দেশের ভাবমূর্তি!

hottaতানিয়া মোর্শেদ: বারো বৎসর আগে এক কিশোরীকে বিএনপি’র সন্ত্রাসীরা মিলে গণধর্ষণ, বীভৎস অত্যাচার করেছিল। পুরো পরিবারটিই নির্মম অত্যাচারের শিকার হয়েছিল। শিকার হয়েছিল আরও অনেক পরিবার। তারা ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের। আমি ইচ্ছে করেই নামটি লিখছি না। সবার বুঝে যাবার কথা কার কথা বলছি! গতকাল একজন ফেইসবুকে স্ট্যাটাসে শাহরিয়ার কবিরের কিছু কথা (এ’ বিষয়ে) উল্লেখ করেছেন। অল্প ক’টি লাইন। অথচ রাতের ঘুম কেড়ে নেয়, মাথা খারাপ করে দেয়! ১২ বৎসর আগে এদেশে বাংলাদেশের টিভি দেখা যেতো না। (গেলেও আমার জানা ছিল না)।

ফেসবুক তো ছিলোই না। অন লাইন খবরের কাগজ ক’টি ছিল মনে নেই। আদৌ ছিল কি? দেশের খবর প্রধানত ফোনেই পাওয়া হতো। একদিন বরের এক বন্ধু ফোনে জানালেন যে, বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর অত্যাচারের প্রতিবাদে সমাবেশ করা হবে, যোগ দেবার আহ্বান। বর অফিস থেকে লাঞ্চ আওয়ারে এসে আমাদের নিয়ে গেল। ছোট্ট দীপ্তকে স্ট্রলারে ঠেলে শহরের মাঝখানের চত্বরে যোগ দিলাম প্রতিবাদ সমাবেশে। বরের বন্ধু বাংলাদেশের। বাকীদের চিনি না। বুঝলাম তারা পশ্চিম বঙ্গের। কিছুক্ষণ পরে বাংলাদেশী এক আপা, তার বর আর বড় ভাই যোগ দিলেন। খুব সম্ভব আমরা এই ক’জনই বাংলাদেশী ছিলাম। কমিউনিটিতে অনেক বাংলাদেশী। কিন্তু কেন তারা যোগ দেননি জানি না। সেখানকার বাংলাদেশী কমিউনিটির মানুষ গ্রুপে গ্রুপে মেশেন। আমি কোনো গ্রুপেই পড়তাম না। কিছু মানুষ দাওয়াত দিলে দেখা হতো। আমি কাউকে দাওয়াত দিলে আসতেন। এটুকুই। আর অল্প ক’টি পূর্ব পরিচিত বন্ধুদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ। তাই জানা ছিল না যে, আয়োজকরা সবাইকে জানিয়েছিলেন কি না!

অল্প ক’দিন পর এক দাওয়াতে দেখি পুরুষরা যেখানে বসেছেন সেখান থেকে একজনরের উচ্চস্বর শোনা যাচ্ছে! পাশের ঘরে নারীদের সাথে আমি বসে শুনতে পেলাম কয়েকটি বাজে শব্দ। কানে লাগলো, “লাত্থায় শেষ করা দরকার।” আমি উঠে সেখানে গিয়ে দাঁড়ালাম। শুনলাম উচ্চস্বরে বলছে, “মুসলমানের  বাচ্চা সেখানে যায়! বাংলাদেশের মানুষ হয়ে ইন্ডিয়ানদের সাথে দাঁড়ায় প্রতিবাদ করে বাংলাদেশের বিষয়ে! লাত্থায় মারা উচিৎ।”

আমি এগিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে বললাম, “মারুন, লাত্থি মারুন! আমার বরকে দেখিয়ে, সন্তানকে দেখিয়ে বললাম যে, মারুন। আমাদের তিনজনকেই লাত্থি মারুন!” সে জানতো না যে আমরা সেখানে গিয়েছিলাম। বাকী যে তিনজন বাংলাদেশী গিয়েছিলেন তাদের কথা কোথা থেকে শুনেছিল! সে তিনজন কমিউনিটিতে বেশ পরিচিত, তাই হয়ত। আমি বললাম যে, কিসের অসুবিধা প্রতিবাদ সমাবেশে গেলে? জানেন কি ঘটেছে বাংলাদেশে? কতজন রেইপড হয়েছে?

