আদুরীর অন্যরকম বাড়ি ফেরা

Aduriউইমেন চ্যাপ্টার: ডাস্টবিন থেকে উদ্ধারের পর আদুরীকে যারাই দেখেছে, কেউ ভাবতেও পারেনি ও কোনদিন আবার উঠে দাঁড়াবে দু পায়ের ওপর, হাসবে, খেলবে। সেই কঙ্কালসার আদুরীই আজ সবার স্নেহধন্য আর সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদে নতুন জীবন পেয়েছে। নিজের বাড়িও পৌঁছেছে সে।

বৃহস্পতিবার সকালে লঞ্চে করে পটুয়াখালী সদর উপজেলায় পৌঁছানোর পর তাকে একনজর দেখতে ছুটে আসে সবাই। একটু ছুঁয়ে দেখতে চান সবাই। এই আদুরী ছবির বিছানার সাথে লেপ্টে থাকা আদুরী তো! কারও চোখ বিশ্বাস হতে চায় না। কিন্তু অমানুষের ভিড়ে মানুষ এখনও আছে বলেই আদুরীর মতো কিছু মানুষ এখনও বেঁচে যায়, আবার মনিরের মতো কিশোররা বাঁচতে পারে না সেই অমানুষদের কবলে পড়েই। আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে যায় কারও কারও জীবন।

হ্যাঁ, এই আদুরীকেই গৃহকর্ত্রীর নিষ্ঠুর নির্যাতন সইতে হয়েছিল। সবশেষে তাকে মৃত ভেবে ফেলে দেওয়া হয় ডাস্টবিনে।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে আদুরী (১১) ঢাকা থেকে পটুয়াখালী সদর উপজেলায় এসে পৌঁছালে লোকজন তাকে দেখার জন্য ভিড় জমান। বাড়িতে পৌঁছামাত্রই অনেকে আদুরীকে জড়িয়ে ধরেন। এলাকাবাসী ও স্বজনেরা সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। পাশাপাশি পুলিশ, চিকিৎসক ও সাংবাদিকদের ধন্যবাদ জানান। এ সময় অনেকেই নির্যাতনের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

আদুরীর বাড়ি পটুয়াখালী সদর উপজেলার জৈনকাঠি ইউনিয়নের কৌরখালী গ্রামে। পাঁচ বোন ও চার ভাইয়ের মধ্যে আদুরী সপ্তম। বাবা খালেক মৃধা বছর তিনেক আগে মারা গেছেন। অভাবের সংসারে অন্যের বাড়িতে কাজ করা ছাড়া উপায়ও ছিল না আদুরীর। এক বছর আগে এক প্রতিবেশীর আত্মীয়র হাত ধরে আদুরী আসে ঢাকায় কাজ করতে। কিন্তু সেখানেই তার ওপর নেমে আসে অকথ্য নির্যাতন।

এখনো সে ভালোভাবে কথা বলতে পারে না। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে, শিশুসুলভ আচরণও অনেকটাই উধাও।  মুখে গরম খুন্তির ছেঁকার ক্ষত এখনো শুকায়নি। মাথার আঘাতের জায়গায় এখনো ব্যথা আছে। চিকিৎসকরা তাকে ছেড়ে দেওয়ার সময় বলেছিলেন, ক্ষতগুলো এখন আস্তে আস্তে শুকিয়ে যাবে।

বাড়ি ফিরে আসতে পেরে, ভাইবোনদের কাছে পেয়েই খুশি আদুরী। লঞ্চঘাটে আদুরী বলে, ‘খুব ভালো লাগছে। ভাই আইছে, বুইন আইছে। এগো সাথে বাড়ি যামু। খুব ভালো লাগছে।’ আদুরীর খালা সাজেদা বেগম জানান, নির্যাতনের কথা মনে পড়লে এখনো আঁতকে উঠছে সে।

মা সাফিয়া বেগম বলেন, ‘ওরা আমার মাইয়াডারে এই রহম নির্যাতন করল ক্যান? যারা আমার মাইয়াডারে এত কষ্ট দিছে, হেগো বিচার চাই।’

জৈনকাঠি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. ফিরোজ আলম বলেন, মানুষ এতটা নিষ্ঠুর হতে পারে তা ভাবা যায় না। এ ধরনের জঘন্য কাজ যারা করেছে, তাদের কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত। পরিষদের পক্ষ থেকে আদুরীর পরিবারকে সহায়তা দেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।

এদিকে আদুরী মানুষের ভালবাসা ছাড়াও সাথে করে নিয়ে গেছে পাঁচটি রিকশার মালিকানা, কিছু অর্থসাহায্যও। ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার বেনজীর আহমেদ আদুরীর হাতে তুলে দেন পাঁচটি রিকশা। যাতে করে তার লেখাপড়াসহ ভবিষ্যত কিছুটা হলেও নিশ্চিত করা যায়।

গত ২৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর পল্লবীর ডিওএইচএস এলাকার একটি ডাস্টবিন থেকে মৃতপ্রায় আদুরীকে উদ্ধার করেন দুই নারী। পরে পুলিশের উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনায় পুলিশ ২৬ সেপ্টেম্বর পল্লবীর ১২ নম্বর সেকশনের বাসা থেকে ওই গৃহকর্ত্রী নওরীন জাহান ওরফে নদীকে এবং পরে তার মা ইশরাত জাহানকে আটক করে। আদুরীর মামা নজরুল চৌধুরী পরদিন নওরীনসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে পল্লবী থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.