একটি আতংকের দিনের শুরু

bgbউইমেন চ্যাপ্টার: কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার হয়ে আসার পথে বিজিবি সদস্যদের বহনকারী কনভয় চোখে পড়লো। কোথায় যাচ্ছে এরা? তখনই মনে হলো, কাল না সমাবেশ বিএনপির! সমাবেশের স্থান নিয়ে তখনও সংশয় যায়নি। আদৌ সমাবেশ হবে কিনা, হলে কোথায় হবে, নয়াপল্টন, নাকি সোহরাউয়ার্দী উদ্যান, সব ঘুরছে মাথায়।

এদিকে বিএনপি নেত্রীও বলে দিয়েছেন, ২৫ অক্টোবর থেকে এই সরকার ‘অবৈধ’, সুতরাং এর পতন ঘটাতে দরকার দুর্বার আন্দোলনের।

কিন্তু এই আন্দোলন সফল করতে কি প্রস্তুতি নিয়েছে বিএনপি? প্রস্তুতি থাকুক বা নাই থাকুক, সাধারণ মানুষ শান্তিপ্রিয়। তারা ঘরকুনো হয়ে পড়েছেন, পরিকল্পনা করছেন শুক্রবার সারাদিন কোথাও যাবেন না। পরিস্থিতি বুঝে ব্যবস্থা। ছেলেপিলেদের কোচিং বন্ধ।

সবার মনেই এক প্রশ্ন, ২৫ শে অক্টোবর আসলেই কি হতে যাচ্ছে দেশে? একথাটি গত কয়েকদিন ধরেই মানুষের মুখে মুখে ফিরছে। আসলেই কিছু হবে কিনা তা জেনে বা না জেনে বা আগাম সতর্কতা হিসেবে দেশের বিভিন্ন জেলায় সভা-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। নামানো হয়েছে বিজিবি প্লাটুন। সাধারণের চোখে এটা সহিংসতারই আভাস দেয়।

ব্যবসায়ী হোসেন মোহাম্মদ ঈদের আগে বাড়ি যাওয়ার সময় বলে গেছেন, ফিরবেন ২৪ তারিখের আগেই। কেন জিজ্ঞাসা করাতে উত্তর দিয়েছিলেন, ২৫ তারিখের পর যদি আর ঢাকায় ফিরতে না পারি?

ভারতে পড়াশোনা করে সীমন্তি। একবছর পর দেশে আসবে। বার বার মাকে জিজ্ঞাসা করছে, ঠিকমতো ফিরতে পারবো তো আবার? শুনলাম, লাগাতার হরতাল হবে, যদি সমস্যা হয়? নতুন পাসপোর্ট করবো, এসব হবে তো? অনেক শংকা নিয়ে সে টিকেট কেটেছে দেশে আসার।

বাসাবাড়িতে কাজ করেন যে খালা, সেও তার দুই ছেলেকে বৃহস্পতিবার গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছেন, কাল কি হয়-না হয়, সেই আশংকায়।

শংকা থেকেই যায় মনে। বৃহস্পতিবার দুপুর থেকেই অসম্ভব রকমের খালি মনে হতে থাকে রাজধানীর রাস্তাঘাট। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাশ দিয়ে বিজিবি ট্রাক চলে যেতে দেখে রিকশাওয়ালার মন্তব্য, ‘হুদাই বাড়াবাড়ি। নেতারা তো সব অফিসেই ঢুইকা থাকবো, মরবো খালি সাধারণ মানুষজন’। তার কণ্ঠে খেদ। তিনি আরও বলেন,’ যে কেউ একজন নির্বাচন করে ফেললেই তো পারে, আমাগো কাছে তো সবাই এক, যেই লাউ, হেই কদু’।

নির্বাচনের দিন গণনার শুরুতে শুক্রবার দুই প্রধান দলই পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি দিয়েছিল। বিএনপি সমাবেশের অনুমতি পেয়েছে, আওয়ামী লীগ পায়নি। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এর কমিশনার বেনজীর আহমেদ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, বিশৃঙ্খলার আশংকায় আওয়ামী লীগকে অনুমতি দেওয়া হয়নি। আওয়ামী লীগও সব মেনে নিয়ে সমাবেশের প্রস্তুতি থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। তবে এটাও বলেছে যে, ‘জানমালের রক্ষায় ঢাকার বিভিন্ন পয়েন্টে তাদের নেতাকর্মীরা অবস্থান নেবেন’। তার মানে মাঠে তাদের সদর্প উপস্থিতি থাকছেই।

বিরোধী দলের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে যে কোনো বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছে তারা। আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও যুবলীগ এবং ঢাকার দলীয় সাংসদের এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর বাইরেও ছাত্রলীগকে জুমার নামাজে অংশ নিতে বলা হয়েছে।

