প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠছে পাকিস্তানের নারী পুলিশ

Pakistani Police Inspector Shazadi Gillani (C) interrogates an accused kidnapper at a police station in Abbottabad September 18, 2013.উইমেন চ্যাপ্টার: শাহজাদী জিলানি, পাকিস্তানের রক্ষণশীল একটি প্রদেশের সর্বোচ্চ র‌্যাংকিংয়ের নারী পুলিশ কর্মকর্তা। কিন্তু তাকে এ পর্যন্ত আসতে মাশুল দিতে হয়েছে অনেক। যখন তিনি পুলিশের যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, প্রথম বাধাটা আসে বাবার কাছ থেকে। রীতিমতো চ্যালেঞ্জ করতে হয়েছে বাবার সাথে। এর পরের বাধাটা আরও মারাত্মক। বিয়েটা ভেঙ্গে গেছে শুধুমাত্র এই একটি সিদ্ধান্তেই। তৃতীয়ত, পুলিশের মূল প্রশিক্ষণ খরচ তাকে নিজেকেই জোগাড় করতে হয়েছে। এতোসব বাধাবিপত্তি পেরিয়েই আজ তিনি একটি পুলিশ স্টেশনের প্রধান।

গত ১৯ বছর ধরে ইন্সপেক্টর জিলানি এবং তার বিশ্বস্ত সহকারি রিজওয়ানা জাফর কাজ করে যাচ্ছেন পুরুষদের মতো হয়েই। লড়েছেন যেমন সন্ত্রাসীদের সাথে, তেমনি ভূমিকম্প ও জঙ্গিদের সাথেও। তালেবান জঙ্গিরা সবসময় অনুসরণ করে বেড়াচ্ছে এই দুজনকে। জিলানির কর্মস্থল উত্তরাঞ্চলীয় খাইবার পাখুনখা প্রদেশ। সেখানে তিনি বাইরে গেলে বোরকা পরেন, মাথা থেকে পায়ের তলা পর্যন্ত কোথাও কোনকিছু খোলা নেই, চোখের ওপরও পর্দা ঝুলিয়ে রাখেন। অন্যদিকে নকল মোছ লাগিয়ে তাঁকে অনুসরণ করে যান রিজওয়ানা।

কিন্তু সবার পক্ষে এতোসব বাধা পেরুনো সম্ভবপর হয়ে উঠে না। তাই এই দুই নারী পুলিশের সামনেও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় নতুন নারীদের এখানে নিয়োগ করাটা। প্রদেশটির ৬০ হাজার শক্তিশালী পুলিশ বাহিনীর মাত্র ৫৬০ জন হচ্ছে নারী। পুলিশ প্রধান আশা করছেন, একবছরের মধ্যে এই সংখ্যা দ্বিগুণ হবে। কিন্তু কাজের ক্ষেত্র যতোটা প্রতিবন্ধক হয়ে উঠছে দিন দিন, তাতে করে নারী পুলিশ নিয়োগের বিষয়টিও জটিলতর হচ্ছে।

তারপরও কিছু কিছু সাফল্য তো আছেই। জার্মানি তিনটি প্রশিক্ষণ কলেজে নারীদের থাকার জন্য আবাসন নিশ্চিত করেছে। আগের মতো এখন আর মূল প্রশিক্ষণের জন্য নারীদের বছর বছর অপেক্ষা করতে হয় না। এই গ্রীষ্মে প্রদেশটির ৬০টি থানায় নারীদের অভিযোগ ডেস্ক চালু করেছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী পাকিস্তানের বহুসংখ্যক নারী ভয়াবহ সব সহিংসতার মুখোমুখি হন এবং কর্মকর্তারা আশা করছেন, নির্যাতিত নারীরা এখন থেকে আরও বেশি হারে তাদের অভিযোগ জানাবেন। পুরুষ পুলিশের কাছে এদেশের নারীরা সাধারণত তথ্য জানাতে অস্বীকৃতি জানায় বলেই এতোদিন সহিংসতার খবরগুলো সঠিকভাবে উঠে আসতো না। এবার দৃশ্যপটের কিছুটা হলেও পরিবর্তন ঘটবে বলেই ধারণা কর্তৃপক্ষের।

