পৌঁছুবে কাল রাত আটটায় সরাসরি সে নিলুফারের এপার্টমেন্টে উঠবে না । প্রায় বারো বছর পরে মিলন দেশে ফিরছে, মা’র সাথে দেখা না করে সে আগে আর কোথাও যাবে না। মিলনের মা থাকেন মগবাজারে ওদের পুরনো বাড়ীতে। কাল দুপুর নাগাদ নিলুফার সেখানে গিয়ে থাকবে তারপর শাশুড়ি দেবরসহ সে যাবে এয়ারপোর্টে মিলনকে আনতে। বনানীতে আজ তার নিজের বাসা এক্কেবারে খালি । কাজের মেয়েটাকেও শাশুড়ির বাসায় নামিয়ে দিয়ে এসেছে।

সেলিম ততক্ষণে ওর সারা শরীর অক্টোপাসের মত জড়িয়ে ধরেছে। আজ চুম্বনের সাথে সাথে সেলিমের চোখের জলে ভেসে যাচ্ছে নিলুফার। দশ বছর ! দশ বছর বড় কম কথা নয় । এই দীর্ঘ সময়ের এই মনের বাঁধন ছেঁড়া খুব কি সহজ ! আর তাছাড়া শরীর ! শরীরের মায়া কাটানো কি এতোই সহজ ! দশ বছরে কত শীতের শেফালি ঝরে গেলো, কত হুতাশন নিয়ে কেটে গেলো অধীর বসন্ত , আকাশ জুড়ে মেঘের ডানায় ভাসা শরৎ আর হেমন্তের হলুদ শুন্যতা ওর বুকের ভেতর হু হু করে বয়ে গেছে । সেলিম না থাকলে কে জানে কোথায় চলে যেত সে। তিলে তিলে একটি বেদনার বৃক্ষ সমস্ত দেহ মনকে পরিব্যাপ্ত করে প্রসারিত হয়ে আছে । এর থেকে তার মুক্তি নেই ! ব্যাকুল দুবাহু বাড়িয়ে হঠাৎ সে সেলিমের গলা জড়িয়ে ধরে ওর প্রশস্ত বুকের ভেতর মুখ রেখে ডুকরে কেঁদে ওঠে। কেউ বুঝবে না তার এই তন্ত্রী ছেড়া কষ্ট কেবল সেলিম ছাড়া !

সেলিম ছাড়া আর সবাই যেন তার দিকে ফাঁসির দড়ি নিয়ে চেয়ে আছে। এই সমাজ এই সংসার সব কিছু তার বিরুদ্ধে ! সব কিছু কেবল চোখ রাঙিয়ে তার আর সেলিমের দিকে আঙুল তুলে ফাঁসির আদেশ দিচ্ছে । এই দুর্বিষহ জীবন সে বয়ে বেড়াতে চায় না আর ! এই ছলনা নিয়ে বেঁচে থাকা অর্থহীন । সব কিছু তার মিথ্যে মনে হয় । কেন এমন হল ? সে তো এমনটা চায়নি ! একটা মন খারাপের ব্যাধিতে সে ভোগে । মিলনের সাথে বিয়ের পরে মাত্র ছয় মাস ওরা একসাথে ছিল, তারপর মিলনের বড় ভাই, দেশে চাকরি-টাকরি না হওয়ায় চাকরী দিয়ে সৌদি আরবে নিয়ে গেলেন মিলনকে । বড় ভাই আগে থেকেই ছিলেন সেখানে, তাই অন্যদের মত মিলনকে অত কষ্ট করতে হলো না। যাবার পর থেকেই মিলনের একই কথা সামনের বছর আসছি , সামনের বছর আসছি ! অপেক্ষা করতে করতে আজ প্রায় বারো বছর পরে সে দেশে আসছে।

