‘কি লিখি তোমাদের আমি’

আঙ্গুর নাহার মন্টি: আমার বন্ধু আইরিন নিয়াজী মান্না‘র অনুরোধ একটি লেখা লিখতে হবে। আর সেটি সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখতে হবে। ভেবেছিলাম এ আর এমন কি! কিন্তু লিখতে বসেই বুঝলাম বিষয়টি অতো সহজ নয়। কি লিখবো আমি? ঘরকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে আজও পূর্ণ সাংবাদিকই হতে পারলাম না। নিজের পরিচয় দেই, আধা সাংবাদিক-আধা গৃহিনী বলে। ভাবছেন আফসোস করছি, মোটেও না। উপরন্তু এর মানে এই নয় যে, আমি পরিবার ও কর্মক্ষেত্রে যর্থার্থ দায়িত্ব পালন করছি না। আমি দু‘জায়গায়ই ভারসাম্য রক্ষার কাজটি নিজের ইচ্ছায় বাস্তবায়ন করছি। কারণ, আমার পরিবার আর সাংবাদিকতা দুটোই চাই। একটার জন্য আরেকটিকে ছাড় দেয়া যাবে না। আমি জানি, একই অবস্থা প্রতিটি কর্মজীবি নারীর। প্রতি ক্ষনে পরিবার আর পেশার নিত্তিটির সমতা রক্ষা করেই সবাই এগিয়ে চলেছেন। আর এই এগিয়ে চলার পথে ঘরে-বাইরে আমার কাজে সহযোগিতা কতটা পেয়েছি তার মূল্যায়নের চেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, বাধা পাই নি কখনো। আর তাই তো সাংবাদিকতায় এখনো টিকে আছি।

আমার অভিজ্ঞতার ঝুলিতে নেই বড় কোন লড়াই-সংগ্রাম বা বিজয়ের চমকপ্রদ কাহিনী। নেই অসহযোগিতার কথাও। ভাগ্যবান আমি, সহকর্মী-বন্ধুদের বিরোধিতার মুখোমুখিও হইনি কখনো। বরং বিপদে না চাইলেও পাশে পেয়েছি তাদের বাড়িয়ে দেয়া হাত। তবে আমার আত্মবিশ্বাস আর সৎ সাহস বরাবরই প্রবল যা হয়তো কাউকে অনুপ্রানিত করতে পারে। ওই অতটুকু প্রাপ্তির প্রত্যাশায় অন্য দশটি মেয়ের মতোই সংসার আর পেশার ভারসাম্য রক্ষা করে চলা আমার সাদামাটা গৃহিনী-সাংবাদিকের গল্পটাই লিখছি।

