বোরখায় বাঁধেনি সাজির জবানী

DAASসালেহা ইয়াসমীন লাইলী: ‘আপা, জঙ্গীবাদের আশঙ্কায় আমার স্বামীকে গ্রেফতারের জন্য হরতালের আগের রাতে যখন পুলিশ বাড়ি ঘিরে ফেলল, আমি একটুও ভয় পাইনি। বরং মনে মনে খুশি হয়েছিলাম এই ভেবে যে পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে গেলে আমি নিস্তার পেতাম। আর যদি সারাজীবনের জন্য তাকে জেলে আটকে রাখত, আমি হয়তো একটা জীবন পেতাম। অন্য কোন ভাবনা তখন আমার মধ্যে কাজ করেনি। কিন্তু সেদিনও পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে গেল সে’।

আপনি হয়তো ভাবছেন আমি আমার স্বামী সম্পর্কে এমন করে কেন ভাবছি? এতটা বিষভরা কেন আমার মন?

সত্যি করে বলি, লোকটার জন্য আমার কোন সহানুভূতি কাজ করে না। যতই দিন যাচ্ছে ততই বিষাক্ত হয়ে যাচ্ছি আমি।  তবুও তার সংসার করছি!

‘আপনারা আল্লামা শফির কথা শুনে প্রতিবাদ করছেন , তার বিচার দাবি করছেন, কিন্তু আমার স্বামী আল্লামা শফির প্রতিটি কথার ব্যাখ্যা আমাকে শোনায়, মানিয়ে চলার হুকুম করে। যদিও আমার ভাল লাগেনা কথাগুলো। কিন্তু লোকটার কথায় কোন প্রতিবাদ করার উপায় নাই। শুধু মনে মনে ঘৃণা করি। যেমন ঘৃণা করি আমার স্বামীকে, তেমনি আল্লামা শফীকে। আমার স্বামীর কাছেও নারী মানে তেঁতুলের চেয়ে বেশী কিছু নয়। তার কাছে বাড়ির ৮/৯ বছরের কাজের মেয়েটিও একটি টস টসে তেঁতুল। ১২ বছরের সংসার জীবনে ১৬ টা কাজের মেয়ে চলে গেছে শুধু তার লালসার  শিকার হয়ে। পাশের বাড়ির ভাবিটিও একটা পাকা তেঁতুল! তার চলনে-বলনে তেঁতুলের ছড়ার মতো ঝন ঝন বাজে আমার স্বামীর প্রাণ।

কিশোরী বয়সের ভাতিজির সৌন্দর্যের বর্ণনা সে যেভাবে করে তাতে মনে হয় কতটা নগ্নতা থাকে তার দৃষ্টিতে। যদিও তার কাছে পৃথিবীর কোন নারী ভাল না। এই নারীদের দেখলে তার মনে কু-খেয়াল আসে বলে নারীরাই খারাপ। সে নারী  ঘরের বাইবে কাজ করা নারী হোক আর গৃহিনী। সবাই খারাপ। কিন্তু আমি তো তাকে চিনি। সে নিজেই খুব খারাপ। তবুও নারীদের উপর সব দোষ দিয়ে নিজেকে পরহেজগার কামেল দাবি করে লোকটা। যেন নারীরা তাকে বাধ্য করে তাদের দিকে কুদৃষ্টি নিয়ে তাকাতে। এমন একটা মানুষের সাথে ঘর করতে হয় আমার’-

……..বলে চলেছেন সাজি নামের একজন।

 ‘ঘৃণা লাগে বিছানায় শুইতে। যেন আমি বার বার বেশ্যার মতো শুইছি । প্রতিদিন । বেশ্যাদের মতো আমিও পেটের কাছে বাধ্য । তাই তার যতবার ইচ্ছে আমি ব্যবহৃত হই। অন্য কোন পথ আমার খোলা নেই। বাড়ির বাইরের দরজাটার দিকে তাকিয়ে প্রতিদিন ভাবি একদিন এই ঘর থেকে পালিয়ে যাব । দূরে কোথাও । একমাত্র সন্তান ও নিরাপত্তার কথা ভেবে সাহস পাই না। ঘরে তো একজন মানুষরূপি  জন্তুর কামনার শিকার হই রোজ । আমি যেন তার কেনা দাসী। যেভাবে খুশি ব্যবহার করবে। বাড়ির দরজার বাইরে কত হিংস্রতা ওঁৎ পেতে আছে, জানি না। তবুও আমি পালানোর স্বপ্ন দেখি রোজ। বাইরে গিয়ে যদি হায়েনাদের খপ্পরে পড়ি। দেশের হাল দেখে তো ঘর ও বাইরের মাঝে তেমন ব্যবধান খুঁজে পাই না। তবুও আমাকে পালাতেই হবে। এই জানোয়ারের হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য পালানো ছাড়া কোন উপায় নেই আমার’- এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে দম নিলেন সাজি।