মিলন চলে যাবার পর মগবাজারে শাশুড়ির সাথে থাকত নিলুফার, সংসারের চাল ডাল তেল নুনের মধ্যে থেকে থেকে আর সারাক্ষণ শাশুড়ির অসন্তোষ বাক্য শুনতে শুনতে, মাত্র বাইশ বছরের একটি মেয়ে স্বামী ছাড়া একা থাকার যন্ত্রণায় হাঁপিয়ে উঠল। খুঁটিনাটি নিয়ে শাশুড়ির সাথে সবসময় একটা মানসিক ব্যবচ্ছেদ লেগেই ছিল । ভাগ্য ভাল যে যাবার কিছুদিন পরে মিলন টাকা পাঠিয়ে বনানীতে সুন্দর একটা এপার্টমেন্ট কিনে দিলো নিলুফারকে, মনের মত করে সাজিয়ে-গুছিয়ে নিয়ে নিজের এপার্টমেন্টে ছোট ননদ আর দেবরকে নিয়ে রইলো সে।

নিলুফার পড়াশুনা করতে চাইলে তাও নাকচ হয়ে গেল এক বাক্যে । ননদ দেবর পড়াশোনা করবে কিন্তু নিলুফার পড়াশোনা করতে পারবে না । সে ঘরের বউ, তাকে অত পড়তে হবে না । মিলন যদিও বা হ্যাঁ বলতো, কিন্তু শাশুড়ী ননদরা কিছুতেই রাজী হল না । ফলে বি এ পাশ করার পরে এম এ টা আর পড়া হল না তার। চাকরী তো করতে দেবেই না। ফলে নিলুফারের জীবনে আর কিছুই করার নেই ! ঘুম থেকে উঠে আবার ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত সারা দিন টিভি তে হিন্দি সিনেমা দেখা, মাঝে মধ্যে রান্না করা আর শপিং, বেড়ানো, ঘোরা ছাড়া কিছুই করার নেই। সেলিমের সাথে নিলুফারের দেখা হল মিলন যাবার পরে যখন সে বনানীতে এই এপার্টমেন্ট কিনতে এলো। সেলিম মালিক পক্ষ । বাবা ভাইয়েরা মিলে ওদের বড় রিয়েল এস্টেট ব্যবসা ।

সেলিম দেখতে খুব সুন্দর, প্রায় ছয়ফুট লম্বা । ভালোবেসে বিয়ে করেছিল সেলিম, কিন্তু কি দুর্ভাগ্য ! মাত্র এক বছরের মাথায় খুব বড় ধরনের রোড এক্সিডেন্টে ওর স্ত্রী মারা গেছে। কি যে অসাধারণ মিষ্টি ব্যবহার সেলিমের ! আর এতো কেয়ারিং। কেমন করে নিলুফার ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়লো সেলিমের প্রতি। সেলিমও কেমন যেন একটা অজানা টান অনুভব করতে শুরু করল নিলুফারের জন্য । যদিও ওরা দুজনেই জানে এ অসম্ভব ! কিছুতেই এই সম্পর্ক কোথাও গিয়ে দাঁড়াবে না। তাই দূরে দূরে থাকে দুজনেই। প্রাণ চায়, তবু বিবেকের শাসন দিয়ে তাকে আগলে রাখে । কিন্তু তারপরেও কেমন করে কি হয়ে গেল । পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির মত কেবলি এক অজানা টান নিলুফারের জন্য, এমন প্রবল এমন অনিবার্য সে টান যেন এটাই হবার কথা ছিল । এটাই হতে পারতো , আর কিচ্ছু না ।