একদিকে বিরোধী দলের সরকার হটানোর আন্দোলন, অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দলের জানমাল রক্ষার প্রতিশ্রুতির মধ্যে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে উত্তেজনা।

সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনের ফলে সংসদের মেয়াদ শেষের আগের ৯০ দিনের মধ্যে অর্থাৎ ২৫ অক্টোবর থেকে ২৪ জানুয়ারির মধ্যে আগামী সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা। সে হিসাবে শুক্রবার থেকেই শুরু হচ্ছে দিন গণনার পালা। আর প্রথমদিনের সমাবেশ ডেকে বিএনপি উত্তেজনায় ঘি ঢেলে দিয়েছে। বিএনপি বলছে, যে কোনো মূল্যে তারা তাদের পূর্ব নির্ধারিত সমাবেশ করবে। এই সমাবেশ থেকে খালেদা জিয়ার চূড়ান্ত আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণার কথা রয়েছে।

আশংকা-উৎকণ্ঠার মধ্যে বিকেল থেকেই রাজধানীর আসাদগেট, নিউমার্কেট, চানখারপুল, প্রেসক্লাব, বঙ্গবাজার, রায় সাহেব বাজার রোড, নর্থ সাউথ রোড, পল্টন, শান্তিনগর, মালিবাগ, মতিঝিল, মহাখালী ‍এলাকা ঘুরে গাড়ি চলাচল কমে যেতে দেখা গেছে, দোকানপাটও বন্ধ হয়ে যায় সন্ধ্যার আগেই।

বিভিন্ন সড়কের মোড়ে মোড়ে চলছে পুলিশের তল্লাশি। মোটরসাইকেল আরোহীদের ব্যাপক পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের শিকার হতে হচ্ছে।

পুলিশ জানিয়েছে, ২৫ অক্টোবর ঘিরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তল্লাশি অভিযান জোরদার করা হয়েছে। পল্টন থানা এলাকায় মোট সাতটি অস্থায়ী নিরাপত্তা চৌকি কাজ করছে।

বুধবার রাজধানীর দক্ষিণখান থানা ও টঙ্গী থানা এলাকার খুব কাছে কয়েকটি হাতবোমা বিস্ফোরণের পর রাজধানীর প্রত্যেকটি থানা এলাকায় পুলিশকে সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের রমনা অঞ্চলের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার আনোয়ার হোসেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার বেনজীর আহমেদ সংবাদ ব্রিফিঙে বলেছেন, যেকোনো ধরনের ‘বিশৃঙ্খলা্’ ঠেকাতে সর্বোচ্চ সর্তকতা নেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীরও সংসদে বলেন, “দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা বিনষ্টের সঙ্গে জড়িতদের দমনে রাষ্ট্র তার সর্বশক্তি নিয়োগ করবে।”

ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, বরিশাল, সিলেট, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, খুলনা, নাটোর, ফেনী, খাগড়াছড়িতেও সভা সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। বিএনপি এসব স্থানে পাল্টা সমাবেশেরও ঘোষণা দিয়েছে। এসব স্থানে নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি বিজিবি মোতায়েন রয়েছে দুপুরের পর থেকে। থানাগুলোতেও সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে পুলিশ সদস্যদের।

এদিকে ১৮ দলের শরিক জামায়াতে ইসলামী এক বিবৃতিতে ২৫ অক্টোবর ঢাকা মহানগরীর জনসভাসহ সারাদেশের সকল জেলা ও উপজেলায় ঘোষিত শান্তিপূর্ণ জনসভা-সমাবেশের কর্মসূচি সর্বাত্মকভাবে সফল করার জন্য রাজধানী ঢাকা মহানগরবাসীসহ সারাদেশের জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

পাশাপাশি তারা অভিযোগ করেছে, সরকার রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে জামায়াত-শিবির, বিএনপি ও ১৮ দলীয় জোটের নেতা-কর্মীদের গণ গ্রেপ্তার করছে।

নাশকতার আশঙ্কায় বৃহস্পতিবার বগুড়া, গোপালগঞ্জ, বরিশাল, বাগেরহাট ও নরসিংদীর বিভিন্ন এলাকা থেকে বিএনপি, জামায়াত-শিবিরের ১৩ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

বগুড়ায় আজিজুল হক বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতিসহ তিন নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় জামায়াতের আমির, বরিশালের গৌরনদী উপজেলায় উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতিসহ তিন নেতা, বাগেরহাটে জেলা ছাত্র শিবিরের সভাপতি ও জেলা ছাত্র কল্যাণ সম্পাদক এবং নরসিংদীতে বিএনপি ও জামায়াতের চার নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।  অন্যান্য এলাকা থেকেও গ্রেপ্তারের খবর আসছে।

সবমিলিয়ে একটা থমথমে অবস্থা নিয়ে শুরু হচ্ছে নতুন একটা আতংকের দিনের।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.