গণতন্ত্র অক্ষুন্ন রাখতে চাইলে সংঘাত এড়ানো সম্ভব: মতিয়া চৌধুরী

Sanglap BBCউইমেন চ্যাপ্টার: কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেছেন, সব পক্ষ গণতন্ত্র অব্যাহত রাখতে চাইলে চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসন করে সংঘাত এড়ানো সম্ভব হবে। তবে এর প্রত্যুত্তরে বিরোধী দল বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান বলেছেন, সমঝোতার বিষয়টি নির্ভর করছে সরকারের সিদ্ধান্তের উপর।

শনিবার অনুষ্ঠিত বিবিসি’র বাংলাদেশ সংলাপ এর সবশেষ পর্বে অংশ নিয়ে তারা একথা বলেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত ১০০ জন নারীকে নিয়ে চলছে বিবিসি’র বিশেষ অনুষ্ঠানমালা। এরই অংশ হিসেবে ঢাকায় শনিবার বিয়াম মিলনায়তনে নারীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল বাংলাদেশ সংলাপ এর বিশেষ পর্ব। যাতে আলোচক এবং দর্শকদের সবাই ছিলেন নারী।

সংলাপের এ পর্বে নারীর নিরাপত্তাহীনতার কারণ এবং কর্মজীবী নারীকে তার ক্যারিয়ারকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত কি-না এমন বিষয়গুলোও আলোচনায় উঠে আসে। ঢাকায় বিয়াম মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এ পর্বে আলোচক ছিলেন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফাতেমা আনোয়ার এবং সংস্কৃতি কর্মী ও অ্যাকটিভিস্ট রোকেয়া প্রাচী।

বিবিসি বাংলার সাংবাদিক দিল আফরোজা সুলতানার সঞ্চালনায় এ অনুষ্ঠানে প্রথম প্রশ্ন করেন সানজিদা তাহসিন। তিনি জানতে চান শিক্ষাঙ্গন থেকে কাজের জায়গা প্রতিটি ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশাই কি নারী নির্যাতনের প্রধান কারণ?

রোকেয়া প্রাচী বলেন, “সব ক্ষেত্রে অবাধ মেলামেশাই নারীর প্রতি সহিংসতার মূল কারণ নয়। পরিবার থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত দৃষ্টিভঙ্গিই প্রধান কারণ। পরিবার থেকে একজন মানুষ যে শিক্ষা পায় সেটিই সবক্ষেত্রে প্রকাশিত হয়। আর সেটিই নারীর প্রতি বৈষম্য বা পুরুষকে নারীর প্রতি সহিংসতা সেটিই সাহায্য করে”।

তিনি বলেন, “বৈষম্যকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেয়ার মানসিকতা প্রথম থেকেই গ্রহণের চেষ্টা করলে পরে কষ্ট বা ধাক্কা প্রতিহত করা কঠিন হয়ে যায়না। কোন নারী যদি নির্যাতনের শিকার হন তাহলে যেন আমরা তার পাশে দাঁড়াই”।

ফাতেমা আনোয়ার বলেন, “নারী-পুরুষকে একসাথেই চলতে হবে। নিজেদের মধ্যে সচেতন থেকে আমরা তো কাজ করছি পুরুষের সাথেই কোন নির্যাতন ছাড়াই। মেলামেশার পরিধি কতটুকু হবে সেটা জানলে এবং আত্মসম্মানবোধ থাকলে তাহলে কোন ক্ষেত্রেই মেলামেশায় সমস্যা হওয়ার কথা না”।

একজন দর্শক বলেন, “আমি কার সাথে মিশবো এবং সেখানে আমার জন্য নিরাপত্তাহীনতা আছে কি-না সে জায়গাটি আমার নিজেকেই ঠিক করে নিতে হবে”। আরেকজন দর্শক বলেন, “অবাধ মেলামেশার সংজ্ঞা আমার কাছে পরিষ্কার নয়। শিক্ষকের কাছে ছাত্রী নিপীড়িত হচ্ছেন। সেটা কি অবাধ মেলামেশার জন্য”?

মতিয়া চৌধুরী বলেন, “আমাদের এগিয়ে যেতে হবে সব সমস্যা ভেদ করেই। আমাদের সাধারণ মানুষের মন অত ছোট নয়। এদেশের সাধারণ মানুষ সব সময় নারীদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিচরণের ক্ষেত্রে উদারমনা। অনেকে নানা ব্যাখ্যা দিয়ে নারীদের আটকে রাখতে চায় যেটা ধর্মও সমর্থন করে না। এটাই হল সমস্যা”।

সেলিমা রহমান বলেন, “নারীর প্রতি সন্মান আমরা ক্রমশই হারিয়ে ফেলছি। আসলে যে শিক্ষা পরিবার থেকে পাই সেখানেই শেখাতে হবে যে সব নারীকে সমান শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখতে হবে। পরিবার থেকে পাওয়া শিক্ষাই নারী নির্যাতন রোধে সহায়ক হবে। নারীকে মূল্যায়ন করতে হবে মানুষ হিসেবে। তাহলে নির্যাতন নিপীড়ন কমে যাবে”।

রাজনৈতিক সংকট-সংঘাত

মোসাম্মৎ পপি খাতুন জানতে চান, দুই প্রধান দলের রাজনৈতিক নেত্রীর সংকট নিরসনে একে অপরের প্রস্তাব মেনে না নেয়ার ফলে দেশে কি সংঘাত কি অনিবার্য হয়ে উঠেছে?

