দেশে কি যুদ্ধ লেগেছে?

DAASউইমেন চ্যাপ্টার: আজকের সকালটা খুবই স্তব্ধ হয়ে আছে কোথাও। পাখিদেরও সেই কিচির-মিচির শব্দ কানে আসছে না। গাড়ি-ঘোড়ার শব্দ কোথায়? এরই মাঝে আকাশের বুক চিরে উড়ে গেল একটি বিমান, যেন বুকের ভেতরটাই ধক করে উঠলো। কেমন যেন সব এলোমেলো পরিবেশ, যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব, সবার মনে আতংক। কী হতে যাচ্ছে দেশে? কিন্তু কার বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ? আমাদের সাধারণের বিরুদ্ধে? আমরা না ভোট, তবে আমাদের জীবন উত্যক্ত করা কেন?

গতকাল দুপুরের পর থেকেই একের পর এক খবর আসছিল ককটেল বিস্ফোরণের। সন্ধ্যা নাগাদ মোটামুটি ককটেল আর বোমা নগরীতে রূপ নেয় ঢাকা শহর। তাহলে কি প্রিয় দেশটা আজ আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইরাক, মিশর, সিরিয়ার দামেস্ক হয়ে গেছে? বোমা নিক্ষেপ করা হচ্ছে রাস্তা, অফিস ও বাসস্থানে । যত্রতত্র গাড়িতে আগুন জ্বালানো ও ভাংচুর হচ্ছে । আর বেশির ভাগ সংবাদ মাধ্যমেই বলা হচ্ছে দুর্বৃত্তদের হামলায় এই হয়েছে, ঐ হয়েছে । রাজনৈতিক দলের কর্মসূচী দুর্বৃত্তায়ন কর্মসূচীতে পরিণত হয়ে গেলো কি ?

গতরাতে এক বন্ধু বিমানবন্দর থেকে ফোন করে জানালো, তার গাড়ির ঠিক ২০০ মিটারের মধ্যে একটি ককটেল ফেটেছে। ওই মূহূর্তে তার মেয়েটার মুখ ভেসে উঠে একবারের জন্য। নিরাপত্তাহীনতা মানুষকে কতটা অসহায় করে তোলে! কোনরকমে পৌঁছালো বিমানবন্দরে। পরে খবর পেল, বোমাসদৃশ আরও কি যেন পাওয়া গেছে সেখানে। পুলিশ দৌড়াচ্ছে। ও বলছিল, দেশটাকে কেমন অরক্ষিত রেখে যাচ্ছে এবার, আমরা যেন সুস্থ থাকি।

জানি না সুস্থ থাকা আমাদের হবে কিনা! তবে ৩০ লাখ শহীদের রক্তে অর্জিত এই দেশের স্বাধীনতা এতো সহজে বিকিয়ে দেবে না বাঙালী, এই বিশ্বাস আছে। একাত্তরে পরাজিত শক্তি যতোই হম্বিতম্বি করুক না কেন, তখনও পারেনি, এখনও পারবে না।

একজন তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, “আজ অফিসের উদ্দেশ্যে বের হয়েই দেখি আমাদের পাড়ার ছোট্ট গলিতেও পুলিশের গাড়ি ঘোরাফেরা করছে।একটু আগেই নাকি একটা মিছিল থেকে হরতাল সমর্থককারীরা পুলিশের দৌড়ানি খেয়ে অলিগলিতে পালিয়েছে। সড়কে এসে দেখি গাড়িঘোড়া কিছুই নেই। শুধু মানুষ আর মানুষ। সামান্য কয়েকটা রিক্সা অটো রিক্সা চলছে।রহস্যময় এম্বুলেন্সগুলো অবশ্য চলছে। আর দাংগা পুলিশ প্রস্তুত হয়ে আছে। বুঝতে পারলাম আজ অফিসে যাওয়া হবে না। পরিস্থিতি জানতে দাংগা পুলিশের কাছেই জানতে চাইলাম কোন সমস্যা হয়েছে কি না! চোরাগুপ্তা হামলা হতে পারে, হচ্ছে টাইপ জবাব দিলেন।

নাহ, পরিস্থিত আজ এমন যে আইনশৃংখলা রক্ষা বাহিনীও কুলিয়ে উঠতে পারছে না।

খালেদা জিয়া কেন হরতাল প্রত্যাহার করেন নি? তিনি কি চান… হরতালের নামে নাশকতা চালাতে? এরপর তার দলের (বা জামাত শিবির) নেতা কর্মীদের আইনশৃংখলা বাহিনী আটক করলে তিনি কি এর প্রতিবাদে সংলাপ প্রত্যাহার করার সুযোগ তৈরি করছেন????? তাই যদি হয়, তবে খুব ভুল করলেন খালেদা জিয়া”।

গতরাত পর্যন্ত বিভিন্ন গণমাধ্যম কার্যালয়ে হামলা হয়েছে, আহত হয়েছে একাত্তর টেলিভিশনের দুজন সাংবাদিক। তাছাড়া  (গতকালের খবর) রাজধানীর কয়েকটি স্থানে হাতবোমার বিস্ফোরণের পাশাপাশি কয়েকটি গাড়িতে আগুন দেয়া হয়েছে। বেলা সোয়া ১২টার দিকে তেজগাঁও কলেজের সামনে সায়েদাবাদ-গাবতলী (৮ নম্বর) রুটের একটি বাসে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

