কফি হাউজের আড্ডাটা ভেঙ্গেই দিলেন তিনি

Manna Deyউইমেন চ্যাপ্টার: কফি হাউজের সেই আড্ডাটা সত্যি সত্যিই ভেঙ্গে দিয়ে তিনি শেষপর্যন্ত চলে গেলেন। অনেকদিন ধরে যাই যাই করেও রয়ে গিয়েছিলেন আমাদের মাঝে। একজন শিল্পী যখন একজন মানুষের ঊর্ধ্বে উঠে কেবলই শিল্প হয়ে উঠেন তার জ্বলজ্বলে উদাহরণ ভারতীয় উপমহাদেশের প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী মান্না দে। তিনি আর নেই। দীর্ঘদিন অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করে বৃহস্পতিবার ভোরে ব্যাঙ্গালোরের একটি হাসপাতালে তিনি মারা যান। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর।

তাঁর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আজ অন্য সঙ্গীতশিল্পীরা বলছেন, তিনি নিজেই ‘গান’ ছিলেন, গানকে তিনি ধরেননি, গান তাঁর গলায় ধরা দিয়েছিল নিজস্ব মহিমায়। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বললেন, তাঁর মৃত্যুতে একটি যুগের অবসান হলো।

গত পহেলা মে এই প্রখ্যাত গায়কের ৯৪তম জন্মদিন পালন করা হয়। এবারের জন্মদিনে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে মান্না দে কে ‘বিশেষ সংগীত মহাসম্মান’ দেয়া হয়।

শিল্পী সেদিন তাঁর সাথে দেখা করতে যাওয়া পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীকে জানান, স্ত্রী সুলোচনার স্মৃতিতে কিছু গান রেকর্ড করার জন্য অসুস্থ শরীরেও তিনি কলকাতায় ফিরতে চান। কিন্তু শেষ চাওয়া আর পূরণ হলো না।

১৯৫০ থেকে ১৯৭০ এর দশকে ভারতীয় চলচ্চিত্রে গান গেয়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা এই শিল্পীর জন্ম ১৯১৯ সালে। পরিবারের দেয়া নাম প্রবোধ চন্দ্র দে হলেও ভারতীয় উপমহাদেশের সংগীতপ্রেমীরা তাঁকে ‘মান্না দে’ নামেই পরিচিত করে তুলেন।

হিন্দি, বাংলা, মারাঠি, গুজরাটিসহ অজস্র ভাষায় গান গেয়েছেন ষাট বছরের বেশি সময় ধরে। বৈচিত্র্যের বিচারে তাঁকেই হিন্দি গানের ভুবনে সবর্কালের সেরা গায়ক হিসেবে স্বীকার করে থাকেন অনেক বিশেষজ্ঞ সঙ্গীতবোদ্ধারা।

‘মান্না দে’ গায়ক হিসেবে আধুনিক বাংলা গানের জগতে সর্বস্তরের শ্রোতাদের কাছে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় ও সফল সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব। এছাড়াও, হিন্দি এবং বাংলা সিনেমায় গায়ক হিসেবে অশেষ সুনাম কুড়িয়েছেন। মোহাম্মদ রফি, কিশোর কুমার, মুকেশের মতো তিনিও ১৯৫০ থেকে ১৯৭০ এর দশক পর্যন্ত ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতে সমান জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। সঙ্গীত জীবনে তিনি সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি গান রেকর্ড করেন।

কফি হাউজের সেই আড্ডাটা; আবার হবে তো দেখা; এই কূলে আমি, আর ওই কূলে তুমি; তীর ভাঙা ঢেউ আর নীড় ভাঙা ঝড়; যদি কাগজে লেখো নাম; সে আমার ছোট বোনসহ মান্না দের কণ্ঠের বহু গান বিশ্বের সব বাংলা ভাষাভাষি শ্রোতার কাছেও দারুণ জনপ্রিয়।

সঙ্গীত ভুবনে তার এ অসামান্য অবদানের কথা স্বীকার করে ভারত সরকার ১৯৭১ সালে পদ্মশ্রী, ২০০৫ সালে পদ্মবিভূষণ এবং ২০০৯ সালে দাদাসাহেব ফালকে সম্মাননাসহ বহু সম্মান ও পুরস্কারে অভিষিক্ত করে।