অভিজ্ঞতার কথা লিখতে গেলে আগে বলতে হবে কিভাবে আমি সাংবাদিক হলাম। ছোটবেলা থেকে লেখালেখির অভ্যাস ছিল। সমাজের বৈষম্য আর ত্রæটি-বিচ্যুতি তুলে ধরতেই আমার সাংবাদিক হওয়া। তাই ভাল স্কোর থাকা সত্তে¡ও বাবা-মায়ের ইচ্ছাকে (মা চেয়েছিলেন আইনবিভাগে আর বাবা চেয়েছিলেন ইংরেজী বিভাগে ভর্তি হই) ভুলে গিয়ে ভর্তি হয়েছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে। আর ১৮ বছর বয়সের পর বাবাকে আমার ব্যয়ভার থেকে মুক্তি দিব, যাতে তিনি ভাই-বোনদের প্রতি একটু বাড়তি মনোযোগ দিতে পারেন-এই প্রত্যয় থেকেই অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে উঠামাত্রই আজকের কাগজ, ভোরের কাগজ ও সাপ্তাহিক অনন্যা‘য় ফ্রি-ল্যান্সার হিসেবে কাজ শুরু করি। প্রথম থেকেই আমার কাজের প্রশংসা পেয়ে আমার আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে যায়। তাইতো এক বছরের মধ্যে বাংলার বানীতে স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে জয়েন করি। এরপর টানা চার বছর কাজ করি ওখানে। শিক্ষার্থী অবস্থায় ফুলটাইম কাজ করতে গিয়ে বিড়ম্বনায়ও পড়তাম। কারো তদবিরেই আমি চাকরি পেয়েছি, এটি ধরে নিয়েই নানাজনের নানারকম পরীক্ষা দিতে হতো। মর্যাদার লড়াই আমি ছোটবেলা থেকেই লড়তে অভ্যস্ত। তার ওপর কথায় নয় কাজে প্রমাণ দেওয়ার কৌশলে বিশ্বাসী আমি হেসেখেলেই ওইসব পরীক্ষা দিতাম। তাই সব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রমাণ দিতাম তদবিরে নয়, যোগ্যতায় আমি আপনাদের সঙ্গে কাজ করছি। আমার ভদ্র, বিনয়ী, পরোপকারী, স্পষ্টবাদিতা ও চঞ্চল ব্যবহারের কারণে অকুণ্ঠ ভালবাসাও পেয়েছি সবার। দেশের অন্যতম পুরাতন দৈনিকটি বন্ধ হয়ে গেলে তিন বছর কাজ করিনি। কিন্তু ওই তিন বছরে আমার বাংলার বানী‘র সহকর্মীরা (বিশেষ করে সুভাষ চন্দ বাদল, জাহাঙ্গীর আলম লিটন ও ফাতিমা তামান্না) আমায় ভুলেননি একটি দিনও। কোথাও সুযোগ আছে জানলেই আমায় ফোন দিয়ে জানাতেন। আর প্রয়াত শফিকুল আজিজ মুকুল (আমার প্রিয় মুকুল কাকু, এখনো আমি অবচেতন মনে তার মামনি ডাকটি শুনতে পাই) কাকু বলতেন, ‘মামনি, বসে থেকো না। তুমি ভাল কাজ কর। যেখানেই যাবে তোমাকে নিয়ে নিবে। দরকার হলে আমার রেফারেন্স দিও।’ সবাইকে শুধুই বলতাম, অনেক কাজ করেছি। এবার একটু জিরিয়ে নেই।

আসলে ওই সময়টাতে আমি সংসার গুছিয়ে নিয়েছি। আমার মেয়ে তোড়া‘র জন্মের পর ২০০৩ সালে কিছুদিন আজকালের খবর এবং ২০০৪ সাল থেকে ভোরের কাগজ‘এ কাজ করছি। মাত্র তিনদিনের মধ্যে দিনরাত শ্যামল দা‘কে (ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত) ফোন করে জয়েন করার কথা মনে পড়লে আজো হাসি পায়। দাদার নম্বরটাও লিটন ভাই-ই (বর্তমানে প্রথম আলোতে আছেন) দিয়েছিলেন। প্রথম দিন ফোন করে পরদিন সকালেই জীবনবৃত্তান্তসহ আবেদন পত্র দিয়ে আসি। পরে বিকেলে ফোন করে সিদ্ধান্ত জানতে চাই। অবাক শ্যামলদা বলেন, ‘আপনাকে জানানো হবে।’ রাতে দেই আবার ফোন। আর প্রতিটা ফোনই করেছিলাম, আমার প্রিয় লিটন ভাইয়ের তাগিদে। পরে জেনেছিলাম, আমার বাংলার বানীর সহকর্মীদের যারা শ্যামলদা‘র সঙ্গে ঘনিষ্ট, তাদের এমন কেউ বাদ নেই যে শ্যামল দাকে আমার জন্য ফোন করেন নাই বা মুখে বলেন নাই। ওইসময়ে মহাবিরক্ত হওয়া সেই শ্যামলদা গত ৯ বছরে স্নেহ-সহযোগিতা-পদমর্যাদা দিয়ে আমাকে আজকের অবস্থানে দাঁড়াতে সক্ষম করেছেন। সেইসঙ্গে সুকান্ত গুপ্ত অলকদা, সালমা ইয়াসমিন আপা (আমার কন্যার প্রিয় রিতা খালামনি), প্রয়াত জহিরুল আহসান টিপুভাই, ইখতিয়ার উদ্দিন, রাশেদ আলীসহ ভোরের কাগজ পরিবার তো বরাবরই আমার পাশে রয়েছে। অলকদা ও রিতা আপা আজ ভোরের কাগজে নেই, কিন্তু যোগাযোগ ও অন্তরের টানটা ঠিকই আছে। শুরু থেকেই ভোরের কাগজ‘এ কম বেতন নিয়ে আমার অসন্তোষ থাকলেও কেমন করে জানি এটি আমার বর্ধিত পরিবার হয়ে গেছে। আমার বাসা আর অফিসের তফাৎটা-ই কখনো বুঝতে পারিনি। শ্যামলদা সম্পাদক হয়েও আমাদের কাছ থেকে এতটুকু দূরে সরে যাননি। যে কেউ যে কোন প্রয়োজনে যখন-তখন দাদার স্মরণাপন্ন হই। তিনি বাড়ির অভিভাবকের মতোই আগলে রাখেন সকলকে। কোন প্রয়োজনে রিকমেন্ডেশন লেটারে একটি সই দিতে প্রচন্ড জ্বর নিয়েও দাদা আমার জন্য অফিসে এসেছেন। এমন আন্তরিক সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কমই হবে। আর তাই-তো নিজের বাড়ি আর কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ যখন সমান্তরালে চলে আসে তখন বিশাল অংকের বেতনের মোহ ছাড়া অন্যত্র আর যাওয়া হয়ে উঠে না। এই সত্যিটি আমি প্রতিনিয়ত অনুভব করি।