সাজির এমন পালানোর স্বপ্ন দেখা ১০ বছর ধরেই। বিয়ের তিন বছর পর থেকেই সে পালানোর পথ খুঁজছে। এই তিন বছর তো সে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টাই করে গেছে। তারপর থেকে বুঝে গেছে এভাবে মানিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। নিজের আত্মসম্মান, আকাঙ্খা, ইচ্ছে, স্বপ্ন সব উড়িয়ে দিয়ে কতটাই বা মানিয়ে নেওয়া যায়! যখন রক্ষিতার চেয়েও নিজেকে হীন মনে হয়।

বললেন , ‘ছোটবেলা থেকে দেখতে অনেক সুন্দর ছিলাম। আমার স্বপ্ন ছিল পড়ালেখা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়াবো। কিন্তু মা ছিলেন মামার বাড়িতে আশ্রিত। বাবা মাকে ছেড়ে দিয়েছেন আমার জন্মের পর। অনেক কষ্ট করতে দেখেছি মাকে। তাই মামার বাড়িতে আর বেশী বড় হতে পারিনি। পড়ালেখা শেষ না হতেই বিয়ে দেন দূরের গ্রামের নূর আলমের সাথে।

মাদ্রাসায় পড়া নূর আলমের ছোট্ট একটা ব্যবসা ছিল। তাতে সমস্যা ছিল না। খারাপ লাগে শুধু স্ত্রী হিসেবে নয়, নারীর প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি দেখে। বিয়ের দিন থেকেই আমি এক যৌন সামগ্রী হয়ে ব্যবহৃত হতে থাকি। কথায় কথায় ধর্মের দোহাই দিয়ে  বাধ্য করতো বিছানায় যেতে। আল্লামা শফীর বক্তব্য শুনে অনেকে অবাক হয়েছেন। আমি হইনি। তার মতো ভণ্ড আরো আছে এই ভেবে। আমার স্বামীও জগতের তাবৎ নারীকে যৌনবস্তু ছাড়া কিছু মনে করে না। আমার মা সব জানে, কিন্তু তিনি অসহায়। তিনি আমাকে আমার সন্তানের জন্য সংসারে আপোষ করতে বলেন।কিন্তু কতদিন আমি এভাবে পারব জানিনা!’

 নূর আলম আবার একজন ধার্মিক মানুষ! যদিও গ্রামের অনেক মানুষ তার কুর্কীতির কথা জানে। প্রতিবেশীরা তো কয়েকবার কাজের মেয়েদের ধর্ষিত হওয়ার কথা জেনে বাড়িতে বসে সালিশ করে গেছে। মামলার ভয় দেখিয়ে কতবার তারা জরিমানাও করেছে। তবুও নূর আলম সম্মানিত হন সমাজে। শুধু পুরুষ হওয়ার গৌরবে!  তিনি হজ্বও করে এসেছেন। ধর্ম রক্ষার আন্দোলন করে কয়েকবার জেল খেটেছেন। নিজের বাড়ির নারীদের জন্য পর্দা বাধ্যতামূলক করেছেন। ঘরের বাইরে বেরোনো বন্ধ করে দিয়েছেন। মেয়েদের বেশী পড়া লেখা  করানো ও চাকুরী করানো, আত্মীয় স্বজনদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন। নিজের দিলের  লালা বন্ধ করতে পারেনি! তার লালার শিকার হয়ে তাবৎ নারী ঘৃণিত হচ্ছে তার কাছে।

 লেখক ও সাংবাদিক

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.