কফি হাউজের আড্ডাটা!

Friends Shushmi Lopaতানিয়া মোর্শেদ: আনন্দ, লাবণ্য, ঐশ্বর্য্য, স্বর্ণ, শৈবাল আর প্রেমা। ছয় কিশোরী। সেই বালিকা বয়স থেকেই সখ্যতা। কৈশোরে এসে তা চূড়ান্ত রুপ নেয়! একবেলা না দেখলে, আড্ডা না দিলে দিনটাই মাটি! সারাদিন স্কুলে একসাথে ক্লাস করে বাড়ী ফিরবার পথে আড্ডা, বিকেলে আড্ডা। আড্ডা আর আড্ডা! সন্ধ্যের আগ পর্যন্ত শুধু কথা আর হাসি! কখনো ছোটদের নিয়ে মাঠে খেলা আর না হলে মতিহার সবুজের প্যারিস রোড ধরে হাঁটা আর গল্প!
গল্পের আর শেষ নেই! লেখা পড়ায় প্রথম সারিতে থাকা এই ছয়জন যে সব ক্লাসের শিক্ষক সিরিয়াস তাদের ক্লাসে সামনের বেঞ্চে বসবেই। সময় মত পড়া দেওয়া, লেখা ইত্যাদি সেরে ভীষণ শান্ত ভাব নিয়ে শিক্ষকের পড়া শোনার চেষ্টা! আর যেই শিক্ষক একটু অমনোযোগী হয়েছেন, চিরকুট চালাচালি! চোখ মুখ দেখে কেউ বুঝতে পারবে না কী হচ্ছে!

ক্লাসের আরও বন্ধুদের নিয়ে স্কুল শেষে হাত দিয়ে মাছ ধরা, স্বচ্ছ ডোবায়! ছোট্ট ছোট্ট মাছ কখনো হাত দিয়ে, কখনো জামা তুলে তাতেই ধরা। ধরা মাছ ছেরে দেওয়া। আবার মাথায় কি চাপলো, স্বর্ণদের বাড়ীর পিছনের বাগানে মাটি খুঁড়ে পানি দিয়ে রাখবার চেষ্টা। গ্রীষ্মের দুপুরে আম বাগানের আম গাছে চড়ে কাঁচা আম চুরি! কখনো গার্ড এসে বলা, “আপা নামেন। আমার চাকরী খাবেন আপনারা।” আম চুরি করতে করতে কখনো বন্ধুর বাড়ীর গাছ থেকেই চুরি করা!

আরেকটু বড় হবার পর শুরু হলো সাইকেল চালানো! সে যুগে মেয়েদের সাইকেল চালানো দেখা যেত না। আর সেখানে এইট, নাইন, টেন, এমন কি কলেজে পড়া অবস্থাতেও সাইকেল চালানো! কলেজে এসে ছ’ জন দু’ভাগে ভাগ হয়ে গেল! আনন্দ, স্বর্ণ, শৈবাল গেলো শহরের বিখ্যাত কলেজে। আর লাবণ্য, ঐশ্বর্য্য আর প্রেমা অভিভাবকদের কারণে স্কুলের প্রথম ব্যাচে কলেজে ভর্তি হলো। মানে স্কুলটাই কলেজ পর্যন্ত করা হয়েছিল। তিনজন ক্লাস থেকে ফিরবার পথে মাঝে মাঝে শহর থেকে আসা বাস থেকে নামা বন্ধুদের জন্য অপেক্ষা করতো। তারপর শুরু হতো আড্ডা!

মান্না দে’র “কফি হাউসের আড্ডাটা …” গানটার একটা সংস্করণ করেছিল নিজেদের জন্য! লাবণ্য হচ্ছে মঈদুল, সাংবাদিক। ঐশ্বর্য্য ভালো ছবি আঁকতো, সে নিখিলেশ। বন্ধুদের চোখে প্রেমা রুপসী ছিল, তাই তাকে সুজাতা বলতো। যদিও এটা তার পছন্দ ছিল না। রুপ দেখিয়ে টাকাওলা বর জোগাড় করা সেই বয়সেই তার নারীবাদী সত্ত্বার সাথে যেতো না! কবি কবি ভাব আনন্দের ছিল কিন্তু সে নিজেকে রমা রায় বলতো! কারণ রমা রায় প্রেমে ব্যর্থ হয়ে পাগলা গারদে তাই! নিজেকে একটু পাগলাটে ভাবত সে!