সে রাতে কেমন এক মোহ এসে ভর করেছিল নিলুফারের মনে, সারা আকাশ যেন একটা মায়াময় কুয়াশার চাদরে মুখ ঢেকে পিছন ফিরে দাঁড়ালো। ঘোর বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছে ঢাকা শহর। সেলিম গুলশান ক্লাবে বন্ধুদের সাথে বড় গোল টেবিলে বসে হাউজি খেলছে, তার পকেটে বেজে চলেছে নিলুফারের ফোন, সে খেয়ালই করেনি ! সে রাতের সেই তুমুল বর্ষার পানিতে বুদ বুদ ভাসা স্রোতধারা পেরিয়ে নিলুফারের গাড়ী এসে দাঁড়ালো গুলশান ক্লাবের সামনে। ফোন পেয়ে সেলিম বাইরে এসে তো অবাক! নিলুফার আজ কেমন যেন উদভ্রান্ত, প্রকৃতিস্থ, অপ্রতিরোধ্য ! তার দিকে চেয়ে সেলিম হতবাক। তুমি ? হ্যাঁ! কি ব্যাপার নিলু ? ফ্যাল ফ্যাল করে সে চেয়ে রইল সেলিমের দিকে ! ঘরে পরা এলোমেলো গোলাপি আর্দির স্যালোয়ার কামিজের উপরে গোলাপি সুতোর নকশা করা ওড়নার আবরণে দেহের নিপাট ভাঁজ, পায়ে চামড়ার কোলাপুরি ! আলুথালু চুল , উদভ্রান্ত দৃষ্টি , চোখের পাতা যেন শাওনের মেঘে ভারী, আর তার বিদ্রোহী অবয়ব, সব মিলিয়ে নিলুফার যেন এক অসুস্থ ঢাকা নগরী ! কিছুটা বিস্ময়, কিছুটা মমতা , কিছুটা আবেগ সেলিমকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে তুলল ।

সে তার সারা মুখে সেই বিস্ময়ের প্রলেপ মেখে জানতে চাইল, কি হয়েছে ! কি হয়েছে নিলু ? পাখীর ডানার মত দুই হাত বাড়িয়ে নিলুফার গাড়ি থেকে ঝাঁপ দিয়ে নামলো, যেন সে ক্রিস্টাল ফুলদানীর মত ভেঙ্গে ভেঙ্গে চিনির গুড়ার মত সেখানেই পড়ে যাবে। আর নিমেষেই ধুয়ে যাবে এই ঘন বর্ষার জলে। সে অস্ফুট কন্ঠে কেবল বলল, ‘ কিছু না । অভিমানে অসহায় নিলুফার কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল । গাড়ি থেকে নেমে ড্রাইভার আলী একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে ! গুলশান ক্লাবের সামনে রাস্তার উপরে দাঁড়িয়ে ওরা দুজনেই বৃষ্টিতে ভিজছে। নিলুফারকে নিয়ে সে গেল গুলশান ক্লাবের ভেতরে রেস্তোরায়। সেলিম জানে নিলুফারের রাতের খাওয়া হয়নি, ফোনে সে ঝগড়া করেছে মিলনের সাথে, কেঁদেছে । এর কারণ তার জানা, এ সব নিলুফারের নিত্যদিনের রুটিন।

সেলিমের সামনে বসে একটু একটু করে খাচ্ছে নিলুফার সেই সাথে তার চোখ থেকে পানি ঝরছে। তার মন খারাপ! বাসায় সে একা। তার ননদ দেবর মগবাজারে গিয়েছে , আজ তারা আসবে না । সারা বিকেল সে মিলনের সাথে ঝগড়া করেছে। বহুবার মিলন কে সে বুঝিয়ে বলেছে আর কিছুই সে চায় না , মিলন যেন ফিরে আসে। নাহলে আর কোনো দিন সে তার মুখও দেখতে পাবে না । এমন রাগ, দুঃখ, অভিমান করে করে সে এখন ক্লান্ত। আজ সে তার স্বামীর কাছে ডিভোর্স চেয়েছে। মিলন যদি নাই আসতে পারে তবে কেন তাকে ধরে বেঁধে তার জীবনটা নষ্ট করে দিচ্ছে। মিলনও আজ রেগে গিয়ে আজে বাজে ভাষায় গালি গালাজ করেছে।