হাত ঘুরিয়ে আমাকে বললো, “ওরকম কত রেইপ হয়।” মাথায় আগুন ধরে গেল! বলেছিলাম অনেক কিছু। এও বলেছিলাম যে, রেইপ মানে তো কিছু না আপনার কাছে। তাই সহজেই বললেন যে, কত হয়! যান গিয়ে নিজের স্ত্রীকে (পাশের ঘরেই ছিল) জিজ্ঞাসা করুন, নিজের মা’কে জিজ্ঞাসা করুন! উলটো আমাকে বললো যে গুজরাটে মুসলমানদের কী ভাবে পুড়িয়ে মারা হয়েছে! প্রতিবাদ করেন না কেন? আমি বলেছিলাম, আয়োজন করুন। আমি আসবো। আমি ভারতীয় নই। ভারতে কি অন্যায় ঘটলো তা দেখবার আগে নিজের ঘরে, দেশে কি ঘটছে তা আগে দেখবো। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠের দায়িত্ব সংখ্যালঘুর উপর কোনো অন্যায় ঘটতে না দেওয়া। নিজেকে না শুধরিয়ে অন্যের দোষ ধরায় বিশ্বাসী নই।

কেন কেন বাংলাদেশে এ ঘটনা ঘটবে?? এদেশে আপনাকে, আমাকে কেউ অন্যায় ভাবে আক্রমণ করলে কার সবচেয়ে আগে এগিয়ে আসা, প্রতিবাদ করা জরুরী! এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠদের নয়?? উচ্চস্বরে অনেক অচেনা মানুষের মধ্যে সেই অচেনা মানুষটিকে বানিয়ে এসেছিলাম। আমার কথার আগে আমার বর তার স্বভাবসুলভ ভদ্র ভাবে তাকে বোঝাতে চেয়েছিল। কিন্তু কিছু কিছু অভদ্র মানুষ থাকে যারা কারো কথা শোনে না। আমি এই ধরনের অভদ্রদের যদি কিছু বলতে যাই (বাধ্য হয়ে) কন্ঠস্বর তাদের সমান বা একধাপ উচুঁ করেই কথা বলি।

পরে জেনেছিলাম যে, অনেক বড়লোক বাবার সন্তান সে। নিজে বা তার ভাইসহ দেশে কি কুকর্ম করে এদেশে বাস করছে, বাবার টাকায়।

এর কাছাকাছি সময়ে আরেক বাসার দাওয়াত ছিল। আমরা সেখান থেকে চলে আসবার পর সেই বাড়ীর মানুষসহ আরও কিছু মানুষ সেই আপার (প্রতিবাদ সমাবেশে যাওয়া) সাথে তর্ক করেছেন। কেন বাংলাদেশীরা এভাবে পাবলিকলি প্রতিবাদ করে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ করছে বাইরে? মানে কথা হচ্ছে যে, সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণ তো ঘটেই! তাই বলে এভাবে দেশের বাইরে প্রতিবাদ করে বাইরের পৃথিবীকে জানানো কেন? যেন পৃথিবীর জানতে কিছু বাকী আছে/ থাকে? এরা নিজেরা চোখ, কান বন্ধ রেখে ভাবে কিছুই হয়নি! এদের কাছে দেশ মানে কি, দেশের ভাবমূর্তি কি তারা এরাই জানে! অন্যায়ের প্রতিবাদ না করলে যে নিজেদের ঐ সন্ত্রাসীদের বন্ধু হিসাবেই প্রতিপন্ন করা হয় তা কি এরা বোঝে না? দেশের সবচেয়ে নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া, এদেশে নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া, নামী কোম্পানিতে চাকুরী করা, প্রতিষ্ঠিত মানুষই যদি এত অন্ধ, কানে না শোনা, ডিনাইয়ালে থাকা মানুষ হয় তাহলে কোথায় যাবে দেশ? দেশ কী, দেশের ভাবমূর্তি কী, দেশপ্রেম কী তা এরা বোঝে? দেশ মানে কী শুধুই নিজের ধর্মের মানুষ?

Tania Lopa
তানিয়া মোর্শেদ

না পশ্চিমবঙ্গের সেই মানুষগুলো (যারা আয়োজক ছিলেন) কোনো প্রতিবাদ সমাবেশ (গুজরাটের ঘটনার) করেননি। করলে জানতাম। আমাকে যে কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ সমাবেশে পাওয়া যাবে স্বশরীরে, না হলে মানসিকভাবে। তবে আমি বিশ্বাস করি প্রতিবাদ হবে সবচেয়ে আগে, নিজের অন্যায়ের! তারপর অন্যের।

লেখক যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.