ছন্দপতন!

Hartal-Monirতানিয়া মোর্শেদ: গ্রাম থেকে ঢাকা শহর দেখতে আসা কভার্ড ভ্যান চালকের ছেলে পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র মনিরের আর ঢাকা দেখা হলো না। তার আগেই সে জীবনের চরম কুৎসিত চেহারাটি দেখে ফিরে গেল অজানা গন্তব্যে। হরতালকারীদের দেওয়া আগুনে দগ্ধ হয়ে তিনদিন পর বৃহস্পতিবার ভোরে সে মারা গেছে। তার শরীরের ৯৫ ভাগই পুড়ি গিয়েছিল। হয়তো মরে গিয়েই সে বেঁচে গেছে। নইলে সারাজীবন এই ক্ষত তাকে বয়ে বেড়াতে হতো যেমন শরীরে, তেমনি মনেও।

আর কত মানুষ এভাবে ঝরে পরবে? ককটেইল বিস্ফোরন, আগুন লাগানো, ভাংচুর, ইট ছোঁড়া, লাঠির আঘাত ……… আর কত আর কত? এর নাম কি রাজনীতি? এর নাম কি প্রতিবাদ? প্রতিবাদের নামে, হরতালের নামে তো অসংখ্য খুনীর জন্ম হয়ে চলেছে! টিভিতে দেখলাম একটি সি, এন, জি আসছে আর একজন আস্ত একটি ইট ছুঁড়ে মারলো ক্যামেরাপার্সনের পাশ থেকে! কাঁচ ভেঙ্গে ভেতরের মানুষের কি হলো তা কি সে একবারও ভাবে?

যেভাবে ধ্বংস, সন্ত্রাস করে টিভি ক্যামেরার সামনেই তাতে ইদানিং মনে হচ্ছে যে, এরা ইচ্ছে করে আরো বেশী করে এসব যেন টিভিতে তা দেখায়! আমার মনে হচ্ছে যে, টিভিতে এসব দেখানো কম করলে, বন্ধ করলে কিছুটা কমতে পারে। মুনীরের অন্তিম মুহূর্তে ছবি তুলছেন এক ক্যামেরাপার্সন! এই ছবি কার জন্য? এ দেখে কি কোনো সন্ত্রাসী, খুনী বদলে যাবে? না হরতালের রাজনীতি বন্ধ করবে রাজনৈতিক দলগুলো? আহত মানুষের, সড়ক দূর্ঘটনাই হোক আর সন্ত্রাস হোক, যে ভাবে ছবি তোলা হয়, দেখানো হয় তা কি কারো মনে প্রশ্ন জাগায় না?

সড়ক দুর্ঘটনার খবর মানেই মৃতদেহের ক্লোজ ছবি, আহত মানুষের ক্লোজ ছবি, এমনকি হাস্পাতালে ডাক্তার প্রাণপণে বাঁচানোর চেষ্টা করছে সেটারও ছবি তুলতে হবে, দেখাতে হবে? এসব দেখে কি সড়ক দুর্ঘটনা কমেছে? কেউ খুন হয়েছে, মৃতদেহের ছবি! কেন? মৃতদেহের প্রতি কি একটুও সম্মান দেখানো যায় না? এতে কি খুন বন্ধ হয়েছে?

বাংলাদেশে আমার জানামতে টিভি অনুষ্ঠানের (খবরসহ) কোনো রেইটিং নেই। শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ সব বয়সের মানুষ সব কিছু দেখেন! একবেলার খবর একটি শিশু দেখলেই তার মনোজগতে সাংঘাতিক প্রভাব পরতে পারে। এসব দেখিয়ে কি জনপ্রিয় হওয়া যায়? এর নাম কি সাংবাদিকতা? হলুদ জার্নালিজমের বিষয়ে কি কোনোই বিধি নিষেধ নেই? দিনের পর দিন এসব দেখে দেখে মানুষের সংবেদনশীলতা কমে যায়। তাই বাংলাদেশে বড় হওয়া একটি বাচ্চা আর অন্য দেশে বড় হওয়া বাচ্চার মধ্যে সংবেদনশীলতার অনেক তারতম্য। বাচ্চা কেন প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেই অনেক পার্থক্য ঘটে।

খবরে যদি এসব দেখেই ফেলি আমার মন চলে যায় অন্য জগতে। আজ রাতে ঘুম হবে কি না জানি না! এমনিতেই ঘুম ভেঙ্গে যায়। আর আজ ঘুম ভেঙ্গে মনিরের সারা শরীরে ব্যান্ডেজ জড়ানো, এই ছবি মনে হবে! মনে হবে, এরকম আর কত মুনীর ঝরে যাবে? আর কত নাম না জানা বালিকার ঝলসানো দেহ দেখতে হবে (ফেইসবুকে ছবি দেখেছি)? এ কেমন জাতিতে আমরা পরিণত হয়েছি, একদিকে মানুষ অন্য মানুষের অবহেলায়, অপরাধে, সন্ত্রাসে অকালে ঝরে যাচ্ছে কি মর্মান্তিক ভাবে আর অন্য দিকে সবাই যার যার নিজের জীবনের একটুও ছন্দপতন ঘটাচ্ছি না?

লেখক যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.