নিলুফার যেন এক ডানা ভাঙ্গা পাখী । উড়ে যেতে চায় কিন্তু পারেনা । তার দুটি ডানা মটকে ভাঙ্গা সে আর কোন দিন শুন্যে উড়ে যেতে পারবে না । মাঝে মাঝে ভাবে তাকে বুঝতে পারে এমন তো কেউ নেই। কোথায় সে যাবে ! কার কাছে তার মনের মুক্তি? টাকাই কি জীবনের সব ! মানুষ কি কেবল টাকার জন্যেই বিয়ে করে ! সে কত দিন কত রাত পাগলের মত কান্নাকাটি করেছে, কতবার মরে যেতে চেয়েছে এ কোন জীবন তাকে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে ! এ যেনো শীতের সন্ধ্যায় কুয়াশার চাদরে ঢাকা আবছায়া চাঁদের মত, থাকা না থাকার মাঝামাঝি জ্বলে থাকা, এ যেন জলন্ত চুলোয় বর্ষা ভেজা অর্ধদগ্ধ চলাকাঠ । না সে পুড়ে ছাই হতে পেরেছে , না আগুন থেকে দূরে থাকতে পেরেছে ।

সে রাতে প্রথম সেলিমের সাথে তার দেহের সীমানা অতিক্রম করে গেল সে । নিলুফারের দিন রাত্রির দুঃখ বেদনা, আশা নিরাশার, বুকের পরে এক ভালোলাগা লজ্জা তাকে মাথা নত করে দিল। কিছু দিন সে মানসিকভাবে খুবই অসুস্থ হয়ে বিছানা নিল । সেলিম নিলুফারের জীবনের সাথে গাঁথা হয়ে গেল। এর পর গত ১০ বছর! নিলুফারের কাছে জীবনের অন্য নাম সেলিম। ঈদ, কোরবানী ঈদ , জন্মদিন , পয়লা বৈশাখ , বাংলা একাডেমির মাঠে ফেব্রুয়ারির বই মেলা, মেলায় বসে দু হাত ভরে কাঁচের চুড়ি কিনে পরা, মুখের পরে লাল সবুজের পতাকা এঁকে বাংলা একাডেমীতে হেঁটে বেড়ানো , সবুজ তাতের শাড়ীতে গোল লাল সুর্য এঁকে সেই শাড়ী পরে সেলিমের সবুজ পাঞ্জাবীর হাত ধরে ১৬ ই ডিসেম্বর বিজয়ের উৎসবে যাওয়া , পয়লা বৈশাখের সকাল বেলায় লালপাড় সাদাশাড়ী পরে , আর্ট কলেজ , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় , টি এস সি’র সামনে দিয়ে ঘোরা, তিলের খাজা , গজা,মুরলী, আমড়া কিনে খাওয়া এই সব যা কিছু এই  নয় বছরে সে করেছে তার সকল কিছুর সাথে প্রচ্ছন্নভাবে জড়িয়ে থেকেছে সেলিম । কখনো একটি দিনের জন্য সেলিম তাকে দুঃখ দেয়নি। তার বেদনার কারণ হয়নি ।

সেলিমের এই অ্যাপার্টমেন্টে নিলুফারের হাতের স্পর্শ সবখানে, এর যত এন্টিক্স, দেয়ালে দেয়ালে যত পেইন্টিংস সব তার নিজের পছন্দে কেনা , কোথায় কি রঙের পর্দা হবে , মেঝে ও দেয়ালের সাথে মিলিয়ে কার্পেট কেমন হবে , কেমন করে সাজাবে বসার ঘর , কি ধরনের বই থাকবে বুক সেলফের কোন তাকে , রান্না ঘরের কোথায় কি হবে, এর সব কিছু নিলুফারের নিজের মনের মত করে নিজের হাতের ছোঁয়ায় সাজানো। এর প্রতিটি দেয়াল নিলুফারকে চেনে। এর প্রতিটি ছায়া দুলে ওঠে নিলুফারের নিঃশ্বাসে ।