রিজওয়ানা জাফর বলেন, ‘কর্মক্ষেত্রে আমরা রীতিমতো একটা যুদ্ধ চালাচ্ছি’। কারাতে ইউনিফর্ম পরা রিজওয়ানা আরও বলেন, ‘আমরা জুনিয়রদের সহায়তা দিচ্ছি। কিন্তু আমাদের সময় কেউ ছিল না’।

স্কুল থেকে পুলিশ বাহিনী

জিলানি যখন স্কুলে পড়তেন, তখন থেকেই তিনি বাবার মতো সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু তখন তাদের নিয়োগ দেওয়া হতো না। তাই তিনি সেনাবাহিনীর পরিবর্তে পুলিশের যোগ দেওয়ার প্রস্তাব করেন। একথা শুনে তার বাবা এবং সাত ভাই চমকে গিয়েছিলেন। ভয়ও পেয়েছিলেন খানিক। তারা তখন বলা শুরু করেন, ‘পুলিশ নারীদের অশ্রদ্ধা করে’। জিলানি জানান, ‘তখন আমার বিরোধিতাকারীর সংখ্যা ছিল প্রচুর’। কিন্তু প্রায় এক সপ্তাহ জিদ করে না খেয়ে থেকে এবং কলেজ শিক্ষক মাকে দিয়ে পটানোর পর জিলানির বাবা শেষতক হার মানেন। কিন্তু জুড়ে দেন তিনটি শর্ত: সাহসী হতে হবে, চাকরির সাথে ঘর করতে হবে এবং একজন অন্তত বন্ধুকে একাজে আনতে হবে।

তাৎক্ষণিকভাবে শর্তে রাজী হয়ে যান জিলানি। তিনি তার স্কুল বন্ধু রিজওয়ানা জাফরকে নিয়ে আসেন এই পেশায়।
জাফর তার চুল কেটে ছোট করে ফেলেন, পোশাক পরেন ছেলেদের মতোন। মোটর সাইকেল চালাতে শেখেন, কম্পিউটারে পারদর্শী এবং ইঞ্জিনও মেরামত করতে শিখে নেন। তিনি কেবলমাত্র জিলানির দেহরক্ষীই নন, সহকারি এবং বন্ধু তো বটেই! তিনি বলেন, ‘আমি রান্না করি না। আমার অন্য কোন পোশাক নেই। এক ঈশ্বর ছাড়া কাউকে ভয় পাই না। আমরা একজন আরেকজনকে সুরক্ষা দেই। একজন ঘুমালে অন্যজন জেগে পাহারা দেই’।

একবার ভূমিকম্পের পর একজন পুরুষ সহকর্মী যখন তাদের তাঁবুতে ঢোকার চেষ্টা চালিয়েছিল, জাফর ও জিলানি দুজনই তখন একসাথে তাকে প্রতিরোধ করেছিলেন।

জিলানি যখন পুলিশে যোগ দেন, নারী পুলিশকে মোটেও সম্মানের চোখে দেখা হতো না। কিন্তু সেনাবাহিনীতে হতো। তার মেজর বাবা তখন জোর ও প্রভাব কাটিয়ে তাদের কোর্সে ভর্তি করান। জিলানির প্রশিক্ষণ খরচ ছিল দুই হাজার ডলার। তার বাবাই সেই টাকা শোধ করেন। এই টাকাটা ফেরত আসতে সময় লেগেছে আট বছর।

