পরাজয় মানে না যে জাতি, জয় তাদের সুনিশ্চিত

rmg
‘অপরাজেয়’তে কাজ করছেন রানা প্লাজায় ক্ষতিগ্রস্ত নারী শ্রমিকরা
ছবি কৃতজ্ঞতা: কাজী তাহসিন আগাজ অপূর্ব

সুপ্রীতি ধর:

“মেঘ দেখে কেউ করিস না ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে”- এমনই এক সূর্যের দেখা পেল রানা প্লাজার ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কিছু শ্রমিক। “অপরাজেয়”- নামের একটি ছোট পরিসরের ব্যাগ কারখানা তাদের মনে এনে দিয়েছে একটি বড় পরিবর্তনের স্বপ্ন। একটি হার না মানার গল্প। আসুন তবে দেখি হার না মানার গল্পটির কিছু অংশ।

অপরাজেয় নামটা তখনও দেওয়া হয়নি। একটি ছোট্ট ঘরে কিছু সেলাই মেশিন বিক্ষিপ্তভাবে ছড়ানো তখনও। রানা প্লাজা ধসের পর বিদেশি সাংবাদিকরাও আসছেন খবর নিতে। তাদের একজনের সাথে যাওয়া হয় দুর্ঘটনার ঠিক একমাস পর। সেই তখনকার দৃশ্য আর মাস ছয়েক পরের দৃশ্যে ফারাক অনেক, কেবল বাহ্যিক ফারাক নয়, মানসিক, সামাজিকও। সেই ছোট্ট ঘরটিতেই এখন মেশিনের শব্দ, তৈরি হচ্ছে নতুন ধরনের পণ্য, স্বপ্ন গড়ে উঠছে নতুন ভবিষ্যতের। বাঙালী যে মাথানত করে না, তারই আরেক নাম ‘অপরাজেয়’। নিজে যে পরাজয় মানে না, তাকে পরাজিত করা কি এতোই সহজ?

রানা প্লাজার ভয়াবহ দুর্যোগের সময় যেমনটা সহায়তার জোয়ার ছিল, তেমনি ছিল সহায়তা ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের কাছে না পৌঁছানোর ‘সিস্টেম লস’ও। এজন্য অনেকেই লাখ লাখ টাকার সহায়তা পেলেও ‘কিছুই পাননি’ অনেকেই। শারীরিক দৃশ্যমান বড় ক্ষতি দেখে সহায়তা দেওয়ার ভয়াবহ প্রবণতা ছিলো তখন। অবশ্য কিছু করারও ছিল না। এই দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক শ্রেণীর অসাধু লোকেরা ভরেছে নিজের পেট। অসুস্থ সেজে এসেছে সহায়তা নিতে। এমনকি লাশ দেখিয়ে পয়সা খাওয়ার নজিরও কম ছিল না। এমন খবরও তো মিলেছে যে, নিজের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে লাশ নিয়ে গেছে শুধুমাত্র কিছু টাকার জন্য। একারণে অনেক প্রকৃত মা-বাবাও পাননি তাদের সন্তানের লাশটুকুও।

এসবের মাঝে যখন বাহ্যিকভাবে অল্প ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকরা সহায়তার জন্য আসতো, তখন তাদের সন্দেহের চোখেই দেখা হতো। প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রায়ই মিলতো না তাদের। যেন হাত-পা না কাটা যাওয়ার দায়ভার ওই শ্রমিকেরই!

ঠিক এমন একটা সময়ই যারা দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকাজে দিনরাত সজাগ ছিলেন, তাদেরই কয়েকজনের মাথায় একটি পরিকল্পনা আসে। অল্প-বিস্তর ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের পাশে দাঁড়ানোই কেবল নয়, এদের দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা কি করে দেওয়া যায়, সেই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় ‘অপরাজেয়’ নামের একটি কারখানার।

sami & rintu
‘অপরাজেয়’ দু’জন মূল স্বপ্নদ্রষ্টা
বাঁ থেকে, সামি আল ইসলাম এবং কাজী মনির হোসেন রিন্টু

রানা প্লাজার ধসের পর ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের সহায়তাই এর মূল উদ্দেশ্য। নিয়োগের ক্ষেত্রে তারা অপেক্ষাকৃত কম শারিরীকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের নিয়েছেন। দিনের পর দিন পরিশ্রমেও ক্লান্তি দেখা যায়নি এর উদ্যোক্তাদের একজন কাজী মনির হোসেন রিন্টুর মাঝে। প্রতিদিন ঢাকা থেকে সাভার গিয়ে কুলোচ্ছিল না, অবশেষে একটি রুম ভাড়া নেওয়া হয় অস্থায়ীভাবে থাকার জন্য। শ্রমিকদের মাঝে পড়ে থেকেই তাদের কষ্টটা লাঘবে নিজেকে সম্পূর্ণ ঢেলে দেন তিনি।

রিন্টু জানান, আমরা যেদিন শুরু করি সেদিন ৪০০-৫০০ শ্রমিক কাজের জন্য আসে। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম অপেক্ষাকৃত কম অভিজ্ঞ ও অন্য কোথাও কাজ খুঁজতে অনিচ্ছুকদের নেবো। কারণ আমরা জানতে পেরেছিলাম রানা প্লাজায় যাদের অঙ্গহানি হয়েছে তারাই মূলত বেশি সহায়তা পেয়েছে। কিন্তু সেই অর্থে সহায়তা পায়নি কম ক্ষতিগ্রস্তরা।

