আমরা যারা একলা থাকি – ৩

imp 1উইমেন চ্যাপ্টার: ‘আপনার পুরুষ গার্জিয়ান কে নিয়ে আসেন ‘, ‘আপনার স্বামী কোথায় ? এই দুটো সংলাপ অবধারিতভাবে শুনতে হয় আমরা যারা একলা নারী, এবং বাড়ী ভাড়া করে থাকি, তাদের । উত্তর যদি ‘পছন্দসই’ না হয়, তবে কেউ কেউ সরাসরিই বলে দেন, ‘না, একা মহিলাদের বাড়িভাড়া দেই না’, অথবা কেউ কেউ চোখের পর্দা একদম ছিঁড়ে ফেলতে পারেননি বলে বলেন, ‘আচ্ছা পরে জানাচ্ছি, আর কোনদিন জানান না বা ভদ্রতার পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে বলেন, আসলে অন্য ভাড়াটের সাথে আগেই কথা হয়ে গিয়েছে’ ।

বেশিরভাগ বাড়ির মালিক ‘একলা থাকি’ শোনার সাথে সাথে এমনভাবে তাকাবে যেন ‘জেল খাটা দাগী আসামী’। তবে এরকম ঘটনা যে শুধু এক নারীর বেলায়ই হয়, তা নয়, ছেলেদেরও একইরকম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। ব্যাচেলর বলে কোনো ভালো বাড়ি তারা পান না, একদিন একজন দুঃখ করে বলেছিল, ব্যাচেলর ছেলে বাড়ি ভাড়া নিতে চায় শুনেই বাড়িওয়ালা তেরছা চোখে তাকায় যেন ‘রেপ কেসের আসামী’ দেখছে। তবে এমন ও অনেক বাড়ি অলা আছেন যে, যাঁরা এইসব নিয়ে অপ্রাসঙ্গিক কথা জিজ্ঞেস করেন না।

মেয়েদের ম্যারিটাল স্ট্যাটাস এই উপমহাদেশে যে দৃষ্টিতে দেখা হয় আর কোথাও সেইভাবে দেখা হয় কিনা জানা নেই। অল্প কিছুদিন আগে আমাদের একজন নেপালী সহকর্মী এসেছেন বাংলাদেশে, অত্যন্ত প্রফেশনাল আর চমৎকার একজন মানুষ – এক পর্যায়ে জানতে চাইলেন স্বামী-সন্তানের কথা – ম্যারিটাল স্ট্যাটাস জানার সাথে সাথে বললেন ‘ সরি’! আমি বুঝেই পেলাম না – একজন মানুষ যদি ডিভোর্সড হয়, তাহলে ব্যাপারটা অন্যের জন্য দুঃখজনক কেন!

বেশ কয়েক বছর আগে অফিসের কাজে দেশের বাইরে গেছি, আছি হোটেলে, আরও কয়েক দেশের সহকর্মীরা আছেন। রমজান মাস, আমাদের গ্রুপে মুসলমান তিনজন, একজন পাকিস্তানী পুরুষ একজন মরোক্কান ডেনিশ নারী আর আমি বাংলাদেশী। হোটেল কর্তৃপক্ষ জানালো, মুসলিমদের সেহরির ব্যবস্থা আছে। ডেনিশ সহকর্মী রোজা রাখছিলেন না। পাকিস্তানি সহকর্মী যিনি আমার সিনিয়র, স্বপ্রণোদিত হয়ে জানালেন – সেহরি খাওয়ার জন্য আমরা আর নিচে ডাইনিং হলে নামব না, আমাদের খাবারটা যেন হয় উনার রুমে একইসাথে পরিবেশন করা হয়। আমি রাগ হবো, না কাঁদবো, না হাসবো ভেবেই পেলাম না , শুধু এইটুকুই বলতে পারলাম ‘আমি সেহরি খাবো না’।

কিছুদিন ছিলাম শ্রীলঙ্কায় – কর্মসূত্রে। আমার লাইন ম্যানেজার দাওয়াত দিলেন বাসায়, ডিনারের দাওয়াত। জানালেন , আমাকে একাই বলেছেন কারণ আরও সবাইকে পরে আবার ডাকবেন, যেহেতু আমি একা থাকি, উনাদের সাথে খেতে এলে আমার ভালো লাগবে । খুব খুশী আমি, কারণ উনারা ভারতীয়। উনার স্ত্রী সবজি-ডাল যা রান্না করেন, হাত চেটে খেতে হয় । দু একবার অফিসের গ্যাদারিং এ খেয়েছি । ভাবলাম ‘ভাবী’র কাছ থেকে আজ একটু চেয়েও নিয়ে আসবো । বসকে হেসে জানালাম সেই কথা ! মাথায় বজ্রাঘাত আমার ! জানলাম ভাবি দেশে গেছেন, বস স্বয়ং আমাকে বার-বি-কিউ করে খাওয়াবেন ! বিশ্বাস করুন, আর সেই দাওয়াত রক্ষা করতে পারলাম না ।

অফিসের কাজে কিছুদিন ধরে থাকছি কাঠমান্ডুতে। হঠাৎ প্রচন্ড জ্বর আর পেট ব্যথা । কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পারছি না । গেলাম হাসপাতালে। ডাক্তার থেকে শুরু করে নার্স, টেকনিশিয়ান সবাই বাংলা বলছে আমার সাথে- সবাই বাংলাদেশের বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাশ করেছে। অসুখের মধ্যেও আমার মনটা ভালো হয়ে গেল। অত্যন্ত নামকরা বিশেষজ্ঞ ডাক্তার যিনি সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল থেকে পড়ে গেছেন আমার ফাইল পত্র দেখলেন, কি কাজ করি, কোথায় থাকি, সাথে কে কে থাকে জানলেন, একা থাকি জেনে বললেন, এত জ্বর নিয়ে একা বাড়িতে না থেকে হাসপাতালে থাকাই ভালো । চিকিৎসা করলেন বড়ই যত্ন করে । নরমাল নিয়মে ভর্তি হওয়া রোগীদের রাউন্ডের সময় একবার দেখেন, আমাকে দিনে দুইবার দেখলেন, আমি মুগ্ধ। উনার সাথে বাংলাতেই কথাবার্তা হতো। হাসপাতাল থেকে রিলিজ নেওয়ার দিন ডাক্তার সাহেব তার ব্যক্তিগত সেল ফোনের নম্বর দিয়ে বললেন, যেকোনো সময় দরকারে ফোন করতে। আমি অভিভূত। এমন দরদী চিকিৎসক। তারপরে শুরু হলো কাহিনী । টেক্সট মেসেজের স্রোত – বিষয়বস্তু একটাই – একলা নারীর একাকীত্ব দূর করতে চান উনি।

চর্যাপদের সেই ‘আপনা মাংসে হরিণা বৈরী ‘- প্রতিপদে মনে পড়িয়ে দেয় – তুমি একাকী নারী – তোমার বিদ্যা , তোমার মেধা , মনন , সাহস কোনকিছুতেই কিছু এসে যায় না , শেষাবধি তুমি একাকী নারী – তুমি ভক্ষণযোগ্য মাংসপিণ্ড। পাহারাদার পুরুষ না থাকলে অন্যে যদি নজর দেয়, তাতে তো তাদের কোনো দোষ নাই ! তাছাড়া পুরুষের একটু-আধটু ‘দোষ তো থাকতেই পারে! প্রশ্ন একটাই, তুমি কেন একলা থাকো!

আমার বন্ধু বলছিলো – কেন এমন হয় ! আমিও জানি না কেন এমন হয়! কেউ কি জানে কেন এমন হয়!

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.