কেমন আছেন ‘বিস্ময়কন্যা’ রেশমা?

0

Reshmaউইমেন চ্যাপ্টার: সাভারের রানা প্লাজা দুর্ঘটনার ১৭ দিন পর ধ্বংসস্তুপ থেকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছিল পোশাক শ্রমিক রেশমাকে। ছয় মাস আগে ওই ভবন ধসের ঘটনায় এগারোশ’র বেশি শ্রমিক প্রাণ হারান, যাদের বেশিরভাগই ছিলেন তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিক। অনেকেই আবার সেখান থেকে জীবিত উদ্ধার হয়েছেন। আহত হয়েছেন সারাজীবনের মতোন।

বিশ্বের ইতিহাসে ভয়াবহতম শিল্প দুর্ঘটনার একটি হিসেবে চিহ্ণিত হয়েছে ভয়াবহ ওই ভবনধস।

রেশমা ওই ভবনেরই একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। উদ্ধার তৎপরতার একেবারে শেষ পর্যায়ে ১৭ দিন পর যখন উদ্ধারকারীরা তাদের কাজের সমাপ্তি ঘোষণার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে রেশমাকে জীবিত উদ্ধারের ঘটনা বিশ্বজুড়ে বিস্ময় ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। সবাই রেশমাকে ‘বিস্ময়কন্যা’ বলেও অভিহিত করেন।

কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর তাকে চাকরি দিতে আগ্রহ প্রকাশ করে অনেকেই, এমনকি বিদেশ থেকেও প্রস্তাব আসে। শেষপর্যন্ত ঢাকার পাঁচতারা হোটেল ওয়েস্টিনে কাজের প্রস্তাবেই তিনি রাজী হন।

কীভাবে কেটেছে রেশমার গত ছয় মাস এবং এখন কীভাবে দিন কাটাচ্ছেন তিনি, সেসব নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেছেন বিবিসি বাংলার আকবর হোসেনের সাথে। বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছেন, তার এখনকার ভাল থাকা, কাজের কথা, উদ্ধারের সময়কার কথা, ভবিষ্যত স্বপ্নের কথা।

রেশমা বলেছেন, ওয়েস্টিনে কাজ করতে তার ভাল লাগছে। এখানে সবাই খুব ভাল, সবাই তাকে আদর করেন। ছোট বোন হিসেবে দেখেন।

মাস চারেক ধরে ওয়েস্টিনে কাজ করছেন রেশমা। তিনি জানান, এখানে মূলত তিনি ট্রেনিং করছেন সব ডিপার্টমেন্টে। একাজে সবাই তাকে সহায়তা করেন, আউটফিটের ট্রেনিং করছেন। কিভাবে কম্পিউটারে এন্ট্রি করে, তাও হাতে-কলমে দেখে নিচ্ছেন। এখানকার কাজটা আগের কাজের তুলনায় অনেক সোজা, বললেন রেশমা। মোটামুটি সুপারভাইজ করছেন বিভিন্ন বিষয়ে।

রেশমা এর আগে কখনও কম্পিউটার চালাননি, এখানেই শিখছেন এবং শিখতে তার ভালই লাগছে।

পোশাক কারখানা থেকে ফাইভ স্টার হোটেলে। এই অভিজ্ঞতাটা কেমন, এ প্রশ্নের উত্তরে রেশমা বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘আগে তো আমি এ ধরনের চাকরি করি নাই। প্রথম আসছি, ভাল লাগছে। সবাই ভাল এখানকার’।

আত্মীয়স্বজন কিংবা বন্ধু-বান্ধবরা কি আপনার নতুন চাকরি সম্পর্কে জানতে চান না? এই প্রশ্নের উত্তরে রেশমা জানান, অবশ্যই, সবাই জানতে চায়। আমি একটা কথাই বলি, কোন সমস্যা নেই ওখানে, সবাই ভাল।

রানা প্লাজা ধসের পর ছয়মাস পেরিয়ে গেছে। সেখানে এখন আর ধ্বংসস্তুপ নেই। সেইসময়কার কথা মনে পড়ে কিনা, মনে পড়লে কেমন লাগে জিজ্ঞাসা করা হলে রেশমা বলেন, ‘মাঝে মাঝে মনে হয়, মনে পড়লে খারাপ লাগে। এজন্য সহজে ইন্টারভিউ দিতে চাই না। ভুলে যেতে চাই। ওই সময়টা আসলে মনে করতে চাই না।’

টানা ১৭ দিন ধ্বংসস্তুপের মাঝে আটকা পড়ে থাকা এবং উদ্ধারের ঘটনাটা মনে করতে পারেন?- বিবিসির এ প্রশ্নের উত্তরে রেশমা বলেন, ‘না, আমি কিছুই মনে করতে পারি না। কিভাবে কি হইছে, মনে করতে পারি না। কেমন লাগছে, আমি কোথায়, মনে করতে পারছি না। নিজেও জানতাম না যে, এতোদিন পর বের হইছি’।

দিনের পর দিন আপনি যখন আটকা পড়েছিলেন, আপনার কি মনে হইছিল, বের হয়ে আসতে পারবেন? রেশমা জানান, ‘না, আমার সেসময় মনে হয়নি। চলে আসতে পারবো, মনে হয়নি। আল্লাহর কাছে লাখ লাখ শুকরিয়া যে, তিনি আমাকে বাঁচিয়েছেন’।

