একার জীবন কী দেশে, কী বিদেশে!

0
1454457_10152333534511124_1176337655_naa

ছবি: বার্থা ডি লা দেহসা

লীনা হক: বার্থা ডি লা দেহসা। বয়স ৩৫ বছর। স্পেনের মাদ্রিদের শহরতলীতে বাড়ি। বার্থার সাথে পরিচয় কম্বোডিয়াতে অফিসের একটি সেমিনারে যোগ দিতে গিয়ে। হন্ডুরাস থেকে আসা আমাদের সহকর্মী স্প্যানিশ স্পিকিং রিনালদোর জন্য দোভাষীর কাজ করবে সে এই সেমিনারে। নিকারাগুয়ান রিনালদো ইংরেজিতে সরগর নয় তেমন। খুব হাসিখুশি মেয়েটি সবার মন কেড়ে নিল প্রথম দিনেই। আমার সাথে তার একধরনের বন্ধুত্বই তৈরি হয়ে গেল বলতে গেলে। সেমিনারের পরেও আমরা একসাথে বাইরে বেরোতে লাগলাম, বাজারে, রেস্তোরায়, সাথে বার্থা। সেই সুবাদে বিভিন্ন কথাবার্তার ফাঁকে ফাঁকে ব্যক্তিগত আলাপচারিতা ।

জানা হলো অনেককিছুই। জীবনের খুঁটিনাটি, কোনটিই বাদ পড়েনি। মিলও খুঁজে পেলাম দুজনের অনেকক্ষেত্রেই। আসলে দু:খের রং পৃথিবীর সব প্রান্তে একই হয়, লড়াইয়ের ধরন আলাদা হলেও লড়াই ঠিকই চলে। গত একবছর থেকে সে থাকছে নমপেন শহরে। তার আগে সে থাকত সিয়েম রীপ প্রদেশের একটি গ্রামে । কম্বোডিয়াতে বার্থার বসবাসের প্রায় আড়াই বছর হতে চললো। স্পেনের প্রচন্ড অর্থনৈতিক মন্দার সময়টাতে চাকরি গেল বার্থার। ‘আর্ট থেরাপি’ তে পড়ালেখা শেষ করে বার্থা কাজ করছিল অভিনয়ের মাধ্যমে মানুষের মানসিক বিকাশ এবং রোগ নিরাময়ের বিষয়টিতে। পেটের ভাত জোটানোই যখন প্রথম এবং প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়ায় মানুষের জীবনে, তখন ‘আর্ট থেরাপি ‘ হয়ে যায় অবাস্তব বিষয়। চাকরি হারিয়ে বার্থা কিছুদিন টুকিটাকি এটা-সেটা করে চলতে চেষ্টা করলো। অন্য চাকরিও তেমন জুটছিলো না। মা-বাবাও চলেন সরকারি ভাতায়, মন্দার কারণে সেটাও পরিমাণে কমিয়ে দিল সরকার। তাছাড়া সে তো আর মা বাবার উপরে বোঝা হতে পারে না !

একটা আর্ট গ্যালারিতে বিপণন সহকারী হিসেবে কিছুদিন কাজ করলো, এই কাজটা যদিও তার পড়াশোনার বিষয় বস্তুর মধ্যেই ছিল, কিন্তু মাইনে হতো কত টাকার বিক্রি হলো তার উপরে, মন্দার কারণে স্বাভাবিক ভাবেই আর্ট গ্যালারির বিক্রি বাট্টাও তেমন হচ্ছিল না । বার্থার ভাষায় , আর্ট গ্যালারিতে ভিড় জমাচ্ছিল তার মতোনই বেকার মানুষজন এবং তা মোটেও শিল্প ক্রয়ের উদ্দেশ্যে নয়, বরং সময় কাটাতে !