একটি ব্যাপার না বললেই না, যখন যে বিটে কাজ করেছি নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সহযোগীতা পেয়েছি। সহযোগীতা করেছি তো বটেই। নিজের ব্যক্তি ও কর্ম জীবনের ক্ষেত্রে গোড়া থেকেই সকলের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করি। বিনিময়ে ভাল ব্যবহার পাই অনেক বেশি। অন্যদের কাছে শোনা চরম বেয়াদব কিসিমের লোকটাও আমার সঙ্গে খুবই ভাল ব্যবহার করেন। ক্রেডিট নিজেকেই বেশি দিব, কারণ ভাল ব্যবহারটি যে আমি-ই আদায় করি। এজন্য আমার মাতৃতুল্য মাহমুদা চৌধুরী আপা প্রায়ই বলেন, আমি নাকি রাগও করি যুক্তি আর মিষ্টি ভাষায়।

ওরে, এ লেখায় যদি আমি আমার প্রিয় গড সিসটারদের (অবশ্যই ইতিবাচক অর্থে) কথা না বলি, সেটি খুবই অন্যায় হবে। সিনিয়র সাংবাদিক মাহমুদা চৌধুরী, ঢাকার আমেরিকান সেন্টারের প্রেস ও তথ্য বিভাগের প্রধান মেরিনা ইয়াসমিন এবং ইত্তেফাক’র শিফট ইন চার্জ ফরিদা ইয়াসমিন- আমার এই তিন আপা আমার আত্মবিশ্বাসকে আরো মজবুত করতে প্রতিনিয়ত সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন। তাদের সহযোগিতায় আমি নিজের ভেতর অন্য আমিকে উপলব্ধি করি। পেশাগত উৎকর্ষতা বিকাশে তো বটেই, আমার ব্যক্তিজীবনের সমস্যাগুলো মোকাবেলায়ও তারা পাশে দাঁড়ান। ভাই-বোনদের সকলের বড় আমি পেশাগত জীবনে এমন বড় বোনদের সান্নিধ্য পেয়ে ধন্য হয়ে গেছি। আর সেই জন্যই হয়তো অনেক সময় তাদের কাছে আমার আবদারের সীমাও লংঘণ করে ফেলি।

