‘অবাস্তব’ নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে বন্দী নারী

0

driveউইমেন চ্যাপ্টার: ‘বিহাইন্ড দ্য হুইল’ নামের একটি সংগঠন সৌদি আরবে নারীদের গাড়ি চালনার অধিকারের দাবিতে লড়াই-আন্দোলন করে আসছে। গত শনিবার সেই আন্দোলনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করার পর সেটি আরও বেগ পেয়েছে। অনেকেই সেই নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে গাড়ি নিয়ে বাইরে এসেছেন। জরিমানা দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু আন্দোলন চালানোর অঙ্গীকারও করেছেন একইসাথে।

এখন তাদের আন্দোলন কেবল দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধেই নয়, বরং আরও ব্যাপক অর্থে দেশটির জেন্ডার-বেসড আইন-কানুনের বিরুদ্ধেও শুরু হয়েছে। এটা সবারই জানা যে, সৌদি আরবে নারীদের অধিকারের ওপর ভয়াবহ রকমের নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়ে আছে সেই আদিকাল থেকেই। কিন্তু পরিবর্তন শুরু হয়ে গেছে এরই মধ্যে।

এক জরিপে দেখা গেছে, বিশ্বে আরও কিছু দেশ আছে, যেখানে নারীর অধিকার সৌদি আরবের চেয়েও বিপন্ন। ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরাম এর ২০১৩ সালের রিপোর্টে প্রকাশিত র‌্যাংকিং অনুযায়ী নিচ থেকে সৌদি আরবের অবস্থান ১০ নম্বরে। আর মানে হলো মালি, মরক্কো, ইরান, আইভরি কোস্ট, মৌরিতানিয়া, সিরিয়া, শাদ, পাকিস্তান এবং ইয়েমেনের চেয়ে এগিয়ে সৌদি আরব।

নারী অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা এখন আর কেবল উত্তর আফ্রিকা, পশ্চিম আফ্রিকা অথবা মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। যদিও এসব দেশ থেকে প্রায়ই অধিকার লঙ্ঘনের খবর আসা অব্যাহতই আছে।

এই বিষয়ে মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকায় কর্মরত অ্যাডভোকেসি গ্রুপ হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এর গবেষক রত্না বেগম বলেন, “ ভয়াবহ ঘটনাগুলোর অধিকাংশই আইনের আওতায় আসে না।”

তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, ‘সৌদি আরবে ধীরে ধীরে পরিবর্তন ঘটছে, আধুনিকায়নও হচ্ছে সবকিছু’।

নারী অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা যে কেবল এশিয়া এবং আফ্রিকাতেই সীমাবদ্ধ, তা নয়। এশিয়া থেকে লাতিন আমেরিকা পর্যন্ত সব জায়গাতেই নারীর বিরুদ্ধে আইনী নিষেধাজ্ঞার ঘটনা ঘটছে, তবে ভিন্নভাবে, ভিন্ন কায়দায়। নিচে এর কিছু উদাহরণ দেওয়া হলো:

ভারতের কিছু রাজ্যে এখনও সড়ক নিরাপত্তা আইন নারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। ভারতের কিছু রাজ্যে এখন পর্যন্ত সড়ক নিরাপত্তা আইনের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে নারীকে। সেখানে মোটর সাইকেল চালানো নারীদের মাথায় হেলমেট পরা বাধ্যতামূলক করা হয়নি, যা আছে পুরুষের ক্ষেত্রে। আর এর প্রেক্ষিতে প্রতিবছর অসংখ্য নারীর মৃত্যু হয় সড়ক দুর্ঘটনায়, বা আহত হন হাজার হাজার নারী। নারী অধিকার নিয়ে আন্দোলনরত কর্মীরা বললেন, এসব ঘটনার পিছনে মূল কারণ হচ্ছে এখানকার সংস্কৃতিতে নারীকে অবমূল্যায়ণ করে রাখারই উদাহরণ। তবে যারা এই নিষেধাজ্ঞার বিরোধী, তারা বলছেন, তারা নারীদের যত্ন করে, পরিপাটি করে রাখা চুল আর মেকআপ ঠিক রাখতেই একাজটি বেশ সচেতনভাবেই করে চলেছেন।

ইয়েমেন নারীদের সাক্ষ্যকে এখনও পূর্ণাঙ্গ সাক্ষ্য হিসেবে ধরা হয় না। একজন পুরুষের সাক্ষ্য সমান দুইজন নারীর সাক্ষ্য ধরা হয় দেশটিতে। আর এটাই দেশটির আইনী ব্যবস্থায় প্রচলিত যুগ যুগ ধরে। ২০০৫ ফ্রিডম হাউজ রিপোর্ট অনুযায়ী, একজন নারী আদালতে পূর্ণাঙ্গ সাক্ষ্য হিসেবে স্বীকৃত নয়। সাধারণভাবে একজন নারীর কোন বক্তব্যই আদালতে গুরুত্বের সাথে নেওয়া হয় না। যতক্ষণ না সেই বক্তব্য কোন পুরুষ দ্বারা সমর্থিত হয়, ততক্ষণ সেই বক্তব্যের কোন মূল্যই নেই আদালতে। এমনকি যেখানে পুরুষের থাকার কথাও নয়, সেইসব ক্ষেত্রেও তাদের মতামত বা সাক্ষ্যই মূল। তাছাড়া, কোন ধরনের ‘তথাকথিত আইনসঙ্গত নয় বা ব্যভিচার’, চুরি, সমকামিতার ক্ষেত্রে নারীর মতামত নেওয়াই হয় না।