তেমনই একজন নীলুফা ইয়াসমিন। রানা প্লাজা ধসে নীলুফা মাথা ও কোমরে মারাত্মক আঘাত পান। তিনি এখন ভারি কিছু তুলতে পারেননা। তিনি জানান, তিনি সরকার থেকে কোন ক্ষতিপূরণ পাননি এবং তার চিকিৎসা খরচ নিজেকেই বহন করতে হয়েছে।

অপরাজেয় এর সহায়তায় তিনি এখন নিজের দুই সন্তানসহ মা বাবাকে নিয়ে ভালোভাবে দিন কাটাচ্ছেন।

নীলুফার ভাষায়, ‘আমি অপরাজেয়’র খোঁজ পাই রানা প্লাজা ট্রেড ইউনিয়নের মাধ্যমে। অপরাজেয় আমার সমস্ত চিকিৎসা খরচ বহন করেছে এবং আমাকে আবার স্বাবলম্বী করে তুলেছে। এখন আমার পরিবার নিয়ে আমাকে আর দুশ্চিন্তা করতে হয়না’।

একদিন ভরদুপুরে অপরাজেয় অফিসে বসেই কথা হচ্ছিল কয়েকজন নারী শ্রমিকদের সাথে। তাদের চপল-চঞ্চল-প্রাণবন্ত-হাসি-খুশি মন আশান্বিত করে তোলে। আবারও ভাবায়, মানুষের ভিতরেই আসলে অসীম শক্তির বসবাস। সেই শক্তিকে কাজে লাগিয়েই শুরু হয়েছে ‘অপরাজেয়’র পথচলা।

অপরাজেয়’র মূল উদ্যোক্তা সামি আল ইসলাম, রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় তার জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। নিজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি একটি পত্রিকাকে বলছিলেন, ‘রানা প্লাজা ধসের পর আমরা আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে সহায়তার জন্য কিছু টাকা নিয়ে দ্রুত এনাম মেডিকেলে যাই। সেখানে সহায়তা দেয়ার সময় অনেক ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকই আমাদের জিজ্ঞাসা করে আমরা কি আবার তাদের আয় রোজগারের কোন ব্যবস্থা করতে পারবো কি না।

তারপর ফেসবুক গ্রুপ ‘মুক্ত তারুণ্য’র মাধ্যমে আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা ও আয়ের সুযোগ করে দেয়ার জন্য কিছু একটা করার চেষ্টা করি।

পরবর্তীতে কাজী মনির হোসাইন রিন্টুর, (একজন মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার এবং এ ধরনের পুনর্বাসন কাজের সাথে দীর্ঘদিন ধরে জড়িত) মেজর খালিদ রহমান (ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ব্যাক্সিমকো) এবং আইসিডিডিআরবি’র ফাইজা সুলতানার সহায়তায় আমরা ছোট একটি একতলা স্থাপনায় কাজ শুরু করি। নিজেরা কিছু যন্ত্রাংশ কিনি এবং খুব কম ভাড়ায় স্থানীয় এক বাড়ির মালিক থেকে স্থাপনাটি ভাড়া নিই।

পরবর্তীতে আমদের সহায়তায় অনেকেই এগিয়ে আসে। রাজধানীর বারডেম হাসপাতালের ডাক্তাররা আমাদের কিছু দরকারী মেশিন কিনে দিয়ে সহায়তা করেন। অন্যান্যরা অনেকেই জেনারেটর, ইস্ত্রী মেশিন ও কাটিং মেশিন কিনে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন’।

বর্তমানে অপরাজেয়তে ১৭ জন শ্রমিক কাজ করে। সবাই এখানে অনেক স্বাধীনতা নিয়ে নিজের কারখানায় কাজ করেন। অন্য একজন শ্রমিক সাবিন খাতুন জানান, এই কারখানাটি আমাকে ব্যাপকভাবে সহায়তা করছে। আমার চিকিৎসা, সংসার খরচ ও বৃদ্ধ মা বাবার দেখাশোনা আমি এখন আমার এখানকার আয় দিয়েই করতে পারি।

শুরুর পরিসর ছোট হলেও বড় চিন্তা রয়েছে উদ্যোক্তাদের। রিন্টু জানান, ‘ইতিমধ্যেই আমরা কাপড়ের ব্যাগ তৈরি শুরু করেছি। এবং উত্তরার “ফ্যামিলি নিডস” নামক একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য কিছু ব্যাগ ডেলিভারি ও দিতে সমর্থ হয়েছি। আমাদের হাতে আরও কিছু এনজিওর অর্ডার রয়েছে। তারা তাদের প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামের জন্য আমাদের তৈরি ব্যাগ নিতে চেয়েছেন।’

সামনের দিকে পাটের ব্যাগ তৈরির চিন্তা করছেন তারা। কারখানাকে আরও বেশি উৎপাদনে সক্ষম করতে “টু-লাইন গার্মেন্টস” কারখানা স্থাপনের জন্য সহায়তা খুঁজতে শুরু করেছেন তারা।

শুধু রিন্টুরাই নন, সেখানে কাজ করেন যেসব শ্রমিক, তারাও এখন অনেক সহজে, কম পরিশ্রমে, একেবারে পারিবারিক পরিবেশে কাজ করতে পেরে নতুন একটি দিনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। চোখের সামনে বেড়ে উঠতে দেখা একটি উদ্যোগ কতটা সফল হতে পারে, তা তাদের হাসিমুখই প্রমাণ করে।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.