প্রবাসী নারী শ্রমিকদের মৃত্যু যন্ত্রণা শোনার কেউ নেই?

women worker abroadউইমেন চ্যাপ্টার:  বিদেশে নারী শ্রমিকরা কি ধরনের ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়, তারই কিছু উদাহরণ তুলে ধরেছেন একজন ফেসবুকে। তিনি লিখেছেন, সবচেয়ে জঘন্যতম কর্মটি হচ্ছে মেয়েটিকে ধর্ষণ করা এবং শরীরের মধ্যে তিনমাস মেয়াদী জন্মনিয়ন্ত্রক ইনজেকশান পুশ করা। বাড়ীর মালিক, মালিকের ছেলে, ছেলের বন্ধুরা এবং বাড়ীর স্ত্রীর ভাই এ অনৈতিক কর্ম করতে মেয়েটিকে বাধ্য করে।

নারী গৃহ শ্রমিকরা জর্ডান বিমান বন্দরে পৌছার পর তাঁদেরকে স্থানীয় রিক্রুটিং এজেন্সির অফিসের লোকেরা বিমান বন্দর থেকে রিসিভ করে এজেন্সির অফিসে নিয়ে যায়। বাসা বাড়ীতে কাজে পাঠানো পর্যন্ত ঐ অফিসেই তাদের থাকতে হয়। এই অফিসটি আর দশটা সাধারণ অফিসের মতোন নয়, অনেকটা কারাগারের মতো। চার দিকের দেয়াল অনেক উঁচু। জানালা গ্রিল এবং গেট সর্বক্ষণ তালাবদ্ধ।

এই অফিস থেকে জর্ডানের লোকজন মেয়েদেরেকে বাসা-বাড়ীর কাজের জন্য নিয়ে যায়। এজন্য তারা রিক্রুটিং এজেন্সির অফিসকে কম-বেশী জর্ডানিয়ান দিনার ১৬০০/ (এক হাজার ছয়শত) সমপরিমাণ বাংলাদেশী টাকা ১,৬০,০০০/ (এক লক্ষ ষাট হাজার টাকা) পরিশোধ করে থাকে। এই চুক্তিটি জর্ডানিয়ান ব্যক্তি এবং রিক্রুটিং এজেন্সির অফিসের মধ্যে বলবৎ থাকে -যার মেয়াদ দুই বছর।

বাড়িতে নেওয়ার পর শুরু হয় ওই মেয়েদের অন্যরকম জীবন। তাকে জানানো হয়, জর্ডানিয়ান দিনার ১৬০০/ (এক হাজার ছয়শত) সমপরিমাণ বাংলাদেশী টাকা ১,৬০,০০০/ (এক লক্ষ ষাট হাজার টাকা) দিয়ে এজেন্সি অফিস থেকে কিনে আনা হয়েছে তাকে। বাড়ির সকল কাজ করতে হবে। গৃহকর্তা বাড়ীর সকলের নিকট কাজের মেয়েটিকে অতি তাচ্ছিল্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। ভাষা না জানার কারণে তখন থেকেই মেয়েটিকে নীরবে অতি তীব্র ধরনের তাচ্ছিল্য এবং অপমান সহ্য করতে হয়।

ফজরের আজানের সাথে সাথেই ঘুম থেকে উঠতে হয় এবং বিরতিহীনভাবে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়। দুপুরের পর অথবা রাত দশটার দিকে ঘুমে ঝিমিয়ে পড়লে লাঠি দিয়ে বাড়ি মারে। বাড়ীর মালিক কাজের মেয়েটিকে কবুজ (বাংলা ভাষায় রুটি) ছাড়া অন্য কিছু খেতে দেয় না। রুটির সাথে কোন তরকারী নাই। এই রুটি খেতে অনীহা প্রকাশ করলে মারধর করে। পাশপাশি শুরু হয় শারীরিক নির্যাতন।

গত রমজানের ২৭ তম রজনীতে লাভলী নামের এক বয়স্ক কাজের লোককে বাড়ীর মালিক বিবস্ত্র করে তার এলাকায় ঘুরিয়েছে। বিষয়টিতে আম্মান শহরে কাজের মেয়েদের মধ্যে ব্যাপক হতাশার সৃষ্টি করেছে। মেয়েটি বাংলাদেশ দূতাবাসে বিষয়টি জানালেও বিচার তো দুরের কথা বরং তাকে এজেন্সি অফিসে পাঠিয়ে দিওয়া হয়েছে। এজেন্সি অফিসে তাঁকে মারধর করা ছাড়াও তাকে ধর্ষণ করে এবং পুনরায় আগের মালিকের বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

জর্ডানে প্রায় নয়মাস শীত থাকে। শীতে পানি দিয়ে কাজ করার সময় হাতে ঠান্ডা লাগে এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে হাড্ডির ভিতরে ইনফেকশন হয়। চিকিৎসা করাতে না পারলে এতে হাড্ডির ভিতর স্থায়ী ইনফেকশন শুরু হয়। বাড়ির মালিকরা কাজের মেয়েদের চিকিৎসা করায় না।

