নারীর স্থান!

0
tania morrshed

তানিয়া মোর্শেদ

তানিয়া মোর্শেদ: মাহমুদুল হকের “মাটির জাহাজ” উপন্যাস অবলম্বনে “অনিশ্চিত যাত্রা” মুভিটা দেখলাম। সিনেমাটা কেমন হয়েছে, কেমন অভিনয় হয়েছে, এ’সব নিয়ে কিছু বলবো না। উপন্যাসটি পড়া নেই। (আশা করি কিছুদিনের মধ্যে বইটা জোগাড় করতে পারবো)।

গ্রামের অসহায় মেয়েগুলো কি ভাবে দালালদের খপ্পরে পরে, বিক্রি হয়, শহরে যৌনদাসী হয় এ’সব নিয়েই কাহিনী। অভাবে নিজের মেয়েকেও বিক্রি করে দেওয়া নূতন কিছু নয়। যুগে যুগে সব সমাজে, দেশে তা হয়েছে, হচ্ছে। যে নিজেই এক সময় বিক্রি হয়েছিল সেই হয়ে ওঠে “খালা”, “মাসী”, “বুবু” ইত্যাদি। চলে কেনাবেচা! আর পুরুষ দালালদের কথা কী বলার আছে? কাজ দেবার নাম করে গ্রাম থেকে শহরে, শহর থেকে ভারত, পাকিস্তান ঘুরতে ঘুরতে কোন দেশে ঠাঁই হয় এসব মেয়েদের কে জানে! শিশু ও নারী পাচার পৃথিবীর একটি কলংকিত অধ্যায়। বাংলাদেশ থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র, সব দেশেই নারী কেনাবেচা হয়, যৌনদাসী হয়। এদেশে অবৈধ ভাবে আসা/ থেকে যাওয়া অনেক নারী দালালদের খপ্পরে পরে এই জীবনে পৌঁছে। বাড়ী পালানো অল্প বয়স্ক মেয়েরা এই চক্রে আটকা পরে অনেক সময়ই। আর বাংলাদেশের মত দেশগুলোতে যা ঘটে তা দেখা যায় এই উপন্যাসে। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র (দালাল যে কি না নারীদের কিনতে গ্রামে যায়) নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে নিজের ভেতরের অবশিষ্ট মানবসত্ত্বাকে খুঁজে পায়, হয়ত। কিন্তু বাস্তব কী বলে? উচ্চ শিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত অনেক মানুষের চোখেই নারী আজও কেবলই ভোগের বস্তু। এর সাথে যোগ হয়েছে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাষ্ট্রীয়, ধর্মীয় ভাবে নারীকে হেয় করে দেখা। আর যে রাষ্ট্র কোনো মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অক্ষম সেখানে নারীকে কে নিরাপত্তা দেবে? নিরাপত্তার কথা ভেবে গ্রাম থেকে ভুল ঠিকানায় আসা কিশোরীকে পুলিশের হাতে তুলে দেয় মানুষ আর সেই পুলিশেরাই হয় ধর্ষক। এ ঘটনা বারে বারে ঘটে। আর বিচার? কত শত ধর্ষণের বিচার করবে/ হবে? পত্রিকা, ফেইসবুকের মাধ্যমে জানলাম যে বাংলাদেশে ধর্ষণের মেডিক্যাল টেস্ট কী বিভীষিকাময়। একজন ধর্ষিতা বারে বারে ধর্ষিত হয় আদালতে জেরার মাধ্যমে। এ’বিষয়ে কিছু করা যায় কি না জানি না। আইনের চোখে “প্রমাণ” জরুরী। কিন্তু মেডিক্যাল টেস্ট কেন এ’যুগেও এত অমানবিক হবে? একজন ধর্ষিতা নারীর কী কোনোই মর্যাদা নেই? কেন পুরুষ ডাক্তার, পুরুষ হাসপাতাল কর্মী স্পর্শকাতর সময়ে তাকে পরীক্ষা করবে? এ’সময় তার সাথে খুবই সাবধানে, সহমর্মিতা নিয়ে দেখতে হবে। এ’ জন্য প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত ডাক্তার, নার্স, হাসপাতাল কর্মী প্রয়োজন।

সামাজিক ভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর যে কোনো নারীকেই ভোগের বস্তু ভাবাটাই যেন স্বাভাবিক। তাই বাসার “কাজের মেয়ে” নামে পরিচিত গৃহকর্মী, গার্মেন্টসের নারী, অন্য যে কোন পেশায় নিযুক্ত নারীকে প্রতিদিন কত বিকৃত মানসিকতার মানুষের শিকার হতে হয়। কে ক’জন আমরা তার খবর রাখি? আর একবার যদি তার জীবনে দূর্ঘটনা ঘটে তাহলে তো আর কথাই নেই, “পতিতা” সে। তাকে ধর্ষণ করে ধর্ষক কখনোই “পতিত” নয়।

সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে অনেক গর্ব করবার বিষয় আছে সত্যি, কিন্তু নারীর অবস্থান চিন্তা করলে তা কতটা মনে থাকবে? অনেক দেশেই আজ সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে নারীকে হেয় করা নিয়মের, রীতির চল আজ নেই বা কমে এসেছে। কোনো সংস্কৃতিরই সবই ভালো বা সবই মন্দ তা কখনোই সত্যি নয়। আমাদের বুঝতে হবে যে, কোনটা গর্বের আর কোনটা পরিত্যাজ্য। এটা শুধু নগরের নাগরিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখবার বিষয় নয়। আজ বাংলাদেশের নারী শিক্ষায় কী পেশায় কোথায় নেই? অথচ নিজ গৃহে, পরিবারে, সমাজে, কর্মক্ষেত্রে ক’জনা সঠিক মর্যাদা পান? আজও বাংলাদেশের পাসপোর্টে একজন প্রাপ্ত বয়স্ক নারীকে বাবা বা স্বামীর নাম লিখতে হয়; বার্থ সার্টিফিকেটে বাবার নাম; মা’র নাম জরুরী নয়; বাবার সম্পত্তিতে ভায়ের অর্ধেক; স্বামীর সম্পত্তিতে আরো কম। হিন্দু নারীদের কথা আর কী বলবো, একই সাথে বেড়ে উঠছে ভাই ও বোনের মাঝে কী পার্থক্য। একটি ছেলে আর মেয়ের প্রতিদিনের রুটিনে আজও কী বৈষম্য। টিভিতে আজও অ্যাড দেখায় যে, কাজ থেকে একই সময়ে দু’জনে ফিরে বর বসে টিভির সামনে আর বৌ বিভিন্ন পদ রান্না করে সাজ সজ্জা করে খাবার জন্য ডাকে “পতিধনকে”, বাড়ির বৌ রান্না করে সবাইকে তুলে তুলে খাওয়ান। খাবার রাঁধতে পারেন না জানি, তাই বলে কি তুলেও খেতে পারেনা এইসব বরেরা? প্রতিদিন টিভিতে এই সব অ্যাড, নাটক, সিনেমাতে নারী আর পুরুষের ভূমিকার যে পার্থক্য দেখানো হয় তা কিন্তু শিশুদের মনে ছাপ ফেলে। অজান্তেই তারাও এ’সব শেখে, বিশ্বাস করে। তাই দেখা যায় উচ্চ শিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত নারীরাও অনেকেই আজও সেই পথেই হাঁটছেন, আর বরেরাও তা উপভোগ করছেন। আর যারা নিজের বৌকেই মর্যাদা দিতে যানে না তারা গৃহকর্মী কি অন্য পেশায় নিযুক্ত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নারীকে কী চোখে দেখেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

একটি শিশুর স্বাভাবিক ভাবে বেড়ে ওঠা অনেক কিছুর উপর নির্ভর করে। তাকে যদি শুধুই নারী বা শুধুই পুরুষের মধ্যে বড় করা হয় তাহলে অনেক কিছুই তার জানা হয় না, শেখা হয় না। বেড়ে ওঠবার সময় নারী পুরুষ সবার সাথেই সহজ সাবলীল সম্পর্ক জরুরী। শুধুই মেয়েদের স্কুল বা ছেলেদের স্কুল থেকে আসা অনেক ছেলে মেয়ে পরবর্তীতে কো-এডুকেশনে এসে অনেক সময় এমন কিছু করে, ছোটবেলা থেকেই কো-এডুকেশনে পড়লে তা করতো না। নারী যে তার মতই একজন মানুষ এর বেশীও নয়, কমও নয়, এই বোধটা ছোটবেলা থেকেই দিতে হয়। আর এরজন্য কো-এডুকেশন অনেক বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

ধর্মে নারীর অবস্থান (যে কোনো ধর্মে) এমন যে, নারীর মর্যাদা বিষয়ে কিছুই না বলে ছেলে সন্তানকে বড় করলে এবং ধর্মগ্রন্থের সব কিছু অন্ধের মত অনুকরণ করলে সেই ছেলের কাছ থেকে কী আসা করা যায়? নারী হচ্ছে “শস্যক্ষেত্র” এই শিক্ষা কী নারীর মর্যাদা শেখায়? যতই বলা হোক না কেন যে, মা’কে এমন মর্যাদা দেওয়া হয়েছে যে, তার পদতল বেহেস্তের সমান সেই ছেলে কী এটাও মনে রাখবে না যে, বৌ তার শয্যাসঙ্গী না হতে চাইলে সে তাকে প্রহার পর্যন্ত করতে পারে? তার ভোগের তালিকায় “স্ত্রীগণ” ছাড়াও “দাসীরাও” পরে? আবার দেবতার উপাসনালয়ের সেবাদাসী যে আসলে কার “দাসী”-তে পরিণত হয় তা কী অজানা? “ওয়াটার” মুভিটার কথা মনে পরলো…
ধর্মকে ব্যবহার করে যুগে যুগে মেয়েদের কী অবস্থা। একজন নারী ধর্ষিতা হলে অন্তত পক্ষে দু’জন নারী বা একজন পুরুষ সাক্ষী থাকতে হবে (না কি চারজন নারী বা দু’জন পুরুষ সাক্ষী থাকতে হবে) ধর্মের কথা; মানে সাক্ষী হিসাবেও একজন নারী একজন পুরুষের অর্ধেক! আর এতগুলো লোকের সামনে ধর্ষণ হবে আর তারা “সাক্ষ্য” দেবার জন্য ধর্ষণে বাঁধা না দিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখবে? মানে কি দাঁড়ালো, ধর্ষণের সাক্ষী রেখে ধর্ষণ করলেই তা ধর্ষণ নইলে নয়? আর এক্ষেত্রে বর যে ধর্ষক হতে পারে তা কি কোনো ভাবেই প্রমাণ সম্ভব? ওহ কী বলছি, বর মানেই তো যখন ইচ্ছে তখনই শয্যাসঙ্গী হওয়া!

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ২৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.