বার্থা কিছুদিন চেষ্টা করলো পার্কে বা ট্রাফিক মোড়ে অভিনয়ের মাধ্যমে মানুষের মনোরঞ্জন করে আয় করার, সেটাও বার্থার ভাষায় ‘গাড়ি থেকে ছুঁড়ে বা পার্কে আসা লোকজন বার্থাকে তার অভিনয় দেখে যা দিতো, তার চেয়েও বেশি দিতো ভিক্ষুককে’ । অনেক সময় একটু রাত পর্যন্ত রাস্তায় বা পার্কে থাকলে লোকেরা তাকে তাদের সাথে রেস্তোরাতে, পানশালায় বা অন্য কোথাও যেতে বলত ! বার্থা বলে যায়, ‘খাবার কেনার পয়সার ব্যাপারে মানুষের টানাটানি থাকলেও, নারীমাংস কেনার পয়সা ঠিকই যোগাড় করে ফেলে ‘! একসময় বার্থা চলে গেলো জার্মানিতে কাজের সন্ধানে ।

কিন্তু ভাগ্যদেবী সুপ্রসন্ন নয় তথাপি। নিজের জমানো পয়সা প্রায় শেষ হতে চললো, কিন্তু ভালো কিছু সেখানেও জুটলো না । বার্থা শেষ পর্যন্ত ঠিক করলো ইউরোপের বাইরে চলে যাবে – এশিয়া বা ল্যাটিন আমেরিকাতে। এশিয়া তার প্রথম পছন্দ। খুঁজতে শুরু করলো চাকরি। ইন্টারনেটের মাধ্যমে কিন্তু মাস চারেক আরো চলে গেল কোনো সাড়া নাই কোথাও থেকে। প্রায় হতোদ্যম দিশেহারা বার্থা , হঠাতই খবর পেলো তার এক বন্ধুর বন্ধু মারিয়া আছে কম্বোডিয়া তে একটি আন্তর্জাতিক সংস্হার ভলান্টিয়ার হয়ে কাজ করছে। বন্ধুটির কাছ থেকে ইমেইল অ্যাড্রেস যোগাড় করে মেইল করলো মারিয়াকে । এক সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও কোনো উত্তর না পেয়ে ভাবলো কোনো আশা নাই। ১০ দিনের দিন সে পেলো মারিয়ার মেইল।

বার্থার মেইলটি যথা সময়ে পেয়েছে মারিয়া, কিন্তু নমপেনের বাইরে থাকাতে উত্তর দিতে দেরি হয়েছে । আরও জানালো , বার্থার জন্য একটা কাজ সে যোগাড় করতে পারবে একটি আন্তর্জাতিক সংস্হার ভলান্টিয়ার – প্রাইমারি স্কুলের বাচ্চাদের ইংরেজি শেখাতে হবে সিয়েম রীপ প্রদেশের একটি গ্রামে, বার্থা রাজি থাকলে যেন জানায় । ফিরতি মেইল পাঠালো বার্থা, কবে তাকে প্লেনে চড়তে হবে ? সৌভাগ্যজনকভাবে বার্থা ইংরেজি ভালই জানে আর তার একটি সার্টিফিকেটও আছে । ২০১১ সালের জুন মাসের বৃষ্টিমুখর এক সন্ধ্যায় বার্থা এসে নামলো নমপেন এয়ারপোর্টে, সাথে একটি সুটকেস আর একটি ব্যাকপ্যাক। পিছনে রেখে এলো পরিবার -মা-বাবা আর একটি ভাইকে।

আর রেখে এলো অসহনীয় মনোকষ্টের দুটি বছর- যা কিনা সময়ের হিসেবে মাত্র দুই বছর, কিন্তু বার্থার জীবনে তার প্রভাব দীর্ঘ । অর্থনৈতিক কষ্টের এই সময়টিতে বার্থার দীর্ঘদিনের প্রেমিক চলে যায় মেক্সিকোতে, সেখান থেকে সে পাড়ি জমায় আমেরিকাতে। সেই ছেলেটিরও চাকরি চলে গেছিল মন্দার প্রভাবে। বার্থাকে জানিয়েই চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সে। ছেলেটির সাথে যোগাযোগ ছিল অনেকদিন পর্যন্ত, পরে ছেলেটি একজন আমেরিকান নাগরিক স্পেনীয় মেয়ের স্বামী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমায়। বার্থার ভাষায়, দুইজন বেকার মানুষের ক্রমশ তিক্ত হতে চলা সম্পর্ক বয়ে বেড়ানোর চেয়ে এটাই ভালো হয়েছে।’ দিস ওয়াজ এন ইনফর্মড চয়েস বাই বোথ অফ আস ! পেইনফুল বাট রিলিভিং’ !