তবে সবার এমন ক্ষমতাধর বাবা পাওয়ার সৌভাগ্য থাকে না। রোজিয়া আলতাফ ১৬ বছর আগে যোগ দেন পুলিশে এবং ছয় বছর অপেক্ষা করে ও ৫০টিরও বেশি আবেদন করেন মূল প্রশিক্ষণের জন্য। পেশাওয়ারের একটি পুলিশ স্টেশনের বর্তমান প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন জিলানি। তিনি বলেন, নারী ইস্যুগুলোর জটিলতা হ্রাস পেতে শুরু করেছে ক্রমশ। ‘আমাদের সময় আমরা খুবই অবহেলিত ছিলাম। কিন্তু আমি জুনিয়র কর্মকর্তারা যাতে প্রশিক্ষণ এবং যথাসময়ে প্রমোশনটুকু পায়, সেই চেষ্টা করে যাচ্ছি’।

দেখা গেছে, পেশাওয়ারের নারী পুলিশ স্টেশনগুলো বছরে প্রায় ৫০টির মতো অভিযোগ পাচ্ছে, যা কিনা অন্যান্য পুলিশ স্টেশনের চেয়ে অনেক কম। অ্যাবোটাবাদ নারী-পরিচালিত পুলিশ স্টেশনে সবশেষ অপরাধের রেকর্ড করা হয়েছিল ২০০৫ সালে। স্টেশন প্রধান সামিনা জাফর প্রায় খালি অফিসে বসেই দায়িত্ব পালন করেন। তিনি জানান, তাদের সুযোগ-সুবিধা কম। অন্যান্য স্বাভাবিক থানার মতোই এটিকেও দেখতে চান সামিনা।

হামলাকারীরা কমই শাস্তি পায়

পাকিস্তানের নারীরা নারী পুলিশের কাছে সব খুলে বলতে স্বচ্ছন্দ বোধ করে। একথা বলছিলেন প্রফেসর মাঙ্গাই নটরাজন, যিনি উইমেন পুলিশ স্টেশন নিয়েই পড়াশোনা করেছেন। তিনি জানান, ভারতের তামিলনাড়ুতে নারী পুলিশ স্টেশনগুলোতে দুই-তৃতীয়াংশ পারিবারিক সহিংসতার খবর রেকর্ড হয়। আর এসব অভিযোগের প্রায় অর্ধেকই মিটিয়ে ফেলেন পুলিশই। তারাই মধ্যস্থতা করে ফেলেন। এ ব্যাপারে পাকিস্তানের কোন ডাটা অবশ্য পাওয়া যায়নি।

খাইবার পাখতুনখা পুলিশ স্টেশনের উইমেন ডেস্কে যেসব অভিযোগ রেকর্ড হয়, তার অধিকাংশই পারিবারিক সহিংসতার খবর। এক্ষেত্রে অপরাধীকে ডেকে নামমাত্র বকুনি দেওয়া ছাড়া তেমন কোন শাস্তি এখনও মেলেনি। আর নির্যাতিতদের আশংকা, এসব অভিযোগ নিয়ে মামলা করতে গেলে সহিংসতার মাত্রা বাড়বেই কেবল।

পাকিস্তানে পরিবেশ বদলাচ্ছে দিন দিন। নারী পুলিশের সংখ্যা দেখে অনেক পুরুষ সহকর্মী এখনও নাক সিঁটকায়। কিন্তু এসব কথায় দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করে জায়গা করে নেওয়া জিলানি এবং জাফরের মধ্যে প্রবল প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। তারা বলেন, এ অবস্থার পরিবর্তন শিগগিরই হবে। অন্যরা যখন দেখবে নারী পুলিশ তাদের দায়িত্ব ঠিকমতোই পালন করছেন, তাহলে ধারণা পাল্টে যাবে।

জিলানি বাড়ি ফেরার পথে বোরকা পরলেও থানায় তা পরতে নারাজ। তিনি বলেন, ‘আমরা যদি পুরুষের মতোন কাজই করতে পারি, তাহলে মুখ দেখাতে আপত্তি থাকবে কেন? মুখটা ঢাকবোই বা কেন? তার মতে, ‘সমাজের সবস্তরের জন্য পরিবর্তনটা এখন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, শুধু পুলিশের ক্ষেত্রে না’।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.