শৈবাল আর স্বর্ণ, এই দু’জন ছিল ছ’জনের মধ্যে শান্ত, ভদ্র ভাবের।

কলেজ শেষে আনন্দ, লাবণ্য, ঐশ্বর্য্য দেশের বাইরে চলে যায় পড়তে। দু’জন একই দেশে। দেশে থাকা তিনজনের দু’জন একই বিশ্ববিদ্যালয়ে, ভিন্ন বিষয়ে। প্রেমা একা অন্য জায়গায়। প্রেমার সাথে লাবণ্য আর ঐশ্বর্য্যের বন্ধুত্বটা জন্মের পর থেকেই। বাকীদের সাথে স্কুলে যাবার পর থেকে। তাই প্রেমা বড় একা হয়ে যায়! বিকেলে সে শৈবালের সাথে সময় কাটানো শুরু করে। প্যারিস রোড ধরে হাঁটা প্রায় প্রতিদিন! আর মাঝে মাঝে ছুটির দিনে স্বর্ণ’র সাথে আড্ডা। মাঝে মাঝে বাকী তিনজনের চিঠি বা খবর পাওয়া।

সময় বয়ে চলে, সবার বন্ধু তালিকায় যোগ হয় নূতন নাম। কিন্তু মনের গভীরে রয়ে যায় ছোট বেলার খেলার সাথীর, কিশোর বয়সের বন্ধুরা!

জীবন বদলে যায়, দেশ বদলে যায়, বদলে যায় অনেক কিছু! ভীষণ শান্ত, ভদ্র স্বর্ণের ভাগ্যে জোটে অত্যাচারী বর। তবে অল্প সময়ের জন্য। সেই শান্ত মেয়েটি অল্প সময়ের মধ্যেই নূতন করে পথ খুঁজে নেয়! আজ সে অনেক ভালো আছে। তবে সেই বর তার অটিস্টিক ছেলেটিকে মা’কে দেয় না! বিয়ে কখনোই করবো না এমন ধারণা করা ঐশ্বর্য্য সবার আগেই বিয়ে করে বসে! না সে ভালো আছে। নিজের কাজের জায়গায় নাম করছে।

তবে ছবি আঁকে না! লাবণ্য ব্যস্ত নিজের জীবনের যুদ্ধে। কোনো লেখা পড়বার সময় তার নেই! শান্ত ভদ্র যে মানুষটিকে ভেবেছিল জীবনের সাথী, তার মনটা বড় অসুন্দর। স্বর্ণ’র মত বুদ্ধিমতী হতে তার অনেক অনেক বৎসর লাগে! শৈবাল ভালোই আছে। শুধু কি যে কারণে নিজেকে সবার থেকে গুটিয়ে নিয়েছে তা এক রহস্য! কোনো বন্ধুর ডাকে সাড়া দেয় না! বন্ধুরা ভাবে, আমি কি কোনো ভুল করেছি?! এক সাথে সব বন্ধু কি একই ভুল করতে পারে? জানা নেই! ভীষণ অ্যাক্টিভ আনন্দ আজ যুদ্ধ করছে নিজের মনোজগতের সাথে! অসুখটা না কি অনেক অনেক বৎসর ধরেই ছিল, কেউ বুঝেনি! Tania Lopa

প্রেমা রুপ দেখিয়ে নয়, অনেক অনেক বৎসরের ভালবাসার মানুষটিকেই বিয়ে করেছে। গাড়ী-বাড়ীও হয়েছে। কিন্তু সে সুজাতা না হয়ে অমল হয়েছে! জীবন তাকে ক্ষমা করেনি। অমলের যেমন কোনো কবিতা কোথাও ছাপা হয়নি, তার জীবনটাও সেরকম! প্রায়ই সে ভাবে কবে সে অমল থেকে ডি সুজা হয়ে যায়!

লেখক যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.