গত ফেব্রুয়ারি ২০১৩ মাসে এক কাজের মেয়ে এসব অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে আম্মান শহরের ব্যস্ততম রাস্তায় চলন্ত গাড়ীর নীচে ঝাপ দেওয়ার চেষ্টা করলে উপস্থিত লোকজন বিষয়টি টের পেয়ে যায়। উপস্থিত লোকজন মেয়েটিকে ট্যাক্সি ভাড়া করে বাংলাদেশ দূতাবাসে পাঠিয়ে দেয়। দূতাবাস থেকে কোন বিচার পাওয়া যায় নাই। বরং উল্টো কঠোর ধমকা-ধমকি করে এজেন্সি অফিসে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এ পর্যন্ত অনেক মেয়ে আত্মহত্যা করেছে বলে জানা যায়, তবে এদের সঠিক হিসাব নাই। বাংলাদেশ দূতাবাসের ভিতরেও প্রায়ই বিচার প্রার্থী নির্যাতিত কাজের মেয়েদের কাদঁতে দেখা যায়। নির্যাতিত/ক্ষতিগ্রস্ত এসব অসহায় কাজের মেয়েদের কান্নায় উপস্থিত লোকেরাও হতবাক হয়ে যান। কিন্তু টলে না দূতাবাসের লোকজনের মন।

কাজের মেয়েরা দেশে জমিজমা বিক্রি করে এবং অর্থ ধার করে জর্ডানে এসেছে। তাদের কথা, বিদেশে এসে মহা ভুল করেছি। এমন ভুল জীবনে হয় নাই। বুঝতে পারি নাই। বাংলাদেশে ফিরে যেতে চাইলে জর্ডানের ১৬০০ দিনার এজেন্সি অফিসে জরিমানা দিয়ে এবং নিজ থেকে বিমানের টিকেট দিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশ দূতাবাসের ভিতরে বা দূতাবাসের ব্যবস্থাপনায় অসহায় মেয়েদের একদিনও নিরাপদে থাকার ব্যবস্থা নাই। যেখানে ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কা ,ইন্দোনেশিয়া দূতাবাসে তাদের শ্রমিকদের দূতাবাসে রাখার জন্য সেইফ হাউজ করে রেখেছে। দূতাবাস থেকে এসব মেয়েদের আত্মীয়স্বজনকে ফোন পর্যন্ত করতে দেওয়া হয় না। কাজের মেয়েদের মাসিক বেতনের পরিমাণ ১৫০ মার্কিন ডলার, যা স্থানীয় মুদ্রায় জর্ডানিয়ান দিনার ১০৬ (একশত ছয়) মাত্র।

জর্ডান একটি টুরিস্ট কান্ট্রি। সারা বৎসরই এখানে টুরিস্টরা আসে। সারা জর্ডানে অনেক আবাসিক হোটেল রয়েছে। এসব আবাসিক হোটেলগুলিতেও অনেক মেয়েকে সরবরাহ করা হয়। আকাবা সমুদ্র বন্দরের আবাসিক হোটেলগুলিতে এর মাত্রা খুব বেশী।

ফেসবুকের ওই ব্যক্তি আরও লিখেছেন, জর্ডান, লেবানন এবং সিরিয়া শীত প্রধান দেশ। অক্টোবর মাস থেকে শীত শুরু হয় এবং মার্চ মাস পর্যন্ত প্রচণ্ড শীত থাকে। বাংলাদেশের নারী গৃহ শ্রমিকরা মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশগুলিতে গৃহকর্মীর কাজে আসা মোটেও নিরাপদ নয়। সকল নারী গৃহশ্রমিকরা এই বিষয়টি গভীর সর্তকতার সাথে চিন্তা করে দেখবেন।

নারী শ্রমিকরা জানান, দেশের আদম বেপারীরা সুন্দর সুন্দর কথা বলে তাদের নিয়ে আসে। গার্ডেনে কাজ দিবে। স্কুলে কাজ দিবে । বিউটি পার্লারে কাজ দিবে ইত্যাদি । কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিপরীত। বিষয়টি অত্যন্ত মর্মস্পর্শী , ভয়াবহ করুণ ও বেদনাদায়ক।

যখন কোন নারী গৃহশ্রমিক এসব বিপদে পড়েন, তখন তাদের না থাকে এখান থেকে বের হওয়ার পথ, না থাকে নিজেকে বাঁচানোর উপায়। তাছাড়া ভাষা একটা মারাত্মক সমস্যা। আরবী না বুঝতে পারায় সবচেয়ে বেশি নির্মমতার শিকার হন তারা, কোথাও পালিয়েও যেতে পারেন না একই কারণে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তখন আর কিছু করার থাকে না। এসব অবস্থার শিকার হয়ে বাংলাদেশে অনেক মেয়েদের সংসার নষ্ট হয়ে গেছে।

লেবাননেও বাংলাদেশী নারী গৃহ শ্রমিকরা ভয়াবহ দুর্দশায় রয়েছে। ধর্ষনের শিকারগ্রস্ত অনেক মেয়েদের বাচ্চা হওয়ার পর ডাষ্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়। বাচ্চাদের গায়ে কাপড়ের মধ্যে বাংলায় লেখা থাকে ”ইহা বাংলাদেশী বাচ্চা”। যদি কেহ নিয়ে পালতে চান; নিয়ে যেতে পারেন। নতুবা কুকুর ইঁদুরের খাবারে পরণিত হয়।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.