সেলিমকে বুকে জড়িয়ে শুকনো পাতার মত পড়ে থাকে নিলুফার, তার চোখ বন্ধ কিন্তু তার মন ক্যামেরার মত প্যান করে চলেছে দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে । তার মন বলে এই রাতে থেমে যাক পৃথিবী । কোনদিন সে আর জাগবে না । ” কোন দিন জাগিবেনা আর জানিবার গাঢ় বেদনার অবিরাম-অবিরাম ভার সহিবেনা আর ” নিলুফারের মাথার ভেতরে জীবনানন্দ দাশের কবিতার মত আরো এক বিপন্ন বিস্ময় খেলা করে ফেরে। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেল সেলিমের । সে উঠে অন্ধকারে ঘরের আর এক কোনায় রাখা দুটি এন্টিক চেয়ারের একটিতে বসে রইল। জগ থেকে পানি ঢেলে গ্লাসটা মুখের কাছে নিয়েও সে নামিয়ে রাখল ছোট্ট গোল পাথরের টেবিলের উপর । রাস্তার নিয়নের আলো থেকে জানালার পর্দার পাশ ঘেসে একটা তীর্যক আলোর রেখা এসে পড়েছে নিলুফারের ঘুমন্ত আধখানা মুখের উপরে, সেলিম এক মনে সেদিকে চেয়ে আছে। মিলনের সাথে সম্পর্ক মিটিয়ে দিয়ে সেলিমকে নিয়ে সংসার করতে চেয়েছে নিলুফার। দীর্ঘ এই সব বছরগুলোতে এসব আলোচনা বহুবার হয়ে গেছে । কিন্তু না সত্যিকারের কোন সুরাহা হয়নি। ব্যাপারটি নিয়ে ভাঙ্গনের যে ভয়ংকর ঝড় উঠবে তা সহজ হবে না , চাই কি নিলুফারের জীবন বিপন্ন হবে এতে । মিলনের পরিবার কিছুতেই তা হতে দেবে না। যদিও নিলুফারের ধারণা, ওর শাশুড়ি ননদেরা সব জেনেও চুপ করে আছে মিলনের আসার অপেক্ষায়।

হাজারো ভাবনা সেলিমের মনের ভেতর ঝড়ের মত বয়ে চলেছে , সে যেন আজ ফাঁসির আসামী, যেনো আজ তার জীবনের শেষ দিন , কবে কেমন করে সে এই মেয়েটাকে এতো ভালবেসেছে নিজেও জানেনা , তার এত কিছু আছে , সম্পদ- সম্পত্তি বাবার পুরনো ব্যবসার শেয়ার , টাকা পয়সা , বাড়ি-গাড়ি অথচ কেমন করে সে তার ভবিতব্যের কাছে এতো অসহায় হয়ে গেল তাই ভাবছে । নিলুফার ফিরে যায়নি তার বাসায়। সেলিমেরও আর ইচ্ছে করেনি ওকে জোর করে দূরে ঠেলে দিতে । রাত এখনো গভীর ! নিলুফার নড়েচড়ে পাশ ফিরে শোয় । আবার জানালার বাইরে নিয়নের আলো আর বাতাসে নারকেল পাতার মৃদু মন্দ দোল একটা আলোছায়ার খেলা শুরু করেছে নিলুফারের সারা শরীর জুড়ে, সেদিকে আনমনা চেয়ে আছে সেলিম । ঘুমের আড়ালেও নিলুফার ভেবেছে ! কেমন হয় যদি কাল ঘুম থেকে উঠে শোনে মিলন আর কোন দিনই আসবেনা । কিম্বা মিলনের প্লেন ক্রাশ করেছে, ভূমিকম্প , বা ভয়ংকর একটা সুনামি হয়ে যায় ! কিম্বা নিলুফারের ঘুম আর না ভাঙ্গে ! কিম্বা এমন কিছু হয় যেমন রোড এক্সিডেন্টে নিলুফার মরে যায় আর সে তার এই জীবন থেকে এক অপার মুক্তি পেয়ে যায় ! ঘুমে জাগরণে তার হৃৎপিণ্ড জুড়ে তুমুল আন্দোলন চলতে থাকে, কেমন যেন ভয় ভয় চাপ চাপ ব্যথা ! সে ধড় ফড় করে উঠে সেলিমের পাশের চেয়ারটায় এসে বসে ।