এবার বলবো তোদের, তোমাদের আর আপনাদের কথা। বন্ধুভাগ্য আমার বরাবরই ভাল। টক-মিষ্টি-ঝাল এই জীবনে বন্ধুও কম পাইনি। কর্মজীবনেও বন্ধুত্বের তালিকাটি আরো সমৃদ্ধ হয়েছে। সাংবাদিকতায় সকলের সঙ্গে বেশ ভাল সম্পর্ক থাকলেও আত্মার আত্মীয় হয়েছে প্রথম আলোর সিনিয়র রিপোর্টার মানসুরা হোসাইন মুন্না ও জনকন্ঠের সিনিয়র রিপোর্টার নাজনীন আখতার তন্বি। ওরা আজ আমার পরিবারের সদস্য। আমার ও আমার পরিবারের যে কোন বিপদে পাশে দাঁড়ান এই দুই ফেরেশতা। হতবিহ্বল পরিস্থিতিতে মানসিক সাপোর্ট দেন। ব্যক্তিগত বিষয়ে নাক গলান। বরের সঙ্গে ঝগড়ায় ভাইজানের পক্ষ নেন। একে অপরের প্রতি র্নিভরশীলতা; ছোটখাট বিষয়ে ভুল বোঝাবুঝি; পরক্ষনেই ভুলে যাওয়া; খুনসুঁটি, দুষ্টুমি, বোকা বানানো সব কিছুই বহমান। যদিও বিট পরিবর্তনের কারণে মুন্নার সঙ্গে কালে-ভদ্রে দেখা মেলে, যোগাযোগটা কিন্তু নিয়মিতই হয়। একই বিটে কাজ করার সুবাদে তন্বিকে ছাড়া এক পা-ও নড়তে চায় না আমার। তন্বি আপার কথা কি বলবো! যখন যা বলি, এই মেয়ে বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নেয়। ধরুন যদি তন্বিকে বলি, ‘জাহান্নামে যাই, যাবা নাকি?’ আমি নিশ্চিত ও বলবে, ‘চলো যাই।’ অথচ মুন্না হলে জবাব আসবে, ‘মাথা ঠিক আছে তো?’ এছাড়াও রিতা আপা (আমার অবর্তমানে আমার কন্যার অভিভাবক), অলকদা, ছোটভাই সোহেল রহমান, নজরুল ইসলাম মিঠু ভাই, জায়েদুল আহসান পিন্টু ভাই, শারমিন রিনভী আপা, ফারজানা রূপা, শাহেদ চৌধুরী ভাইসহ আরো অনেককেই আমি প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে পাশে পেয়েছি। মাঝে মাঝে ভাবি, এত ভালবাসার ঋণ আমি শোধবো কি করে!

এতো গেল আমার কথা। কিন্তু আমার একার অভিজ্ঞতাই কি আমার অভিজ্ঞতা। মোটেও না। এখন বলতে চাই আমার উপলব্ধির কথা। যে উপলব্ধির পরতে পরতে জড়িয়ে আছে নারী সাংবাদিকদের নানান অভিজ্ঞতা।

