আর কত হামলা-নির্যাতন হলে দেশ ছাড়বে ‘সংখ্যালঘুরা’?

Pabna, Santhiyaসুমন্দভাষিণী: সবশেষ খবর হচ্ছে, পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার বনগ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের বাড়িঘরে হামলা, লুটপাট ও আগুন দেওয়ার ঘটনায় পরিস্থিতি এখন থমথমে। লোকজন আতংকগ্রস্ত হয়ে দিন কাটাচ্ছেন। অনেকেই এলাকা ছেড়ে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে চলে গেছেন। হামলার ঘটনায় স্থানীয় একজন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বাদী হয়ে ২০ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ২৫০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। পুলিশ এ ঘটনার সাথে জড়িত থাকার সন্দেহে রেজাউল করিম নামের একজন গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশের দাবি, রেজাউল বিএনপির একজন কর্মী।

কক্সবাজারের রামুর ঘটনার মতোই ফেসবুকের একটি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই হামলা চালানো হয়। এমনও শোনা যাচ্ছে, এই হামলার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে দুদিন ধরে। সমাবেশ করা হয়, সেই সমাবেশ থেকে হামলার ডাক আসে, সেই ডাকে সাড়া দিয়ে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরীহ মানুষের ওপর। প্রশাসন কি ঘুমিয়ে ছিল? প্রশাসন কি ঘূণাক্ষরেও বুঝতে পারে নাই এমন একটি হামলা হতে পারে?

সাঁথিয়ার এ ঘটনায় বেশ কয়েকজন জোরালো প্রতিবাদ জানিয়েছেন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে। তারা বলছেন, ফেসবুকে মহানবীকে (সা.) কটূক্তি করার অভিযোগ একটা অজুহাত মাত্র। যেমনটি হয়েছিল রামুর ঘটনাতেও। আসলে দেশের হিন্দু তথা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে বাস্তুচ্যুত, দেশচ্যুত করাই মূল লক্ষ্য। এর আগেও বিভিন্ন ঘটনার কোন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় এ ধরনের হামলা তো বন্ধ হচ্ছেই না, বরং বেড়েই চলেছে। তবে অনেকেই বলেছেন, দেশে যে রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি চলছে, তারই সুযোগ নিয়ে কেউ যেন ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে না পারে, সেদিকে সজাগ থাকতে হবে।

মানবাধিকার কর্মী শিপ্রা বোস তার স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘সাঁথিয়ায়  হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ, তাঁদের বাড়ীঘর, উপাসনালয় ধ্বংস করা, তাঁদের মর্যাদা বোধ ও নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করা, নিরাপত্তা বোধ ছিনিয়ে নেয়া কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দেশে বিরাজমান গণবিরোধী, সাম্প্রদায়িক, বৈষম্যপূর্ণ রাজনীতিরই এক বহিঃপ্রকাশ এই আক্রমণ। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে দেশের ক্ষমতালিপ্সু রাজনৈতিক শক্তি/গোষ্ঠী ও সংগঠন অন্যান্য অগণতান্ত্রিক ও ন্যাকারজনক কৌশলের সাথে সাথে হিন্দু, বৌদ্ধ, আদিবাসীদের ওপর আক্রমণকেও একটি কৌশল হিসেবে ব্যাবহার করে আসছে’।

তিনি আরও লিখেছেন, ‘গত ২রা নভেম্বরে সাঁথিয়ায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, দু’মাস আগে চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা, মার্চ মাসে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, সেপ্টেম্বর ২০১২-তে রামুর বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা এসবই হয় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত অথবা রাজনৈতিক শক্তির ছত্র ছায়ায় থেকে পরিকল্পিতভাবে দুর্বৃত্তদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে সংঘটিত হয়। এমন ঘটনা ২০১২ সালের পূর্বেও ঘটেছে কিন্তু এর প্রতিকার হয়নি। এর প্রতিকারে বিশেষ কোন রাজনৈতিক উদ্যোগ বা পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে ঘটনার কেবল পুনরাবৃত্তিই ঘটছে ঘুরে ফিরে। যার সর্বশেষ দৃষ্টান্ত হচ্ছে সাঁথিয়া’।