ঢাকা শহর কাঁপিয়ে চারিদিকে আজান শুরু হল , শেষ রাতের এই আকুল করা আজানের ধ্বনি শুনলো ওরা পরস্পরের হাতে হাত রেখে। বাইরে টুপ টুপ করে শিশির ঝরছে। শীতের এই শুরুতে হয়তো দুটো একটা করে শেফালী ঝরেও পড়ছে কোথাও । ভোরের আলো ফুটে ওঠার আগেই নিলুফার চলে গেল বিদায় নিয়ে। নাহ কিছুই বদল হলো না । রোড এক্সিডেন্ট হল না, প্লেন ক্রাশ হোল না , ভূমিকম্প বা প্লাবন কিছুই হলনা । সারাদিন পরে শাশুড়ি ননদ দেবর সাথে নিয়ে নিলুফার এয়ারপোর্টে গেল । যথাসময়ে মিলন এসে নামল । মগবাজারের বাসায় আনন্দ হই চই এর ঢল নামল। আত্মীয় স্বজন বন্ধুবান্ধবে মগবাজারের বাড়ি ভরে উঠল। সে রাতে নিলুফার মিলনের সাথে ঘুমালো, বারো বছর পরে । সব কিছু সহজ স্বাভাবিক ভাবেই চলল । মাস দেড়েক পরে বাড়ীতে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল । নিলুফার প্রেগন্যান্ট ! সময় কেন এতো মমতাহীন দ্রুতধাবমান দূরপাল্লার ট্রেন ! কেনো আটপৌরে জীবনের তারে তারে এতো জমাট বাঁধা ক্লেদ ! কেনো এই অব্যক্ত রোদন ! কেন অঙ্গার হয়ে বেঁচে থাকা ! তবু নিলুফার ভাল বউ , ভাল মা হয়ে কাটিয়ে দিল এতোটা বছর ।

আজ বিশ বছর পরে মিলনের সাথে ডিভোর্স হল নিলুফারের । ডিভোর্সের কারণ কিন্তু কেউ জানল না । শাশুড়ি গত হয়েছেন বহু বছর হল, দেবর ননদরাও যে যার সংসারে ব্যাস্ত , বাবা মা ও আজ আর বেঁচে নেই, ফলে বাঁধা রইলনা আর দুজনার কারো পক্ষেই । খুব গোপনে কাগজ পত্র সই করে দিয়ে মিলন নিঃশব্দে সরে গেল তার একমাত্র সন্তান সৌরভ আর নিলুফারের জীবন থেকে। মিলনের হৃৎপিণ্ড দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল তার সোনার ছেলে সৌরভের দিকে চেয়ে। যে সন্তানকে সে তার সকল দিয়ে তিলে তিলে বড় করেছে। কিন্তু সে একবারও ভাবল না নিলুফারের কথা ।

Lata apa
লেখক

বিশ বছর আগে এই মুক্তিটুকুর জন্যে তার সমস্ত অন্তর আর্তনাদ করেছিল। নিলুফার আজ এতো বছর পরে বসেছে ছেলের মুখোমুখি। আজ সে নির্ভয়। নির্ভার। আজ সে সকল মালিন্যের উর্ধ্বে। কি এক অপার মুক্তি তাকে এই অসার সংসার থেকে নির্বাণ এনে দিল। রাতভর সে ছেলেকে সকল কথা খুলে বলতে পেরেছে সেই নির্ভার ছলনাহীন মুক্তির আলোয় ছেলের হাত ধরে বসে রইল। ভোরের দিকে ঢাকা শহরের চিরকালের সেই মধুর আজান বেজে উঠল প্রতিদিনের মত। বাইরে টুপ টুপ করে শিশির ঝরছে। শীতের এই শুরুতে হয়তো দুটো একটা করে শেফালী ঝরেও পড়ছে কোথাও ।

(সৌরভ এখন পড়ছে আমেরিকার বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় জনহপকিন্সে। সত্য জেনেছে সৌরভ। নিলুফার তাকে তুলে দিয়েছে সেলিমের হাতে। দগ্ধ সত্য নিয়ে পিতাপুত্র হাতে হাত রেখেছে। এখনও নিলুফার ঢাকাতেই আছে। এখনও তার সকাল হয় সেলিমের কথা ভেবে। এখনো সে ভোরের আজান শোনে মনে মনে সেলিমের হাত খানি ধরে )

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.