মতিয়া চৌধুরী বলেন, সবার মধ্যে সংবিধান মানার মানসিকতা থাকলে সংঘাত এড়ানো যাবে। আর প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যেই সমঝোতার কথা বলেছেন এবং বিরোধী দলীয় নেত্রীর সঙ্গেও তিনি আলোচনা করবেন। তিনি বলেন, “একটা আবহ কিছুটা তৈরিও হয়েছে। এটা হলে অনেকে লাভবান হয়, এটাও সত্যি। আমরা যদি কাউকে লাভবান হতে দিতে না চাই এবং গণতন্ত্র অব্যাহত রাখতে চাই তাহলে সংঘাত হওয়ার কোন কারণ নেই”।

সেলিমা রহমান বলেন, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সংঘাত অনেকটাই দৃশ্যমান। তবে সমঝোতা হবে না এমনটি এখনই বলা যাচ্ছে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, রাজনীতিতে শেষ কথা বলতে কিছু নেই। আর বিএনপি নির্বাচনের সময়ে একটা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে লড়াই করছে তবে বিএনপি কোনও সংঘাতে যেতে চায়না। তিনি বলেন, “আমাদের যেমন দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, তেমনি সরকারও এগিয়ে গেছে। সংঘাত হবে না যদি সরকার শান্তি চায়, ভালো চায় দেশের। এটা নির্ভর করছে সম্পূর্ণ সরকারের উপর। সরকার কি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সেটা তাদের উপরই নির্ভর করে”।

একজন দর্শক বলেন, “দুই নেত্রী সহনশীল মনোভাব নিয়ে এগিয়ে এসে আলোচনা করুন। বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশের নারী নেতৃত্ব দৃষ্টান্ত তৈরি করুক”। আরেকজন দর্শক বলেন, “সমঝোতা বলতে দুই নেত্রী কি বুঝাতে চান সেটাই পরিষ্কার নয়”।

ফাতেমা আনোয়ার বলেন, মূল সমস্যা হচ্ছে আস্থার সংকট। না হলে তো দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন হওয়ার কথা। তিনি বলেন, “দুই নেত্রীর বক্তব্য শুনে মনে হয় তারা সংঘাত এড়াতে চান। ফর্মুলাগুলো হচ্ছে মাঝামাঝি কিছু একটা। সংবিধান নাজিল হয়নি। এটা সংশোধন সম্ভব। এটা নিয়ে কঠোরতার দিকে চলে গেলে জনগণের জন্য আইন এ চেতনা ক্ষুণ্ণ হয়”।

রোকেয়া প্রাচী বলেন, কাউকে যদি ভোট দিয়ে পাঁচ বছরের জন্য দেশ শাসন করতে দিতে পারি, তাহলে নির্বাচন করতে দিতে পারি না কেন ? সে নির্বাচন নিয়েও সংঘাত এড়ানো সম্ভব এবং জনগণকেও সে দায়িত্ব নিতে হবে। তিনি বলেন, “আমরা অনিশ্চয়তায় থাকবো কেন। নির্বাচনই মুখ্য নয়, মুখ্য হল বাংলাদেশের উন্নয়ন। সবাই বাংলাদেশকে ভালবাসলে সংঘাত হবে না। পাঁচ বছর পর পর গিনিপিগ হয়ে যাই। সংঘাত এড়ানোর দায়িত্ব আমাদেরও”।

কর্মজীবী নারীর ক্যারিয়ার বনাম সংসার

উপস্থিত দর্শক নাজনীন নাহার জানতে চান, কর্মজীবী পুরুষের মতো কর্মজীবী নারীরও কি উচিত ক্যারিয়ারের দিকেই সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দেওয়া? এর উত্তরে ফাতেমা আনোয়ার বলেন, “কর্মজীবী পুরুষ সংসার রক্ষার্থেই ক্যারিয়ারের দিকে মনোযোগ দেয় বলে ধারণা করি। প্রত্যেকেরই আলাদা অবস্থান ও গণ্ডি রয়েছে। তবে মায়ের জায়গা কখনো বাবা পূরণ করতে পারে না। একজন নারী নিজেই বুঝবে কোথায় তার গুরুত্ব দিতে হবে”।

রোকেয়া প্রাচী বলেন, “পেশাদার মানুষ হিসেবে কাজের প্রতি যতটুকু দায়িত্বশীলতা থাকা দরকার, সবার ততটুকু হতে হবে। সামনের দিকে এগুতে হবে। সংসারের জন্য কাজে ফাঁকি দেওয়া যেমন যায় না, তেমনি কাজের জন্যও সংসারে দায়িত্ব অবহেলা করা যাবে না”।

সেলিমা রহমান বলেন, “সমানভাবে কাজে ও সংসারে সময় দিতে হবে। সামাজিক পরিবর্তনের জন্য আমাদের সবাইকেই এগিয়ে আসতে হবে”।

মতিয়া চৌধুরী বলেন, “মা ও সন্তানের যোগাযোগ ভালো হলে মায়ের ক্যারিয়ার কোন সমস্যাই নয়। এটা কর্মজীবী উচ্চস্তর বা নিচুস্তরের বিষয় নয়”।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.