বিভ্রান্ত আমার উপলব্ধি

আমি সাংবাদিক না নারী সাংবাদিক। নিজের কর্মক্ষেত্রে এটি আমি কোনদিনও টের পাইনি। অনেক হাউজের তুলনায় আমাদের বেতন কম তা সত্য। তবে সেটি নারী বা পুরুষ সাংবাদিক হিসেবে নয়। অফিসে আমি সাংবাদিক হিসেবে যথাযথ দায়িত্ব পালন করি। আর নারী হিসেবে ঘর-সামলানোর অধিকারও নিশ্চিত করি। তারপরও আমি বিভ্রান্ত হই। বিভ্রান্ত হয় আমার উপলব্ধি। পুরো সাংবাদিকতা জগতের নারীর পরিস্থিতি আমাকে বিভ্রান্ত করে। কারণ, আমার চেয়ে ৫/৭ বছরের ছোট অনেককেই যখন বিশেষ প্রতিনিধির সীমানা ছাড়িয়ে চীফ রিপোর্টার আর বার্তা সম্পাদকে উন্নীত হতে দেখেছি, তখন একইসঙ্গে আমাদের সবার প্রিয় মাতৃতুল্য মাহমুদা চৌধুরী আপাকে জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক থেকে আর উপরে উঠতে দেখিনি। বছরের পর বছর দিনকাল’র জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক থেকে আমাদের মাহমুদা আপা আজ অবসর জীবনযাপন করছেন। আর অত্যন্ত মেধাবী সুপ্রীতি ধর দিদির তো সবখানেই চাকরি নিয়ে টানাটানি। সুপ্রীতি বেশী প্রতিবাদী। তিনিা জার্নালিস্ট কম, এক্টিভিস্ট বেশী-এই তার দোষ। এইগুলো যে একজন মানুষ হিসেবে কতবড় গুন সেটি আমরা বিবেচনাও করি না। তাইতো আমার চোখেও সুপ্রীতি দি‘র সংবেদনশীলতা, মানবিকতা, প্রতিবাদ বাড়াবাড়িই ঠেকে। গায়ে পড়ে ফোন করে পরামর্শ (ওটা রীতিমতো বকাবকি) দেই, ‘তোমার এতো মানুষের চিন্তা করার দরকার কি? চাকরি গেলে বাচ্চাদের কি হবে? বারবার কেন একই দুর্ভোগ টেনে আন তুমি?‘ সুপ্রীতি দি বরাবরই বলেন, ‘ঠিক ই বলেছিস। আর এ ভুল হবে না।‘ কিন্তু কে শোনে কার কথা! চাকরি যায়, চাকরি আসে। দিদির চিরকালের সুচর্চা বদলায় না।

অন্যদিকে ভাল লাগে মুন্নী সাহা দিদিকে নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে দেখে। কিন্তু সাংবাদিকতায় নারীর অগ্রযাত্রায় মাইলফলক স্থাপনকারী মুন্নী দি আজকের অবস্থানে আসতে কি কম পরীক্ষা দিয়েছেন? যদিও মেধা, যোগ্যতা আর কঠোর পরিশ্রমে তিনি আজ উজ্জ্বল অনুপ্রেরণা।

নারী সন্তান ধারণ ও জন্ম দিবে এটিই স্বাভাবিক। আর এজন্য কর্মক্ষেত্রে সুযোগ-সুবিধা পাওয়া আমাদের অধিকার, কারো দয়া অবশ্যই না। অথচ নারী সাংবাদিকদের অনেককেই দেখেছি সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে দিনরাত কাজ করেও চাকরি রক্ষা করতে পারেন নাই। অথচ ওইসব গণমাধ্যমের কর্তাব্যক্তিদের নারী অধিকার নিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও টেলিভিশনের ‘টক শো’র বড় বড় বক্তব্য শুনে আমারই লজ্জা লাগে। আজ একথাগুলো লিখছি একারণে, নিজের চোখে দেখেছি তাসলিমা মিজি বহ্নি আর আলফা আরজুকে গর্ভাবস্থায় কঠোর পরিশ্রম করতে। দেখেছি বুদ্ধিমান আলফাকে ঠিক সময়ে চাকরি বদল করতে, দেখেছি বহ্নির মতো ভাল রিপোর্টারকে সাংবাদিকতা থেকে ঝড়ে যেতেও। মানতেই পারি না, আমি কাজ করবো সাংবাদিক হিসেবে, আর মূল্যায়িত হবো নারী সাংবাদিক হিসেবে। বাস্তবা হচ্ছে, আমরা মেনে নিচ্ছি। মানতে বাধ্য হচ্ছি।

