রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও নীতি নির্ধারণে যেতে সংগ্রাম চলছেই

0

আঙ্গুর নাহার মন্টি: গত ৪২ বছরে বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতিসহ সমাজের সকল ক্ষেত্রে নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে। দেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেত্রী, সিটি কর্পোরেশনের মেয়র, পুলিশ ও সেনাসদস্য, বৈমানিক, বিচারক, উদ্যোক্তা, ক্রিকেটার তো বটেই বাংলাদেশের নারীর বিজয় পতাকা আজ উড়ছে এভারেস্ট চূড়াতেও। রাজনীতিতে অংশগ্রহণ ব্যাপকভাবে বাড়লেও নীতি নির্ধারণী পর্যায় বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছুতে নারী এখনও অবিরাম সংগ্রাম করেই যাচ্ছে। রাজনীতির ময়দানে, মিছিলে, শ্লোগানে যতটা উচ্চকন্ঠ নারী; সিদ্ধান্ত গ্রহণে ততটা অংশীদারিত্ব আদায় করতে পারেনি এখনও।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নারী নেত্রীদের মতে, গণতান্ত্রিক নির্বাচনে নারীকে রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে দেওয়ার বঞ্চনার সূত্রপাত হয় মনোনয়নের প্রহসনের মধ্য দিয়ে। যথেষ্ট শিক্ষা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া কালো টাকা ও পেশী শক্তির রাহুগ্রাসে আবদ্ধ রাজনীতির কারণে কাঙ্খিত সংখ্যক নারী জাতীয় নির্বাচনে সরাসরি মনোনয়ন পাচ্ছেন না। ফলে জনপ্রতিনিধি হিসেবে আইন প্রণয়নে ভূমিকা রাখার জন্য সংরক্ষিত আসন‘ই অন্যতম বিকল্প হিসেবে রয়ে গেছে। দলীয় স্বার্থে সংসদে কোরাম পূরণ ও হ্যাঁ-না ভোটে আইন প্রণয়নে ভূমিকা রাখা ছাড়া সংরক্ষিত সদস্যদের আর করার কিছুই নেই। তাদের নেই কোন জবাবদিহিতাও। আর মনোনয়ন ও দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকা ভিন্ন হওয়ায় সংরক্ষিত আসনের সদস্যরা জনগণের সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপন করতে পারছেন না। অন্যদিকে সংসদের ৩০০ সদস্যের কাছে যেন ৫০ জন সংরক্ষিত সদস্য পূর্ণাঙ্গ সদস্যই নন। বরং সংসদের ভেতর তারা অনেক সময় হাসি-ঠাট্টার পাত্রতে পরিণত হচ্ছেন।

এ ব্যাপারে সংরক্ষিত আসনের সমস্যার কথা স্বীকার করে বর্তমান স্পিকার ও সাবেক মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড.শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে আমাদের অভীষ্ট লক্ষ্য এখনও অর্জিত হয়নি। তবে সংরক্ষিত আসনে হলেও সংসদে জাতীয় ইস্যুতে আমরা কথা বলছি, কাজ করছি।

এদিকে বাস্তবতা হচ্ছে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চার বিকাশ এবং তৃণমূল পর্যায়ে নারীর ক্ষমতায়ন বৃদ্ধিতে রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহন বাড়ানোর বিকল্প নেই। কিন্তু বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্তগ্রহণকারীর ভূমিকায় নারীদের উপস্থিতি খুবই কম, বিশেষ করে কেন্দ্রীয় কার্যকরি কমিটিতে নারীদের শতকরা হার মাত্র ২ দশমিক ৭ থেকে ১৫-এর মধ্যে। দলগুলোকে বাধ্য না করলে তারা দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারী সদস্য সংখ্যা বাড়াতে চায় না। উপরন্তু কিছু দলের দৃষ্টিভঙ্গি, আচরণ ও উদ্যোগহীনতা রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণের জন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।

এদিকে রাজনৈতিক দলসমূহ নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সুপারিশ অনুযায়ী ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্বের বিষয়টিকে নীতিগতভাবে মেনে নিলেও ২০০৮ সালে ৩০০ আসনের সংসদ নির্বাচনে ৩৩ শতাংশ নারীকে মনোনয়ন দিতে ব্যর্থ হয়েছে। জানা গেছে, বর্তমানে আওয়ামী লীগে নারী প্রতিনিধিত্ব ১৫ শতাংশ, বিএনপিতে ১৩ দশমিক ১১ শতাংশ এবং বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টিতে এই সংখ্যা ৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, দেশের সবচেয়ে নারীবান্ধন দল আওয়ামী লীগ দেশের নারী সমাজের উন্নয়নে নীতিমালা ও অনেক আইন প্রণয়ন করলেও এমনকি অন্যান্য দলের চেয়ে নারী প্রতিনিধিত্বে এগিয়ে থাকলেও ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি। অথচ এটি তাদের অন্যতম নির্বাচনী অঙ্গিকার ছিল।

বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দল দুটির সর্বোচ্চ পদটিতে কয়েক দশক ধরে নারী নেতৃত্ব রয়েছেন। দেশ পরিচালনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া‘র বিকল্প এখনো নেই। এই দুই শক্তিধর নারী প্রায় দুই যুগ ধরে পর্যায়ক্রমে রাষ্ট্র চালাচ্ছেন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার গঠন করার পর কৃষি, স্বরাষ্ট্র (পরে টেলি ও ডাক) ও পররাষ্ট্র এ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান নারী। আর দেশে নারী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার ঘটনা এবারই প্রথম। শুধু তা-ই নয়, এ সরকার গুরুত্বপূর্ণ অনেক পদে প্রথমবারের মতো নারীকে অধিষ্ঠিত করেছেন। সর্বশেষ সংযোজন স্পিকার পদে শিরীন শারমিন চৌধুরীকে মনোনয়ন।

ইসি সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সংসদে নির্বাচিত নারী সদস্যের সংখ্যা দুই শতাংশের বেশি ছিল না। এবার এই সংখ্যা ১৯ জন। আর পুরো সংসদে রয়েছেন ৬৯ জন নারী। এদের মধ্যে মন্ত্রিসভায় ৬ জন, একজন সংসদ উপনেতা, একজন হুইপ এবং দু’জন সংসদীয় স্থায়ী বা স্ট্যান্ডিং কমিটির সভাপতি রয়েছেন। ৪৮টি সংসদীয় কমিটিতে নারী সদস্য আছেন মোট ৫৭ জন। এটি নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক নেতৃত্বে নারীর অগ্রযাত্রায় ইতিবাচক সূচনা। কারণ, অষ্টম সংসদে কোনো নারীই কোনো সংসদীয় স্ট্যান্ডিং কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হননি এবং কেউ হুইপও নির্বাচিত হননি। বিগত দিনের মতো শুধু ভোটার হিসাবে অংশগ্রহণের দিক থেকে নয়, প্রার্থী হিসাবে নারীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বিজয়ী হওয়ার ক্ষেত্রেও ইতিহাস সৃষ্টি করেছে এই নির্বাচন। তাই সংশ্লিষ্টদের অভিমত, পরিবেশ, ধর্ম, সমাজ, পারিবারিক মূল্যবোধের দোহাই দিয়ে রাজনীতি থেকে নারীদেরকে দূরে থাকতে বলা, সংরক্ষিত আসনের অলংকার বানিয়ে রাখা কিংবা মনোনয়ন বঞ্চিত করার সংস্কৃতি থেকে বাংলাদেশ এখন অনেকটাই সরে এসেছে। জানা গেছে, ২০০৮ সালের নির্বাচনে নারী ভোটার ছিল ৪ কোটি ১২ লাখ ৩৬ হাজার যা পুরুষ ভোটারের চেয়ে প্রায় ১৫ লাখ বেশি। আর ওই নির্বাচনের ফলাফলে নারী ভোটাররাই প্রধান নিয়ামক হিসাবে কাজ করেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

