আমরা যারা একলা থাকি-১

উইমেন চ্যাপ্টার: কতদিন ধরে ভাবছি এ নিয়ে লিখতে হবে, কিন্তু বার বার ভাবি, কী হবে লিখে! যারা একলা থাকে না, তারা তো সেই চাপা হাসিটাই হাসবে! তাই আনমনেই লিখি ‘বুঝিবে সে কীসে, কভু আশীবিষে দংশেনি যারে’, অথবা ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ আন আসে, তবে একলা চল রে’। দ্বিতীয় কথাটার মধ্যে আবার অন্য মাজেজা আছে। ‘কেউ যদি না আসে’, তার মানে আমি ‘অবহেলিত’, কেউ না এলেই একলা চলবো, আর কেউ দয়াপরবশ হয়ে এলে ‘তাকে নিয়ে দুজনে দুজনার’ হয়ে যাবো। দ্বিতীয়টি আমাদের (যারা আমরা একলা থাকি) জন্য কিছুটা অপমানজনকই বটে! বিষয়টা এমনও তো হতে পারে, ‘কেউ আমাদের ডেকেছিল, আমরাই যাইনি’, হতে পারে না? দ্বিতীয় প্রসঙ্গ অন্যদিনের জন্য তোলা থাক।

ma-meyeপ্রথম প্রসঙ্গে আসি। ‘কি করে কেউ সাপের দংশন বুঝবে, যে কখনও সেই ছোবলই খায়নি’, বুঝলেন তো? আমরা যারা একলা থাকি, আর যারা থাকি না, এ দুয়ের মাঝে কিন্তু ম্যালা ফারাক। এই একলা থাকার পজিটিভ-নেগেটিভ দুটোই আছে। পজিটিভটা হলো, নিজের মতোন থাকা, নিজের মতোন সিদ্ধান্ত নেওয়া, কখন খাবো, কখন ঘুমাবো, আদৌ ঘুমাবো নাকি সারারাত গান শুনবো, একান্তই নিজের। বাগড়া দেওয়ার কেউ নেই। শুধু মাসান্তে মাসোহারাটা নির্দ্দিষ্ট থাকলেই অনেক মুশকিল আসান।

নেগেটিভ অনেক। বিশেষ করে আমাদের সমাজে। আজকেই শোনা একটা কথা বলি। কথাটা বলেছে আমারই ‘জানি দোস্ত’। অনেক কষ্টে-অনেক দু:খে সে বলেছে। গিয়েছিল রোগী দেখতে, যার আজকে রিং পরানো হবে, সম্পর্কে বোন জামাই। তার চিকিৎসার খরচও পরিবারের সবাই মিলেই দিচ্ছে, সেই বন্ধুটিও দিচ্ছে একটা বড় অংশ। সেই রোগীটিই বন্ধুটিকে কাছে ডেকে নিয়ে বসায় এবং জিজ্ঞ্যেস করে, ‘স্বামীর সাথে ছাড়াছাড়িটা (অনেক বছর আগের ঘটনা) কেন হয়েছিল? বন্ধুটি বলে, ওটা ক্লোজ চ্যাপ্টার, তাই বলতে চাই না। এমন সময় সেই রোগী বোন-জামাইয়ের একটি হাত উঠে আসে বন্ধুটির উরুর কাছে। ঘটনাটি হজম করতে পারছে না আমার বন্ধু। ঘেন্নায় তার গা রি রি করছে, বাসায় ফিরেই স্নানঘরে ঢুকে সে। তারপরও মনটা তাতিয়ে আছে।

আমি শুনলাম, কিন্তু হাসলাম না। মনে হলো, হাজারও ঘটনার একটি হলেও আমরা যারা একলা থাকি, সেই আমাদের কত সহজে মানুষ ‘নিছকই মেয়েমানুষ’ ভাবে! বিধবা বা বিয়ে না হওয়া মেয়েদের চেয়েও আমাদের সামাজিক অবস্থানটা কতটা নড়বড়ে, তা আমার এই একটি সংস্থা-প্রধান বন্ধুর  এই ঘটনাটি দিয়েই প্রমাণ হয়। বন্ধুটির বোন শুনে বলেছিল, ‘মাইর দিলা না ক্যান’? সেটাও একটা কথা। একজন রোগী, যার ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক হয়েছে, যার আজ রিং পরানো হবে, তাকে কষে থাপ্পর মারতে পারলেই বোধহয় ঠিক হতো।