প্রামাণ্য চিত্র নির্মাতা ও লেখক জাহানারা নূরী লিখেছেন, ‘কিভাবে রামুর ঘটনা পুনরায় ঘটে? যদি শতকরা আট ভাগ সনাতন ধর্মাবলম্বী হন আর ৭০ থেকে চুয়াত্তর ভাগ মুসলিম…অন্য জাতির কথা নাই তুললাম….কিভাবে প্রতিবেশী সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বাড়ি লুট করতে পারে কেউ, কিভাবে? ধিক্কার আমার মতো মুসলমানকে, যার প্রতিবেশির সহায় সম্পদ ও জীবন রক্ষা পায় না তার হাতে….ধিক্কার সেই এলাকাবাসীর যাদের এলাকায় সন্ত্রাসীরা দাপটে মাটি কাঁপায় আর সংখ্যায় কম বলে দেশবাসীর একাংশের প্রাণ সম্মান বাঁচানোর ন্যূনতম উদ্যোগ নিয়ে এলাকাবাসী এগিয়ে আসে না…’।

পরিমল মজুমদার বেশ ক্ষোভের সাথেই লিখেছেন, ‘সংখ্যালঘুদের উপর যত নির্যাতন হবে, আওয়ামী লীগের ভোট তত বাড়বে -দলটি বোধ হয় এই হিসাবে বিশ্বাস করে। পাবনায় যখন হিন্দুদের উপর আক্রমণ হলো, লুট করা হলো সম্পদ, যখন একাত্তরের মত মন্দির আর বাড়িতে আগুন দিলো জামাত বিএপির কর্মী সমর্থকরা, তখন ঘটনাস্থল থেকে ১০ কি.মি দূরে মাদ্রাসা উদ্বোধন করছিলেন
আমাদের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী টুকু সাহেব। এক বান্ডিল টিন আর ১০ কেজি সরকারি খয়রাতি চাল দিয়ে হিন্দুদের বুকের ক্ষতে মলম দেওয়ার অপচেষ্টা হলো…’।

আরেকজন লিখেছেন, ‘অদ্ভুত একটা দেশ, আর অদ্ভুত আমরা মানুষ। কী মিল আমাদের বাইরে বাইরে….অথচ ধর্মের প্রশ্নে ততোটাই অমিল। …সময়-সুযোগ পেলে আমার যারা কাছের বন্ধু, তারাও হয়তো আমাকে এমনিভাবে লাথি মারবে, বিশ্বাস কোথায়? হয়তো বলবে, ‘যা তোর বাপ-দাদার দেশে, যা’। কিন্তু আমার বাপ-দাদা এবং সাঁথিয়ার ওই মানুষগুলো বা দেশের বিভিন্ন স্থানের নিপীড়িত ‘তথাকথিত সংখ্যায় লঘুদের’ বাপ-দাদারাও যে এই দেশেরই, সেই কথাটা বলারও তো সময় পাওয়া যায় না, দেয় না ওরা। আর বলতে হবেই বা কেন?
…তোমরা যারা আছো ‘সংখ্যায় গুরু’, তোমরা কি বলো কখনও? নাকি বলতে হয় তোমার বাপ-দাদার বাড়ির ঠিকানা’?

এদিকে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর এ ধরনের হামলার ঘটনায় রোববার দুপুরে প্রশাসনের উদ্যোগে এলাকায় শান্তি সমাবেশ করা হয়। প্রশাসন বলছে, শান্তি সমাবেশের পর সব ‘শান্ত’ হয়ে গেছে, সবাই আবার যার যার জায়গায় ‘শান্তিপূর্ণ’ সহাবস্থান করছেন। তাই কি হয় কখনও? ক্ষত সৃষ্টি করে সেখানে মলম লাগিয়ে তো সাময়িক উপশম হয়তো করা যায়, কিন্তু ক্ষত’র দাগ কি মুছা যায়?