রানা প্লাজার জায়গাটায় রেশমার যেতে ইচ্ছা করে কিনা জানতে চাইলে রেশমা বলেন, ইচ্ছা করে ঠিকই। কিন্তু একা একা যেতে পারেন না। এখন তার নয় ঘন্টা ডিউটি করতে হয় ওয়েস্টিনে। সাতটা থেকে চারটা পর্যন্ত।

তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ইংরেজি তো জানতে হয় একটা ফাইভ স্টার হোটেলে কাজ করতে। সেক্ষেত্রে কোন অসুবিধা হচ্ছে কিনা! রেশমা বলেন, সবাই তাকে শিখিয়ে নিচ্ছেন। কিছু কিছু কথা তিনি এরই মধ্যে বলতেও শিখেছেন, যেমন, হ্যালো মেম, হ্যালো স্যার, হাউ আর ইউ, ইত্যাদি। ওয়েস্টিনে যারা আসেন, অনেকে তাকে দেখেই চিনতে পারেন, আবার অনেকে চেনেন না বলেও জানান রেশমা। যারা চিনতে পারেন, তারা তার সাথে কথা বলতে চান।

প্রায় সাড়ে তিন বছর কাজ করেছেন পোশাক কারখানায়। দুর্ঘটনার পর থেকে পুরনো কারও সাথেই যোগাযোগ নেই বলেই জানান তিনি। বিবিসির প্রশ্ন ছিল, রানা প্লাজা ধসের পর এখন পোশাক কারখানা এবং শ্রমিকদের বঞ্চনা নিয়ে নানা কথাবার্তা হচ্ছে। এ নিয়ে রেশমার কোন ভাবনা আছে কিনা! উত্তরে রেশমা বলেন, অবশ্যই আছে। শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তা দরকার, কষ্ট করে অর্জন করা বেতন ঠিকমতো পাওয়া দরকার। আর এগুলো নিশ্চিত করতে পারেন একমাত্র কারখানা মালিকরাই।

ওয়েস্টিনে কাজ না পেলে আবার পোশাক কারখানায় ফিরতেন কিনা জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, না, আর হয়তো যাওয়া হতো না। একটা ভয় ঢুকে গেছে মনে। যদিও এমন ঘটনা সবসময় হয় না, তারপরও ‘বিপদ তো আর বলে আসে না’, সেদিনও তো ‘আমরাও জানতাম না। জানলে তো আর যেতাম না’।

রেশমাকে উদ্ধারে সেদিন নেতৃত্ব দিয়েছিল যে সেনাবাহিনী, তাদের সাথে যোগাযোগ আছে বলে জানান রেশমা। তার মতে, তারা অনেক ভাল। ভাল চাকরি করতে বলেন।

এবারের ঈদটা উনি গ্রামে সবার সাথে করেছেন বলে জানালেন রেশনা। ওয়েস্টিনের মতোন ফাইভ স্টার হোটেলে কাজ করার সুবাদে তার পারিবারিক জীবনে বেশি পরিবর্তন এসেছে বলেও স্বীকার করেন রেশমা। সবচেয়ে বড় কথা, মাকে আর আগের মতো কষ্ট করতে হয় না। রেশমাই দেখেন তাকে।

ওইদিনের দুর্ঘটনায় এগারশরও বেশি শ্রমিক মারা গেছে, অনেকে হাত-পা হারিয়েছে। আপনি উদ্ধার হয়ে ফিরে এসেছেন। এই ঘটনার পর মানসিক ধকল কি কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন পুরোপুরি? রেশমা নিজেকে অনেকটাই সুস্থ দাবি করে বলেন, আসলে ওইসময়ের কথা অনেকটাই আমার মনে নেই। মনে করতেও চাই না।

১৭ দিন পর জীবিত উদ্ধারের পর কেউ কেউ সেটা নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলেছিল, সেই খবরও রেশমার জানা আছে। এসব শুনে তার ভীষণ খারাপ লেগেছে বলে জানান রেশমা। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘সেই জায়গাটিতে আমি ছিলাম। উপরওয়ালা জানে কিভাবে ছিলাম আমি। ওরা তো কেউ জানে না। ওরা না জেনে-শুনেই এসব কথা বলেছে’।

বিবিসি জানতে চায়, এই সমালোচনাগুলোর উত্তর দেওয়া দরকার বলে প্রয়োজন বোধ করেছে কিনা। উত্তরে রেশমা বলেন, এর প্রয়োজন তিনি মনে করেছেন, কারণ ওরা মিথ্যা কথা বলেছে। তবে যারা উদ্ধার করেছে, তারাই তো উত্তর দিয়েছে।

১৭ দিন পর বেঁচে ফিরে আসাটাকে দ্বিতীয় জীবন বলে ধরে নেওয়া যায়। নতুন এই জীবনে রেশমার কি ইচ্ছা, কি স্বপ্ন জানতে চাইলে রেশমা খুব দৃঢ়তার সাথে বলেন, ‘অনেক বড় হতে চাই’।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ১১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.