চরের জীবনে যৌবন পোড়ে বালুর তাপে

char-women-body
ছবি: সংগৃহীত

সালেহা ইয়াসমীন লাইলী: কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্রের মাঝে খেয়ার আলগা চরে প্রায় দুইশ পরিবারে শতাধিক স্বামী পরিত্যক্তা নারী। এই নারীদের স্বামীরা কাজের খোঁজে শহরে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। কারো কোলে ৩/৪ সন্তান, কারও বা বিয়ের মেহেদীর রঙ মোছার আগেই ছেড়ে দিয়েছে স্বামী। তাদের বয়সও ১৪ থেকে ৮০এর উর্ধ্বে।

স্বামীর জন্য অপেক্ষা করে করে তাদের যৌবন পোড়ে বালুর তাপে। মা-বাবার সংসারে সারা জীবনের বোঝা হয়ে বেঁচে থাকে তারা।

কুড়িগ্রামের যাত্রাপুর ইউনিয়ের খেয়ার আলগা চর জেগে উঠেছে প্রায় ছয় বছর আগে। এই চরে বসতি গড়লেও নিষ্প্রাণ ধূসর বালিতে সবুজের ছোঁয়া লাগেনি তেমন। কর্মসংস্থানের কোন সুযোগ না থাকায় বছরের অধিকাংশ সময় এই চরের পুরুষ সদস্যরা দেশের বিভিন্ন শহরে ছোটে কাজের খোঁজে। পরিবার পরিজন ছেড়ে দূরদেশে থাকা এই পুরুষরা বেশীর ভাগ আর ফিরে আসে না ঘরে। অনেকে আবার বিয়ে করে সংসার পাতে শহরে।

আর তাদের ঘরের এই নারীরা  স্বামীর প্রতীক্ষা করে করে কাটিয়ে দেয় পুরোটা জীবন।

এই চরে গিয়ে দেখা যায়, একই সংসারে তিন বোন স্বামী পরিত্যক্তা। তাদের মধ্যে বড় আকলিমা (৩৫), তারপরের জন মুন্নি (৩০)। দুই বোনের কোলে সন্তান। ছোট বোন বিউটি (১৮) তো স্বামীর সংসার দেখার সুযোগই পায়নি। তার আগেই স্বামী দেশান্তর হয়েছেন।

মায়ের সংসারে মেয়েরা সরকারি -বেসরকারি সহায়তা ও এনজিও গুলোর কর্মসূচির সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পেট চালান। কিন্তু স্বামীদের জন্য তাদের অপেক্ষা শেষ হয় না কোনদিন। শিশু বয়স থেকে মাকেও দেখেছে একইভাবে নিখোঁজ বাবার জন্য অপেক্ষা করতে। যদিও তিনি ফিরে আসেন নাই । তবুও মায়ের অপেক্ষা অন্তহীন।

শাহিদার (১৮) বিয়ে হয়েছে ছয় মাস হলো। বিয়ের পরদিন থেকেই স্বামীর দেখা নাই। কোথায় আছে কেউ জানে না। মোসলেমা (২২) যখন গর্ভবতী, তখন তার স্বামী তাকে ফেলে চলে গেছে। পেটের সন্তান মাসুদ আলম বাবা ডাকতে পারেনি আজো। নুরনাহার (৪০), ছামিরন (৫৫), জরিনা (৪৮), জামেনার (৫০)  মতো কয়েক শ নারী স্বামী হারা।

এই চরের কুদ্দুস আলী জানান, আমরা মেয়েদের একবার বিয়ে দেই কুমারীত্ব ঘুচানোর জন্য। স্বামী ছেড়ে চলে গেলে দ্বিতীয়বার আর বিয়ে দেওয়া হয় না। তারাও এটা ভাগ্য বলে মেনে নেয়।

আরেক চরবাসী মনছের আলী বলেন, অভাবের কারণে আমরা মেয়েদের শিশু বয়সেই বিয়ে দেই।কিন্তু স্বামী ২/৩ টা সন্তানসহ ছেড়ে গেলে আবারও নিজের ঘরেই জায়গা দেই।

মুন্নি বেগম বলছিলেন, ‘নয় বছর আগে স্বামী ছেড়ে চলে গেছে। আত্মীয়-স্বজনদের দিয়ে শহরে অনেক খুঁজেছি, পাইনি। মরে গেছে, না বেঁচে আছে, তাও জানিনা। আবার বিয়ে করব তো কাকে? সেও যে এমন করবে না তার কোন ভরসা আছে? স্বামীর ছেড়ে যাওয়া সন্তানের মতো আমরা যৌবনকেও আগলে রাখি’।

খেয়ার আলগা চরে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন উন্নয়ন কর্মী শ্যামলী রানী। তিনি জানান, সরকারী-বেসরকারী সংস্থাগুলো চরে কাজ করায় চরের নারীরা গরু-ছাগল-হাঁস-মুরগী পালন করে স্বাবলম্বী হচ্ছে। কিন্তু অন্য কোন কর্মসংস্থান না থাকায় বাধ্য হয়ে পুরুষরা ঘর-বাড়ি ছাড়ে। এই ছেড়ে যাওয়া কখনও কখনও হয় চিরদিনের মতোন।

যাত্রাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গফুর আলী জানান, এটা একটা সামাজিক সমস্যায় রূপ নিয়েছে। বার বার নদী ভাঙ্গনে মাটির সাথে যেমন এই মানুষগুলোর মমতা দৃঢ় হয় না, তেমনি দারিদ্র্যের কারণে বাড়ি ঘর ছাড়তে ছাড়তে পরিবারের সাথেও বিছিন্নতা তৈরি হয়। যার শিকার হয় নারীরাই।

প্রতিবছর নদী ভাঙ্গনে এই চরগুলোর মানচিত্রের বদল হয়। বদল হয় না মানুষগুলোর ভাগ্য। একপাশে ভাঙ্গে তো অন্য পাশে তখন জেগে ওঠে চরা। নিজেদের আশ্রয়ের ঘরটি নিয়ে বার বার তাদের ছুটতে হয় এদিক-সেদিক।

 জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নদীগুলোর ভাঙ্গনের ধরনেরও পরিবর্তন ঘটছে দ্রুত। জেগে ওঠা চরগুলো চাষাবাদযোগ্য হওয়ার জন্য ৭/৮ বছর সময় লাগে। কিন্তু এখন আর কোন চর এমন স্থায়ীত্ব পায় না। যার প্রভাব নানাভাবে পড়ছে চরের মানুষের জীবনে। নদীর পাড় ভাঙ্গা শব্দে ভাঙ্গে তাদের মনের পাড়। শুধু আশার দেয়ালে চিড় ধরাতে পারে না । তেমন আশা থেকে তারা আবার তাদের কন্যাদের বিয়ে দেয়, তাদের স্বামীদেরও কাজের জন্য, জীবিকার জন্য যেতে দেয় শহরে। যদিও তারা জানে চরের অধিকাংশ নারীই আর ফিরে পায়নি তাদের স্বামীদের। তবুও পেটের দায় মেটাতে তারা মেনে নেয় এমেই নিয়তি।

 লেখক, সাংবাদিক

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.