এতো হতাশার সঙ্গে আরো আশ্চর্য হই, যখন শুনি কোন হাউসের কোন নারী সহকর্মীর নানাভাবে হয়রানি হওয়ার কথা। নারী সাংবাদিকদের সঙ্গে নাকি স্থুল আচরণ-কথাবার্তাও হয়। নারী সহকর্মীকে ডেকে সামনে বসিয়ে রাখা হয় ঘন্টার পর ঘন্টা। প্রতিবাদ করলে নাকি চাকরি যায় মেয়েটির। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিবাদ করার চেয়ে চাকরি ছেড়ে দেওয়ার কথাই বেশি জেনেছি। অনুমতি ছাড়া এখানে আমি ওইসব নারী সহকর্মীদের নাম লিখছি না। কিন্তু আধাডজন বিব্রতকর ঘটনার কথা শুনে ভাবছি, এসব ঘটনা মোকাবেলা আর ওইসব অসভ্য সহকর্মীর মুখোশ উন্মোচণে জন্য নারী সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ দেয়া উচিত! এ বিষয়ে আমার স্পষ্ট অভিমত, সরাসরি এমন অসংবেদনশীল আচরণ প্রতিরোধের বিকল্প নেই। কারণ আমার অভিজ্ঞতায় এমন স্থুল মানসিকতার সাক্ষাৎ না মিললেও এদের সংখ্যা বেশি নয়। আর আমি বিশ্বাস করি, সরাসরি প্রতিবাদে নারী সহকর্মীর পাশে দাঁড়াবে বেশিরভাগ সহকর্মীই।

আসলে, কেউ আমাকে নারী সাংবাদিক বললে যতই খেপি না কেন, বাস্তবতা হচ্ছে আমি নারী। অন্যের অধিকারের লড়াইয়ের সহযোগিতায় আমার কলম যত দ্রুত চলে, নিজের অধিকার রক্ষায় ততই আমি শ্লথ। কিছু অফিসের ভাল পরিবেশ তো ব্যতিক্রম, উদাহরণ নয়। আমি উদাহরণ দেখতে চাই, ব্যতিক্রম নয়। ইতিবাচক উদাহরণের অভাবেই তো দীর্ঘ দেড়যুগ সাংবাদিকতার পথ পাড়ি দিয়ে আমি বিভ্রান্ত হই সাংবাদিক হিসেবে আমার আগামী দিনের লক্ষ্য নির্ধারণে। আগামী ৫ বছর পর আমি নিজেকে কোথায় দেখতে চাই? সাংবাদিকতার সিদ্ধান্ত গ্রহনে অদূর ভবিষ্যতে আমার জন্য কি কোন সম্মানজনক আসন অপেক্ষা করছে? নাকি যেখানে আছি সেখানেই থমকে থাকবো? নাকি মাহমুদা আপার মতো অবসর নিতে হবে? তাই-তো ভাবি, সাংবাদিকতার মতো মহান পেশার নীতি নির্ধারকরা কবে বুঝবেন যে, শুধু ছেলেরাই নন, মেয়েরাও বয়স বাড়লে অভিজ্ঞ, দক্ষ ও আরো যোগ্য হন?
নতুনদের জন্য কিছু টিপস: প্রথম থেকেই প্রফেশনাল হতে হবে। পত্রিকায় নিজের নাম বা টিভিতে চেহারা দেখানোর জন্য বিনা বেতনে কাজ করা যাবে না। যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ দেয়া যাবে না। নিজেকে গড়ে তুলতে হবে নিজেকেই, এক্ষেত্রে পড়াশুনার বিকল্প নেই। কোন এসাইনমেন্ট না করেই ‘পারবো না’ বলা যাবে না। নিজের মর্যাদা ও অধিকারের বিষয়টি একমুহুর্তেও জন্যও ভুলে যাওয়া যাবে না। অন্য নারী সহকর্মীকে নিজের মতোই সম্মান করতে হবে। এটি বলছি এ কারণে, সহকর্মীদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টির জন্য নারীর বিরুদ্ধে নারীকে ব্যবহার করার পুরনো অপকৌশলের চর্চা এখনও চলছে। এই অপচর্চার জন্যই ভাল কাজ করা সত্ত্বেও নারীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধুই নারীর সঙ্গে চলছে। তাই এ ফাঁদে পা দেওয়া যাবে না কোনক্রমেই। তা না হলে সীমিতই থাকবে এগিয়ে চলার পথ।
(বি: দ্র: এ লেখাটিতে একান্তই আমার অভিজ্ঞতা ও ভাবনাগুলো তুলে ধরেছি। কাউকে আঘাত করা আমার উদ্দেশ্য নয়)।

লেখক পরিচিতি: কূটনৈতিক প্রতিবেদক ও ডেপুটি চিফ রিপোর্টার, দৈনিক ভোরের কাগজ।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.