সৌদি নারী চালকদের ওপর ফের নিষেধাজ্ঞা

Saudi women 2উইমেন চ্যাপ্টার: সবই প্রায় ঠিক ছিল। কথা ছিল ২৬ অক্টোবর সবাই একযোগে গাড়ি নিয়ে বের হবেন রাস্তায়। নব্বইয়ের দশক থেকে এই এক দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে আসছেন সৌদি নারীরা। গাড়ি চালানোর অনুমতির জন্য ১৭ হাজার স্বাক্ষরসহ আবেদনও করা হয়েছিল। সেই আবেদনে লেখা ছিল, হয় সৌদি নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতি দিতে হবে, নয়তো এই নিষেধাজ্ঞার কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে।

কিন্তু দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একদিন আগেও এ ব্যাপারে নিমরাজি থাকার পরদিনই নিষেধাজ্ঞা অমান্য না করার ব্যাপারে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে। নয়তো শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে বলেও জানিয়ে দিয়েছে।

তবে কিছু আন্দোলনকারী নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে হলেও রাস্তায় বেরিয়ে আসার জন্য উৎসাহিত করছেন সৌদি নারীদের। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা বলে, নব্বইয়ের দশকে এমন একটি বিক্ষোভের পর অসংখ্য নারী গ্রেপ্তার হয়েছিলেন এবং তারা তাদের চাকরি হারিয়েছিলেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মানসুর আল তুর্কি গত বৃহস্পতিবার এই নিষেধাজ্ঞার ওপর কড়াকড়ি আরোপ করে বলেন, বুধবার নারীদের গাড়ি চালানোর পক্ষে বক্তব্য দেওয়া হলেও ‘মুড’ পরিবর্তন হয়ে গেছে। নারীদের কঠোরভাবে গাড়ি চালনা থেকে বিরত থাকতে বলা হচ্ছে। যারা এই নিয়ম ভাঙবে বা ভাঙতে সমর্থন জুগাবে, তাদেরই শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।

জাকি সাফার নামের একজন আন্দোলনকারী বলছিলেন, নতুন করে এই নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে পুরো বিষয়টিই বিতর্কিত হয়ে পড়েছে। এটা আনুষ্ঠানিক কোন বক্তব্য নয়। বিবিসিকে তিনি বলেন, এটা কোন সামাজিক পছন্দ-অপছন্দের ইস্যু নয়, যে সরকার ইচ্ছা করলেই এই নিষেধাজ্ঞাকে সমর্থন দিতে পারে। তবে ওই মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বেশ স্পষ্ট করেই বলেছেন, ২৬ অক্টোবর যারাই গাড়ি চালাবে, তাদেরকেই শাস্তির মুখোমুখি করা হবে।

মি. সাফার বিশ্বাস করেন যে, এই ইস্যুতে সরকার নিজেই দ্বিধাবিভক্ত। নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেবে, কি নেবে না, এ নিয়ে সরকারের মধ্যেই মতবিরোধ রয়েছে।

এ সপ্তাহের শুরুর দিকে প্রায় ১০০ জন রক্ষণশীল ধর্মীয় নেতা এই প্রচারণা বন্ধ করার অনুরোধ জানান দেশটির রাজ আদালতে। তারা এটিকে নারীদের ষড়যন্ত্র এবং দেশের জন্য হুমকিস্বরূপ বলে উল্লেখ করেন। কিন্তু এই আবেদনের পর খুব একটা সাড়া মেলেনি আগের মতোন। অর্থাৎ ১৯৯০ সালে প্রথম বিক্ষোভ এবং ২০১১ সালে দ্বিতীয় বিক্ষোভের সময় সৌদি সরকারের ভিতরে নারীদের গাড়ি চালনা নিয়ে যতোটা গোঁড়ামি ছিল, ঠিক ততোটা এবার আর লক্ষ্য করা যায়নি।

সবশেষ প্রচারণায় কয়েক ডজন সৌদি নারী বিভিন্ন শহরে তাদের গাড়ি চালানোর ভিডিও চিত্র তুলে ধরেন। এদের কাউকেই গ্রেপ্তার করা হয়নি। ২৬ অক্টোবরকে প্রতীকী করার তোলার ইচ্ছে ছিল সৌদি আন্দোলনকারীদের। তবে নিষেধাজ্ঞা যাই হোক না কেন, আন্দোলন তাদের চলবে বলেও জানিয়ে দিয়েছেন।

আন্দোলনকারী নাজলা আল-হারিরি বললেন, “অভ্যন্তরীণ মন্ত্রকের সতর্কবার্তাকে সম্মান জানিয়েই মেয়েদের স্টিয়ারিং ধরতে বারণ করছি। বরং ‘অক্টোবর-২৬’ আন্দোলনকে লাগাতার আন্দোলনের চেহারা দেওয়া হোক।”

সৌদি আরবে মেয়েদের গাড়ি চালানোয় নিষেধাজ্ঞা-শাস্তি-বিক্ষোভ, নতুন কিছু নয়। প্রতিবাদ স্বরূপ ২০১১ সালে গাড়ি চালিয়ে ইন্টারনেটে ছবি পোস্ট করেছিলেন মানবাধিকার কর্মী মানাল আল-শরিফ। পরিণামে সপ্তাহখানেক জেলে কাটাতে হয় তাকে। মানালের মতো মেয়ের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে আরবে। সেপ্টেম্বরেও এক বার অনলাইন আন্দোলন শুরু হয়। উদ্দেশ্য, স্টিয়ারিংয়ের সামনে আনতে হবে মেয়েদের। সমর্থনে ১৭ হাজার স্বাক্ষর জমা পড়ে অনলাইনেই। তাতেই গতি পায় ২৬ অক্টোবরের আন্দোলন।

 মানালের মতে, “দীর্ঘদিন ধরে অন্ধকারে ছিলাম। এখন আমরা জানি, কোন পরিস্থিতিতে বাস করছি।” তাদের বক্তব্য, সৌদি আরবে কিন্তু এমন কোনো আইন নেই, যাতে মেয়েদের গাড়ি চালানো নিষিদ্ধ। ধর্মীয় সংগঠনগুলোই ফতোয়া জারি করে রেখেছে।

প্রচারণার পিছনে থাকা আন্দোলনকারীদের বিশ্বাস, তাদের আন্দোলনের বিষয়ে জনমত ক্রমেই পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রচুর মানুষ যোগ দিচ্ছেন তাদের প্রচারণায়, এমনকি সৌদি পুরুষরাও এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ওপর জোরারোপ করছেন। একে তারা ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.