সবচাইতে মর্মান্তিক আইনটি চালু আছে সৌদি আরব এবং ভ্যাটিক্যান সিটিতে। এসব জায়গায় এখনও নারীদের কোন ভোটাধিকার নেই। আশার কথা হচ্ছে, সৌদিতে ২০১১ সালের এক রাজ ফরমান জারির মাধ্যমে নারীদের ২০১৫ সাল থেকে ভোটাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ভ্যাটিকানে শুধুমাত্র পুরুষরাই ভোট দেয়, নারীদের এ বিষয়ে এখনও কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

ইকুয়েডরে গর্ভপাতকে সম্পূর্ণ বেআইনী উল্লেখ করে আইন রয়েছে। বলা হয়েছে, ‘আপনি যদি ইডিয়ট না হয়ে থাকেন তাহলে সেই গর্ভপাত বেআইনী’। রত্না বেগম বলছিলেন, এটাই আইন দেশটিতে, দীর্ঘদিন ধরেই এই আইন বহাল আছে। কিন্তু ডাক্তারী পরীক্ষায় কেউ যদি ‘বোকা’, ‘প্রতিবন্ধী’ বলে প্রমাণ হয়, তাহলেই কেবল শিথিলযোগ্য। রাজনীতিবিদরা ‘অসুস্থ’ নারীদের কথা বলার সময় বেশ মোলায়েমনভাবেই ‘মানসিকভাবে অসুস্থ’ শব্দটি উচ্চারণ করেন। কিন্তু তারপরও দেশটিতে এই আইন পরিবর্তনের কোন নমুনাই দেখা যায় না। আরও কঠোর ব্যাপার হচ্ছে, এই আইন অবৈধ গর্ভপাতের ক্ষেত্রে প্রায়ই ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

আরও একটি মর্মান্তিক আইনের প্রয়োগ রয়েছে সৌদি আরব এবং মরক্কোয়। দেশ দুটিতে ধর্ষণের শিকার হলে নির্যাতিতাও অভিযুক্তদের সাথে সমান অপরাধে অভিযুক্ত করার নিয়ম রয়েছে। বহু দেশই ধর্ষণের শিকার নারীদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়। উপরন্তু আরও একধাপ এগিয়ে তারা ওই মেয়েটিকে ঘরছাড়া করতে বাধ্য করে। মেয়েটার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় যে, সে পরপুরুষের সাথে ছিল অথবা অন্ত:সত্ত্বা হয়ে পড়েছিল। সৌদি আরবের সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হচ্ছে ‘কাতিফ গার্ল’।
এদিকে মরক্কোর সাম্প্রতিক সময়ের একটি আত্মহত্যার ঘটনাও দেশটিতে শিরোনাম হয়। সেটি ছিল, বিচারক ধর্ষকের সাথে বিয়ে দিতে বাধ্য করায় ১৬ বছরের কিশোরী আমিনা ফিলালি আত্মহত্যা করে। দেশটিতে ধর্ষক যদি ধর্ষণের শিকার মেয়েটিকে বিয়ে করে, তাহলে বিচারটিই বেআইনী হয়ে যায়।

ইয়েমেনে স্বামীর অনুমতি ছাড়া নারীরা বাড়ির বাইরেই যেতে পারে না। একেবারে জরুরি না হলে এই নিয়ম সবসময়ের জন্যই প্রযোজ্য। রত্না বেগম বলেন, শুধুমাত্র অসুস্থ বাবা-মাকে দেখতে যাওয়ার প্রয়োজন হলেই সেখানকার নারীরা অনুমতি ছাড়াই বের হতে পারেন।

সবশেষ যোগ হয়েছে, সৌদি আরবের নারীদের গাড়ি চালানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি। সারাবিশ্ব জুড়েই এখন এই ঘটনাটি সর্বোচ্চ আলোচিত।

তাহলে কি কোন ভাল খবরই নেই? ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরামের তথ্যমতে, বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে জেন্ডার বৈষম্য দূর হচ্ছে, খোদ মধ্যপ্রাচ্যে মাঝারি ধরনের সমতা আসতে শুরু করেছে। রত্না বেগম বলেন, আরও অনেক পরিবর্তন প্রয়োজন, সেজন্য সমাজের ভিতর থেকেই এখন দাবি উঠতে শুরু করেছে, এটা ইতিবাচক একটা দিক। সৌদি আরবের নারীদের অনেকেই এখন উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত এবং যেকোনো ক্ষেত্রে তারা ‘হাইলি কোয়ালিফাইড’ও। তারাই এখন আর অন্ধকারে বা পিছনে পড়ে থাকতে চাইছেন না।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.