দৈনিক সমকালের এক প্রতিবেদনে প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, ‘ঘটনার আগের দিন শুক্রবার সকালে রসুলপুর, মিয়াপুর, বহালবাড়িয়া, পূর্বপাড়া, পাইকপাড়া, বনগ্রাম, চইরাপাড়া গ্রামের জাকির হোসেন, দেলোয়ার হোসেন মানিক, খোকন, ফজলু-১, পূর্বপাড়ার ফজলু ও মান্নানের নেতৃত্বে যুবলীগ, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামির সমর্থক অন্তত ১২ জন যুবক একজোট হয়ে কথিত ফেসবুকের কপি প্রিন্ট করে জনৈক বাবলু সাহার বাড়িতে চড়াও হয়। এসময় বাবলুর ছেলে রাজীব ফেসবুকে মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে কটূক্তি করেছে বলে তারা অভিযোগ করে এবং রাজীবকে তাদের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানায়।

সমকালের ওই রিপোর্টে আরও বলা হয়, পরদিন শনিবার দুপুর ১২টায় বনগ্রাম বাজারে সমাবেশ আহ্বান করা হয়। এতে সাড়া দিয়ে এলাকার শত শত মানুষ পাবনা-নগরবাড়ী মহাসড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে রাস্তা অবরোধ করে। এসময় সন্ত্রাসীরা বাবলু সাহার বাড়ি, সুকুমার মাস্টার, বাঁশী রাজবংশী, সুরজিৎ সাহা, অনিল সরকার, সুভাষ সাহা, উত্তম কুমার, শিখা রানী সরকার, গোপাল সাহা, আনন্দমোহন, কালা সাহা, নরেশ বিশ্বাস, রাজকুমার বিশ্বাস, হরিপদ সাহাসহ প্রায় ৩০জনের বাড়িতে হামলা চালায় ও  ব্যাপক লুটপাট করে। দুর্বৃত্তরা বাবলু সাহার বাড়ি ও মন্দিরে অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর এবং লুটপাট চালায়।‘

বাবলু কুমার সাহা জানান, তিনি নিজে লেখাপড়া জানেন না। বনগ্রাম বাজারে তার দোকান রয়েছে। ছেলে রাজীব সাহা মিয়াপুর জসিম উদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণীর ছাত্র। তার ব্যক্তিগত কম্পিউটার নেই। ফেসবুক সম্পর্কে তার কোনো ধারণা নেই।

এলাকাবাসী কয়েকজন জানান, এটি এখন রাজনৈতিক আবরণ দেওয়া হচ্ছে। ঘটনার নেতৃত্ব যারা দিয়েছে, তারা কেউ বিএনপি-জামায়াত করে, আবার কেউ আওয়ামী লীগ করে। সবাই মিলে এ হামলা চালিয়েছে।

পুলিশ বলছে, পরিস্থিতি এখন শান্ত রয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারপ্রতি ১০ কেজি চাল, নগদ পাঁচ হাজার টাকা এবং ঢেউটিন দেওয়া হয়েছে।

এদিকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশে নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টায় বিএনপি-জামায়াত জোটবদ্ধ হয়ে এ হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, এ ঘটনা সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক এবং স্থানীয় বিষয়। নেতৃত্বদানকারী সবাই আওয়ামী ও যুবলীগের কর্মী বলেও বিএনপি জানায়।

এ ঘটনার প্রতিবাদে রোববার ঢাকার শাহবাগেও অনুষ্ঠিত হয় বিক্ষোভ সমাবেশ। সেই সমাবেশ থেকে এসব সাম্প্রদায়িক হামলার বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের দাবি জানান বক্তারা। তারা বলেন, ১৯৭১ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত দেশে সংখ্যালঘুদের সংখ্যা হিসাব করলেই স্পষ্ট হয়ে উঠে, আজতক কোন সরকারই তাদের কথা, তাদের নিরাপত্তার কথা আমলে নেয়নি। কোন সরকারই তাদের ‘পূর্ণ নাগরিকের’ মর্যাদা দেয়নি।

ফলে দেশান্তরি হচ্ছে মানুষ, কাঁটাতারের বেড়া প্রতিদিন পার হচ্ছে কিছু মানুষ, শুধুমাত্র বেঁচে থাকার আশায়। হয়তো স্বাধীন মানুষ হিসেবে নয়, পরগাছা হয়েও তাদের বেঁচে থাকার নিরন্তর ইচ্ছে থেকেই কেবল এই দেশান্তর।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.