বেলা দেড়টার দিকে কলাবাগান ওভার ব্রিজের নিচে মিরপুর সড়কে একটি গাড়ি পুড়তে দেখা গেছে। বেলা ৩টার দিকে কারওয়ান বাজারে বিসিআইসি ভবনের সামনে একটি সিএনজি অটোরিকশায় আগুন দেওয়া হয়। বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে নয়া পল্টনে বিএনপি র কার্যালয়ের সামনে একটি পিকআপভ্যানে আগুন দেওয়া হয়। এরপর পৌনে ৬টার দিকে তেজগাঁও বেগুনবাড়ি এলাকায় একটি কভার্ড ভ্যানে এবং জাতীয় শিকাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের সামনে একটি বাসে আগুন দেওয়া হয়।

বেলা দেড়টার দিকে বিজয় নগরে ‘পল্টন টাওয়ারের’ সামনে ১৫ থেকে ২০ জন যুবক কয়েকটি গাড়ি ভাংচুর করে।

হামলা হয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যম অফিসেও। একাত্তর টিভি চ্যানেলের দুজন সাংবাদিক আহত হয়েছেন বোমায়। দেশটিভির সামনেও বিস্ফোরণ হয়েছে। এ কীসের আলামত! গণমাধ্যম কেন আক্রান্ত? এতো আক্রোশ কেন ওদের ওপর?

এছাড়া রাজধানীর কয়েকটি স্থানে হাতবোমার বিস্ফোরণও ঘটানো হয়েছে। একটি ঘটেছে আপিল বিভাগের বিচারপতি এস কে সিনহার বাড়ির সামনে। ঢাকা মহানগর পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনারের কার্যালয়ের সামনেও কয়েকটি হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। ধানমন্ডিতে পরিবেশ ও বনমন্ত্রী হাছান মাহমুদের বাসার সামনে, আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমদের বাসায় তার কক্ষ বরাবর হাতবোমা নিক্ষেপ করা হয়েছে। তাঁর ছেলে জানিয়েছেন, মন্ত্রী তখন তার রুমেই ছিলেন। প্রায় একই সময় প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বাসায়ও বোমা হামলা হয়েছে।

পুলিশ বলছে, এসব ঘটনার অধিকাংশই জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা ঘটিয়েছে। হরতালের আগে ভীতি সঞ্চারের জন্য এসব ঘটনা ঘটানো হয়েছে। এতো আর নতুন না, প্রতি হরতালের আগেই এমন জ্বালাও-পোড়াও চলে, এবার তাতে যোগ হয়েছে বিভিন্ন জনের বাড়িতে ককটেল নিক্ষেপের ঘটনা। এতে কী বার্তা দিতে চাইছে হরতালকারীরা?

শুক্রবার ১৮ দলীয় জোটের সমাবেশে বিরোধীদলীয় নেতা বলেছিলেন, দুদিন সময় দিলাম, সংলাপের আহ্বান জানানো না হলে ৬০ ঘন্টা হরতাল পালিত হবে। সেই অনুযায়ী একদিনের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে ফোন করে সংলাপে বসার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। সেইসাথে হরতাল প্রত্যাহারেরও অনুরোধ করেছেন। কিন্তু তিনি শোনেননি, নিজের দেওয়া কথাও রাখেননি। হরতাল বজায় রেখেছেন। অজুহাত দেখাচ্ছেন, এখন আর প্রত্যাহার করা সম্ভব না।

কেন সম্ভব না? জানমালের ক্ষতি করে, পুরো দেশে একটা আতংক তৈরি করে উনার কী লাভ হবে জানি না, তবে লাভ হলো সরকারেরই। যদিও সরকার এই নমনীয়তাটুকু সময় থাকতেই দেখাতে পারতো, তারপরও দেখিয়েছে তো, বিরোধী দলীয় নেতার কথাতেই দেখিয়েছে। উনিই পারতেন, প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে হরতাল প্রত্যাহার করে সংলাপে বসতে। দেশের মানুষ কিছুটা হলেও স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলতো।

কিন্তু দেশের মানুষের কথা কেই বা ভাবে! জনগণ তো শুধু ভোট। কাগুজে ভোট, তার কোন চাওয়া-পাওয়া নেই, শান্তি-অশান্তি নেই। রাস্তায় রাস্তায়, পাড়ায়-মহল্লায় আজ মানুষের জটলা চোখে পড়ার মতো। সবাই উত্তেজিত স্বরে কথা বলছেন, অবয়ব দেখেই বুঝে নেওয়া যায় আলোচনার বিষয়বস্তু।

কিন্তু এই সম্মিলিত উচ্চস্বর আবার আতংকিতও করে বৈকি! যে হারে অবৈধ সরকার, অবৈধ সরকার বলে গলা ফাটাচ্ছে কেউ কেউ, তাতে করে না আবার আইন হাতে তুলে নেয় সুবিধাবাদীরা, তস্কর-সন্ত্রাসীরা। তাই যদি হয়, তবে আমাদের সাধারণ মানুষের জীবনে ভয়াবহ এক পরিণাম অপেক্ষা করে আছে।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.