কর্মজীবি নারী‘র সভাপতি নারী নেত্রী শিরিন আখতার বলেন, নারী ভোটারের সংখ্যা ও ভূমিকার কারণে নবম জাতীয় সংসদে আমাদের দাবি ছিল ১০০ আসনে নারীর সরাসরি নির্বাচন। এই সংসদে তা হয়নি। পরে নারী আসন সংখ্যা ১০০ তে উন্নীত করে সরাসরি নির্বাচনের আয়োজন করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। নারী আন্দোলনের দাবি ও প্রত্যাশা, বর্তমান সরকার সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করবে।
শুধু জাতীয় পর্যায়ে-ই নয়, তৃণমূল পর্যায়েও নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। ১৯৯৭ সালে দেশে প্রথমবারের মতো স্থানীয় সরকার পরিষদে সংরক্ষিত আসনে নারীদের সরাসরি নির্বাচনের বিধান চালুর পর থেকে স্থানীয় সরকারে তৃণমূলের হাজার হাজার নারী সিদ্ধান্ত-গ্রহণ প্রক্রিয়ার অংশীদার হয়েছেন। সেই থেকে পর্যায়ক্রমে স্থানীয় সরকারের প্রত্যেক স্তরে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচন ব্যবস্থা চালু হয়েছে। ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসের উপজেলা নির্বাচনে প্রতিটি উপজেলায় একজন করে নারী ভাইস চেয়ারম্যান সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। তবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের তিন বছরের বেশি সময় পার হওয়ার পরও সব উপজেলা পরিষদে নারী সদস্য নির্বাচন হয়নি। দ্রুত নারী সদস্য নির্বাচনে ইসিকে তাগিদ দিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। ২০১১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ৪ হাজার ৩৫৮ জন পুরুষের পাশাপাশি ২২ জন নারী চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন। ২০১১ সালের পৌরসভা নির্বাচনে একজন নারী (রাজশাহীতে) মেয়র নির্বাচিত এবং ২১২টি পৌরসভায় ৬৩৬ জন নারী সংরক্ষিত আসনে নির্বাচিত হন। ২০১১ সালের অক্টোবর মাসে অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে দলীয় সমর্থনবঞ্চিত হয়েও জনগণের রায়ে বিজয়ী হয়ে দেশের প্রথম নির্বাচিত নারী মেয়র হন ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। তার এ বিজয় প্রমাণ করে দিয়েছে সততা, আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করলে দলীয় পৃষ্ঠপোষকতা না পেলেও এবং পেশীশক্তির সহায়তা ছাড়াও নারীরা রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে বিজয়ী হতে পারে। এই ঘটনাটি দেশে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।

বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত নারীরা প্রমাণ করেছেন সুযোগ ও পূর্ণ সহযোগিতা পেলে তারা সব কাজ ভালোভাবে করতে পারেন। তবে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে এতোসব অর্জন ম্লান হয় যখন তৃণমূলেও নারী প্রতিনিধিরা পদে পদে বাধাগ্রস্ত হন। প্রশ্ন উঠে, স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত নারী জনপ্রতিনিধিদের নিজ নিজ দায়িত্ব-কর্তব্য পালনের সুযোগ ও পরিবেশ নিয়ে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সাম্প্রতিক এক জরিপে বলা হয়, তৃণমূলে উন্নয়নমূলক কাজ, ভাতা ও ত্রাণ বণ্টনের ক্ষেত্রে অর্ধেকের বেশি সংখ্যক নারী জনপ্রতিনিধি জানিয়েছেন তারা সমস্যায় আছেন।
এ প্রসঙ্গে স্টেপস্ টুয়ার্ডস্ ডেভেলপমেন্ট‘র নির্বাহী পরিচালক রঞ্জন কর্মকার বলেন, রাজনীতির মাধ্যমেই গণতান্ত্রিক দেশের যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত ও বাস্তবায়িত হয়। রাজনীতি এবং ক্ষমতা কাঠামো থেকে জনগোষ্ঠীর অর্ধেক অংশ নারীদের বাদ দিয়ে কখনো সত্যিকার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। তাই জেন্ডার সংবেদনশীল রাজনৈতিক দল, সংসদ, মন্ত্রিসভা, স্থানীয় সরকার ইত্যাদি সংসদীয় গণতন্ত্র আর সু-শাসনকে দৃঢ় করে। বর্তমান সরকার এ বিষয়ে সবচেয়ে এগিয়ে আছে।

এদিকে গত সেপ্টেম্বরে ‘সম-অংশীদারিত্বেও ভবিষ্যত‘ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে ২০২১ সাল নাগাদ প্রশাসন, চাকুরি, সংসদ ও নেতৃত্বসহ বাংলাদেশের সব কর্মক্ষেত্রের অর্ধেক প্রতিনিধিত্ব করবে নারীরা এমন অঙ্গিকার করে খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাই এবারের নারী দিবসে দেশের নারী সমাজের প্রত্যাশা, আগামী নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী এই অঙ্গিকারের বাস্তবায়ন হিসেবে সরাসরি বা জনগণের ভোট লড়াইয়ে জিতে দশম জাতীয় সংসদে প্রবেশের পথ সুগম করতে আরো বেশি নারী নেতৃত্ব মনোনয়ন দিবেন। আর একই প্রত্যাশা দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দলের কাছেও।

লেখক: সাংবাদিক

শেয়ার করুন:
  • 73
  •  
  •  
  •  
  •  
    73
    Shares

লেখাটি ১,৪১৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.