প্রাণোচ্ছল বার্থাকে মূহূর্তের জন্য আনমনা দেখায় । প্রায় দেড় বছর বার্থা থাকে কম্বোডিয়ার গ্রামে – প্রাইমারি স্কুলের ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে । বাচ্চাদের ইংরেজি শেখাতে শেখাতে খেমার ভাষাটাও ভালো মত রপ্ত হয়েছে তার । এটা তার উপরি পাওনা । বার্থা চলে আসে নমপেন – কম্বোডিয়ার রাজধানী । এখানে সে কাজ পেয়েছে আরেকটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় – এই কাজটি যদিও ফুল টাইম জব নয়, কিন্তু পয়সা দেয় ভালই । আর ফাঁকে ফাঁকে বার্থা দোভাষীর কাজ করে। নমপেন শহরের সব আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতেই বার্থা পরিচিত এবং তার ভাষা জ্ঞান – বিশেষ করে তিনটি ভাষায় (স্প্যানিশ, ইংরেজি আর খেমার ) ভালো দখলের কারণে দোভাষী হিসেবে বার্থার চাহিদা প্রচুর । আর দোভাষীর কাজটিকে সে ভালবাসে । কত জায়গায় যাওয়া যায়, কত মানুষের সাথে পরিচয় হয়, এনজিও দের কাজের সাথে পরিচিত হতে পারে। বার্থা জোরে জোরে হাসে “ইউ এনজিও পিপল আর সো ডিফারেন্ট ! সামটাইমস ক্রেজী টু , ইট সিমস !”

ভালো আছে সে। নমপেনে সে থাকে মারিয়ার সাথে একটি বাড়ির চিলেকোঠার দুটি রুমে । বাবা মায়ের সাথে কথা হয় নিয়মিত। আগামী সামারে সে যাবে মা বাবাকে দেখতে। তার কষ্টে জমানো সঞ্চয় থেকে মাকে ১ হাজার ডলার দিয়ে আসবে । খুব সহজভাবে সে জানায়, এখনো মনের মত কাউকে খুঁজে পায়নি সে, তবে বিয়ে করে সংসার পাতার তার বড়ই ইচ্ছে। আরও বলে, কম্বোডিয়া যদিও উন্নত দেশের মধ্যে পড়ে না, কিন্তু কখনো কোনো কম্বোডিয়ান সাধারণ মানুষ, কোনো পুরুষ তাকে কোনো কষ্ট দেয় নাই। এখন পর্যন্ত রাস্তা-ঘাটে সাইকেল চালিয়ে চলতে ফিরতে কেউ তাকে একা নারী হিসেবে কোনো কিছু বলে নাই ।

কিন্তু অনেক বড় বড় সংস্থার বিদেশী কর্মকর্তাদের দোভাষী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে অনেক ‘ইন্টারেস্টিং’ অভিজ্ঞতা হয়েছে তার । ইউ নো হোয়াট আই মিন’! হাসে বার্থা আমার দিকে তাকিয়ে, তার চোখের তারায় স্পষ্ট ভাসে একাকী নারীর কষ্ট ! সেই ছায়ায় প্রতিফলিত হয় পৃথিবীর সকল যুদ্ধরত একাকী নারীর ছায়া। বার্থাকে জানাই, আমাদের দেশেও একাকী নারীর জীবন যুদ্ধ সমান কষ্টের বরং অনেক ক্ষেত্রে আরো বেশী কষ্টের ! আসবে বাংলাদেশে সে – এসে আমার সাথে থাকবে কিছুদিন তবে কবে আসতে পারবে তা এখনো জানে না কিন্তু আমি যেন তার জন্য আমার বাড়িতে জায়গা রাখি । বলি তাকে , তোমার জন্য সবসময় জায়গা থাকবে আমার কাছে, বার্থা ।

বিদায় নেওয়ার সময় বার্থা জোরে জড়িয়ে ধরে আমাকে, বার্থার বুকের ধুক পুকানিতে নিজের হৃদপিণ্ডের প্রতিধ্বনি শুনতে পাই। আদিউস, বার্থা।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ২২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.