বাবা – পূর্ণ চন্দ্র এবং মা – মহামায়া দে’র সন্তান মান্না দে ১ মে ১৯১৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা-মায়ের সংস্পর্শ ছাড়াও, পিতৃসম্বন্ধীয় সর্বকনিষ্ঠ কাকা সঙ্গীতাচার্য (সঙ্গীতে বিশেষভাবে দক্ষ শিক্ষক) কে.সি. দে (পূর্ণনাম: কৃষ্ণ চন্দ্র দে) তাকে খুব বেশী অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত করেছেন। মান্না দে তার শৈশব পাঠ গ্রহণ করেছেন ‘ইন্দু বাবুর পাঠশালা’ নামে একটি ছোট প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তারপর তিনি স্কটিশ গির্জা কলেজিয়েট স্কুল এবং স্কটিশ গির্জা কলেজে স্নাতক করেন। স্কটিশ চার্চ কলেজে পড়ার সময় তিনি তার সহপাঠীদেরকে গান শুনিয়ে আসর মাতিয়ে রাখতেন। তিনি তার কাকা কৃষ্ণ চন্দ্র দে এবং উস্তাদ দাবির খানের কাছ থেকে গানের শিক্ষা লাভ করেন। ঐ সময়ে মান্না দে আন্তঃকলেজ গানের প্রতিযোগিতায় ধারাবাহিকভাবে তিন বছর তিনটি আলাদা শ্রেণীবিভাগে প্রথম হয়েছিলেন।

মান্না দে ১৯৪২ সালে কৃষ্ণ চন্দ্র দে’র সাথে বোম্বে (বর্তমান মুম্বাই) দেখতে আসেন। সেখানে শুরুতে তিনি কৃষ্ণ চন্দ্র দে’র অধীনে সহকারী হিসেবে এবং তারপর শচীন দেব বর্মণ (এস.ডি. বর্মণ) এর অধীনে কাজ করেন।

পরবর্তীতে তিনি অন্যান্য স্বনামধন্য গীতিকারের সান্নিধ্যে আসেন এবং তারপর স্বাধীনভাবে নিজেই কাজ করতে শুরু করেন। ঐ সময় তিনি বিভিন্ন হিন্দি চলচ্চিত্রের জন্য সঙ্গীত পরিচালনার পাশাপাশি উস্তাদ আমান আলি খান এবং উস্তাদ আব্দুল রহমান খানের কাছ থেকে হিন্দুস্তানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তামিল নেন। তামান্না’ (১৯৪৩) চলচ্চিত্রে গায়ক হিসেবে মান্না দে‘র অভিষেক ঘটে। সুরাইয়া’র সাথে দ্বৈত সঙ্গীতে গান এবং সুরকার ছিলেন কৃষ্ণ চন্দ্র দে। ঐ সময়ে গানটি ভীষণ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। ‘মশাল’ (১৯৫০) ছবিতে শচীন দেব বর্মণের গীত রচনায় ‘ওপার গগন বিশাল’ নামে একক গান গেয়েছিলেন। এর গানের কথা লিখেছিলেন কবি প্রদীপ।

১৯৫২ সালে মান্না দে বাংলা এবং মারাঠী ছবিতে একই নামে এবং গল্পে ‘আমার ভূপালী’ গান গান। এরফলেই তিনি প্রতিষ্ঠিত ও পাকাপোক্ত হয়ে যান এবং জনপ্রিয় গায়ক হিসেবে সঙ্গীতপ্রেমীদের কাছ থেকে স্বীকৃতি পান। মান্না দে ভীমসেন জোসি’র সাথে একটি জনপ্রিয় দ্বৈত গান ‘কেতকী গুলাব জুহি’ গান। এছাড়াও, তিনি কিশোর কুমারের সাথে আলাদা গোত্রের দ্বৈত গান হিসেবে ‘ইয়ে দোস্তী হাম নেহী তোরেঙ্গে (শোলে)’ এবং ‘এক চতুর নার (পদোসান)’ গান। এছাড়াও, মান্না দে শিল্পী ও গীতিকার হেমন্ত মুখোপাধ্যায় (হেমন্ত কুমার)সহ আরো বেশকিছু গীতিকারের সাথে বাংলা ছবিতে গান গেয়েছিলেন। দ্বৈত সঙ্গীতে লতা মুঙ্গেশকারের সাথে ‘কে প্রথম কাছে এসেছি (শঙ্খবেলা)’ গান করেছেন। রবীন্দ্র সঙ্গীতসহ প্রায় ৩৫০০ গান গেয়েছেন।

মান্না দে কেরালার মেয়ে সুলোচনা কুমারনকে ১৮ ডিসেম্বর ১৯৫৩ সালে বিয়ে করেন। তাদের দুই কন্যা রয়েছে: সুরমা এবং সুমিতা জন্মগ্রহণ করে। মান্না দে পঞ্চাশ বছরেরও বেশী সময় মুম্বাইয়ে কাটানোর পর বর্তমানে ব্যাঙ্গালোরের কালিয়ানগর শহরে বাস করছিলেন।

২০০৫ সালে বাংলাভাষায় তার আত্মজীবনী ‘জীবনের জলসাঘরে’ খ্যাতিমান আনন্দ প্রকাশনীর মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। পরে এটি ইংরেজীতে ‘মেমরীজ কাম এলাইভ’, হিন্দীতে ‘ইয়াদেন জি ওথি’ এবং মারাঠী ভাষায় ‘জীবনের জলসাঘরে’ নামে অনুদিত হয়।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.