এই যে ‘আমরা যারা একলা থাকি’, আমাদের প্রতিনিয়ত এমন অনেক অযাচিত ঘটনার মুখোমুখি কি হতে হচ্ছে না? হাত হয়তো সবাই দিতে পারে না, এই সুযোগটা একটু কমই পায় ওই নপুংসকগুলো, কিন্তু শুধু শুধু ফোন কল দেওয়া, এসএমএস পাঠানো, নানারকম প্রস্তাব দেওয়া (চা খাওয়া থেকে শুরু করে ব্যাংকক যাওয়া পর্যন্ত), পার্বনে এটা-ওটা গিফট পাঠিয়ে দেওয়া, এসব তো হরহামেশাই ঘটছে। আর ঘটছে এমন মানুষদের কাছ থেকে, যেখানে আমরা অনেকেই মুখ পর্যন্ত খুলতে  পারি না, ওদের সংসার ভেঙ্গে যাবে ভয়ে, ভাবখানা এমন যে, ওদের সংসার টিকিয়ে রাখার মহান দায়িত্বটা আমরাই নিয়েছি।

নিজের অভিজ্ঞতা বলি। সংসার টিকিয়ে রাখার কথা বলছিলাম তো, দুজনই বন্ধু-স্বামী এবং স্ত্রী। তো, সেই স্বামীটারই মাঝে মাঝে মাথা বিগড়ে যায়। নানা ধরনের এসএমএস আসা শুরু হয়। অতীষ্ঠ লাগে, পড়ার আগেই ডিলিট। কতবার ভেবেছি, ওর বউকে বিচার দেবো, কিন্তু ওর বউয়ের নিষ্পাপ মুখটার দিকে তাকিয়ে আর হয়ে উঠে না। খুব করুণা হয় এসব মানুষজনকে দেখে।

আমার উপরোক্ত বন্ধুটিও বলছিল, মুখ খুললে বেশ কটা কাজিনেরই ঘর ভেঙ্গে খান খান হয়ে যাবে। কিন্তু কেন এমনটি হয়? আমরা যারা স্বেচ্ছায় একলা থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তারা কেন নিয়েছি, একবারও ভাবে কেউ? দূরের মানুষ তো দূরেই থাকে, কাছের মানুষেরাই কি ভাবে? আমরা কি একলা থাকছি, যা ইচ্ছা তাই করবো ভেবে? নাকি আমাদের সাথে যা ইচ্ছা তাই করতে দেবো বলে? কোনটা?

আরেক বন্ধু বেশ কয়েক মাস স্বামীর সাথে বিচ্ছিন্ন আছে। সে বলছিল, ‘একা থাকে শুনলেই কিছু মানুষের চোখ ছোক ছোক করতে থাকে, গলার স্বরই বদলে যায়’। একটু আগেও যে কিনা বন্ধুসুলভ আচরণ করছিল, সেও তখন ‘অন্য ভাষায়’ কথা বলতে শুরু করে।

অন্যরকমও ঘটে, একলা থাকি বলে আমাদের সহপাঠি ছেলেবন্ধুরা বউয়ের ভয়ে কথাটাও বলে না, কিন্তু আড়ালে বলে। এক্ষেত্রে সবার মনোবাসনা যে এক, তা নয়। বউ সন্দেহ করবে বলে ঘরে অশান্তি ডেকে আনে না। অথচ প্রকৃত বন্ধুর মতোনই হয়তো অনুভব করে। কত জ্বালা!

একবার একটি স্বনামধন্য পত্রিকার সম্পাদক তার একজন নারী কর্মীর সাথে একটি ঘটনার জের ধরে বলেছিলেন, ‘পুরুষহীন নারীর প্রতি সবারই আগ্রহ থাকে, আপনিও পড়ে গেলেন সেই দলে’। আবার সেই তিনিই তার পুরুষ কর্মীটিকে ডেকে যাচ্ছেতাই ভাষায় গালিগালাজ করে বলেছিলেন, ‘একটা মেয়ের একাকীত্বের সুযোগ নিলা তুমি?’ মেয়েটির সহকর্মীরা মেয়েটিকে তখন বলছিলেন, ‘আপনাকে কেন বেছে নিল ওই বদমাশ, আপনি তো সেই টাইপের না’।

এসবই শোনা অভিজ্ঞতা। এই ঝুলি অনেক বড়।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.